মুক্তি পেল চিকিৎসক শুদ্ধস্বত্ব চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত ছবি ‘প্রত্যাবর্তন’ ছবির ঝলক। যে ঝলক ইঙ্গিত দেয় সময়, স্মৃতি আর মানুষের সম্পর্ক নিয়ে এক অনন্য যাত্রার। কলকাতার বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এশিয়ার প্রথম মেডিক্যাল কলেজ। মেডিক্যাল কলেজ, বেঙ্গল -শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা অসংখ্য স্বপ্ন, বন্ধুত্ব আর জীবনবোধের নীরব সাক্ষী। ঠিক সেই প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করেই তৈরি হচ্ছে এক আবেগঘন গল্প, যেখানে সময়, স্মৃতি আর মানুষের সম্পর্ক মিলেমিশে যায় এক অনন্য যাত্রায়।
এই গল্প ছয় বন্ধুর -প্রসূন, রণদীপ, সঞ্জয়, ইপ্সিতা, অনিন্দিতা ও অবিনাশ। একই ব্যাচের ছাত্রছাত্রীছিল তারা। ক্লাস, ওয়ার্ড ডিউটি, পরীক্ষা, হোস্টেলের আড্ডা-সব মিলিয়ে কলেজ জীবন ছিল তাদের কাছে জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়। ডাক্তারি পাশ করার প্রায় ১৫ বছর পর, মেডিক্যাল কলেজের ১৯০তম রিইউনিয়নের এক বৈঠকে আবার একত্রিত হয় তারা। আর সেখান থেকেই ধীরে ধীরে খুলে যেতে থাকে অতীতের দরজা।
এই রিইউনিয়নের কেন্দ্রে রয়েছে প্রসূন, যে বর্তমানে তিনি একজন প্রতিষ্ঠিত এনআরআই, পরিবার নিয়ে থাকে ব্রিটেনে। কলকাতায় তার ফেরার উদ্দেশ্য ছিল একেবারেই বাস্তব ঘেঁষা কারণে -পৈতৃক বাড়ি বিক্রি করা। ভারতে তাঁর পরিবারের একমাত্র সদস্য বৃদ্ধা পিসি। পরিকল্পনা ছিল বাড়ি বিক্রি করে পিসিকেও সঙ্গে নিয়ে চিরতরে দেশ ছাড়ার।
কিন্তু পুরনো বন্ধুদের মুখ, কলেজ ক্যাম্পাসের গন্ধ, আর সেই চেনা স্মৃতিগুলো প্রসূনের ভিতরটা বদলে দিতে শুরু করে। নস্টালজিয়া তাকে গ্রাস করে। সবচেয়ে বেশি নাড়িয়ে দেয় অনিন্দিতার স্মৃতি, কলেজ জীবনে যার সঙ্গে তার এক অসম্পূর্ণ প্রেম রয়ে গিয়েছিল। পারিবারিক জটিলতায় সেই সম্পর্ক আর পূর্ণতা পায়নি। পরবর্তী সময়ে অনিন্দিতা ব্রিটেনে পাড়ি দিলেও, জীবন তাঁকে বড় নির্মম পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়। ক্যানসারে আক্রান্ত তাঁর মৃত্যু হয় সেখানেই।
‘প্রত্যাবর্তন’ ছবিটি পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন চিকিৎসক শুদ্ধস্বত্ব চট্টোপাধ্যায়, প্রযোজনায় পাঞ্চালি চট্টোপাধ্যায়। গল্প লিখেছেন চিন্ময় নাথ।গল্পের মূল ভাবনা চিকিৎসক অভীক ঘোষ।
বন্ধুত্ব, অপরাধবোধ, হারানো ভালবাসা আর কৃতজ্ঞতার ভারে এক সময় প্রসূন এরপরে নিয়ে ফেলে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে পাওয়া সমস্ত অর্থ তিনি দান করেন মেডিক্যাল কলেজ রিইউনিয়ন অফিস ও মিউজিয়াম তৈরির জন্য! যেন এই প্রতিষ্ঠান, এই স্মৃতিগুলো, আর এই মানুষগুলো চিরকাল বেঁচে থাকে।
ছবির গল্প এগোয় বর্তমান আর অতীতের মধ্যে যাতায়াত করে। কখনও কলেজ জীবনের প্রাণখোলা মুহূর্তে, কখনও মধ্যবয়সের বাস্তবতায়। হাসি, বেদনা, বন্ধুত্ব আর হারানোর অনুভূতি মিলিয়ে তৈরি হয় এক গভীর আবেগের প্রবাহ। শেষটা কোনও নির্দিষ্ট সমাপ্তি নয়, বরং স্মৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের এক নীরব স্বীকৃতি।
এই ছবির আরেকটি বিশেষ দিক, এখানে অভিনয় করেছেন মেডিক্যাল কলেজ, বেঙ্গলের প্রকৃত চিকিৎসক ও মেডিক্যাল ছাত্রছাত্রীরা, যাঁরা প্রায় ৫০ বছরের বিভিন্ন ব্যাচের প্রতিনিধি। ফলে গল্পটা শুধুই অভিনয় নয়, হয়ে ওঠে এক প্রজন্মের আত্মজৈবনিক দলিল।
বন্ধুত্ব কি সময়ের সঙ্গে ফিকে হয়ে যায়? অসমাপ্ত ভালবাসা কি এক জীবনে কখনও শেষ হয়? আর স্মৃতি? সেগুলো কি সত্যিই হারিয়ে যায়?
এই গল্প সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজে। তবে নীরবে, গভীরভাবে, হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মতো করে।
