পৃথিবীর নানা প্রান্তের বিভিন্ন ধারার সুরের পরশ যেমন এসে লেগেছে ভারতীয় সঙ্গীতে, তেমনই ভারতীয় সুরও পৌঁছে গিয়েছে বিশ্ব দরবারে। আর এই বিশ্ব সঙ্গীতের আঙিনায় যিনি বাংলা ও বাঙালিকে বারে বারে গর্বিত করেছেন, তিনি হলেন সঙ্গীত পরিচালক দেবজ্যোতি মিশ্র । ছায়াছবির গান, বিজ্ঞাপনের জিঙ্গল কিংবা বাংলা আধুনিক গান— গত তিন দশক ধরে ওঁর প্রতিটি সৃষ্টিই সঙ্গীতপ্রেমীদের মনের মণিকোঠায় জায়গা করে নিয়েছে। স্বতন্ত্র সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে দেবজ্যোতি মিশ্রের এই গৌরবময় পথচলাকে কুর্নিশ জানাতেই কলকাতায় আয়োজন করা হয়েছিল এক অনন্য সঙ্গীত সন্ধ্যা “আলোপাখির গান”।

সম্প্রতি কলকাতার ঐতিহ্যবাহী জি.ডি. বিড়লা সভাঘরে বসেছিল সুরের এই মহাজাগতিক আসর। বেঙ্গল ওয়েব সলিউশন -এর আয়োজনে এই মায়াবী সন্ধ্যাটি হয়ে উঠেছিল নস্টালজিয়া ও বন্ধুত্বের এক জীবন্ত দলিল। দেবজ্যোতি মিশ্রের ৩০ বছরের সুরের যাত্রাকে উদযাপন করতে এদিনের মঞ্চে হাজির হয়েছিলেন টলিউড তথা বাংলা সঙ্গীত জগতের একঝাঁক নক্ষত্র। ওঁর সুর করা কালজয়ী গানগুলো এদিন নতুন করে পরিবেশন করলেন শিল্পীরা। চাঁদের হাটে উপস্থিত ছিলেন—স্বাগতালক্ষী দাশগুপ্ত, রূপঙ্কর বাগচী, অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়, উপল সেনগুপ্ত, অর্ক মুখোপাধ্যায়, অন্বেষা দত্ত গুপ্ত, স্যামন্তক সিনহা, পর্শিয়া সেন, অরিত্র দাশগুপ্ত, সোনাক্ষী কর, অ্যানি আহমেদ এবং দেবজ্যোতি মিশ্র।

 

চারিদিকে যখন যুদ্ধ আর অস্থিরতার পরিমণ্ডল, তখন সঙ্গীতই যে মানুষকে বেঁধে রাখতে পারে এবং হাতে হাত ধরে পথ চলার শক্তি জোগায়, এই অনুষ্ঠানটি যেন আরও একবার তা প্রমাণ করে দিল। শুধু গান নয়, সুরের ভেলায় চড়ে এদিন গল্পে-কথায় অনুষ্ঠানটিকে এগিয়ে নিয়ে যান দেবজ্যোতি মিশ্র এবং অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় জুটি।

দেবজ্যোতি মিশ্রের গান মানেই বাঙালির আবেগ, প্রেম আর এক চিলতে মন খারাপ। এদিনের অনুষ্ঠানে স্বাভাবিকভাবেই ঘুরেফিরে এল ওঁর তৈরি সেই সমস্ত আইকনিক গান, যা ছাড়া বাঙালির প্লে-লিস্ট অসম্পূর্ণ। শ্রোতারা মেতে উঠলেন—

‘আমার দক্ষিণ খোলা জানলা’

‘মেঘের পালক, চাঁদের নোলোক’

‘চল রাস্তায় সাজি ট্রাম লাইন’

‘সখি হাম’

‘মথুরানগরপতি’

‘পিয়া তোরা ক্যায়সা অভিমান’

‘মেঘ পিয়নের ব্যাগের ভেতর’

‘যেকোনো ভূমিকায়’

‘এক যে আছে কন্যা’

‘তোমায় মনে পড়ছিল’— এর মতো বহু কালজয়ী গানের সুরে।


৩০  বছরের এই সুর-উদযাপন নিয়ে আবেগাপ্লুত শোনালো খোদ সঙ্গীত পরিচালককে। দেবজ্যোতি মিশ্র ওঁর অনুভূতি ভাগ করে বলেন, “এই অনুষ্ঠানটি আসলে অনেক রকমের বন্ধুত্বের এক সুরেলা উদযাপন। আমার সঙ্গে প্রয়াত চলচ্চিত্র পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষের অনন্য বন্ধুত্ব, বাংলা বিজ্ঞাপন জগতের সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের সখ্যতা, আধুনিক বাংলা গানের পাশাপাশি অন্যান্য সকল চলচ্চিত্র পরিচালকদের সাথে আমার পেশাদার যাত্রা এবং ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব— সবই মিশে আছে এই আলোপাখিতে। এছাড়াও আমার কণ্ঠশিল্পী, বাদ্যযন্ত্রী, গীতিকার এবং সর্বোপরি আমাদের গানের শ্রোতাদের সাথে যে আত্মার টান, এদিনের সন্ধ্যা মূলত সেই ভালবাসারই এক কোলাজ। এই সন্ধ্যা আমাদের সবার মনের মণিকোঠায় থেকে যাবে।”

২৪ মে-র সেই সুরেলা রাত পার হয়ে গেলেও, দেবজ্যোতি মিশ্রের ‘আলোপাখির গান’-এর সুরের রেশ এবং তিন দশকের নস্টালজিয়া আজও তাজা তিলোত্তমার বুকে।