লোকগানের জগতে তিনি উজ্জ্বল নক্ষত্র। আকাশ আটের গুড মর্নিং আকাশ থেকে শুরু করে সারেগামাপা, বিভিন্ন শোয়ের সঙ্গে যুক্ত তিনি। সম্প্রতি আমেরিকায় উড়ে গিয়েছেন মাটির গান শোনাতে। সেখান থেকেই নিজের কাজ, সারেগামাপায়ের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ, পারফর্মারস অফ বেঙ্গল, ইত্যাদি বিষয়ে আজকাল ডট ইনের সঙ্গে কথা বললেন শিল্পী দেব চৌধুরী।
দেব চৌধুরীর সঙ্গে কথোপকথনে সবার আগে উঠে আসে এনএবিসির কথা। সেই প্রসঙ্গে গায়ক বলেন, "এই নিয়ে আমি ৩ বার এনএবিসিতে অনুষ্ঠান করতে এলাম। ২০২৩ সালে প্রথমবার আসি। তবে সেটা আমার প্রথম আমেরিকা সফর বা বিদেশ সফর কোনওটাই ছিল না। বিদেশে তার আগেও বহু বার, বহু বছর ধরে শো করেছি।" প্রবাসীদের গান শোনানোর অভিজ্ঞতার বিষয়ে দেব বলেন, "শো করতে এসে আমার যেটা মনে হয়েছে প্রবাসের বাঙালিরা শিকড়ে ফিরতে চান। দেশ, রাজ্য ছেড়ে মানুষ বিদেশে আসেন রুটিরুজির টানে। কিন্তু মনে শিকড়ে টানটা রয়েই যায়। যে কোনও বঙ্গসম্মেলন বা বিদেশের মাটিতে হওয়া অনুষ্ঠানে দেখবেন মানুষ বলিউড বা পুরনো দিনের গান, বাজনাকে নিচ্ছে। কিন্তু যখন লোকসঙ্গীত, রবীন্দ্র সঙ্গীত বা বাংলা পুরনো দিনের কোনও নস্টালজিক গান হয় তখন কিন্তু বাঙালিরা নিজেদের ছোটবেলায় ফিরে যান। রিলেট করতে পারেন। লোকসঙ্গীত তাঁদের অস্থির সময় যেন স্বস্তি দেয়। গরমের দাবদাহের পর যেন এক পশলা বৃষ্টি। এটা আমি নিজে দেখেছি এবং বিশ্বাস করি। অতীতে প্রবাসীরা বছরে যখন একবার করে দেশে ফিরতেন, বা কেউ আসতেন তখন হয় নিজেরাই বা তাঁর হাত দিয়ে গানের ক্যাসেট, বই, ইত্যাদি নিয়ে যেতেন। আর এখন যখন কোনও গান রিলিজ করে, প্রবাসীরা কিন্তু সেটা শোনেন। আমার যখন কোনও গান রিলিজ হয় তখন বিদেশের বহু মানুষ সেটা শোনেন। এই যেমন ধরুন, নারী দিবসে আমি 'ক্ষেপিদের' নিয়ে একটা গান বেঁধেছিলাম। খ্যাপাদের নিয়ে তো সকলেই গান লেখেন, বাঁধেন, আমি ক্ষেপিদের নিয়ে গান তৈরি করেছিলাম। লোকগানের সুরে ছিল গানটি। ৬ সপ্তাহ পর যখন অ্যানালিটিক্স দেখতে যাই, দেখি মাত্র ৩০ শতাংশ শ্রোতা ভারতের, বাকি ৭০ শতাংশ প্রবাসীরা। বিদেশে শো শেষ হওয়ার পর মানুষ নিজেদের ছোটবেলার স্মৃতিচারণ করেন গান শোনার পর। ডেকে ডেকে সেই গল্প শোনান। এই মুহূর্তগুলো খুবই আনন্দদায়ক। বিদেশে চাকচিক্য, গ্ল্যামার দিয়ে শো সাজালে মানুষের কাছে পৌঁছানো যাবে না। যদিও হৃদয় দিয়ে গান, তাহলেই মানুষের সঙ্গে জুড়তে পারবেন।"
প্রবীর দাসের আমন্ত্রণে, বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষের উপস্থিতিতে সদ্যই গঠিত হয়েছে পারফর্মারস অফ বেঙ্গল। আর এই সংগঠনের ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন দেব চৌধুরী। তাঁদের এই সংগঠনের মূল লক্ষ্য কী? দেবের কথায়, "অন্যতম মূল লক্ষ্য বিকেন্দ্রিকরণ। কলকাতাই সব কাজ করবে, বা হচ্ছে এমনটা নয়। সবসময় দেখা যায়, কলকাতার উপর মানুষের ফোকাস একটু বেশি পড়ে। কলকাতাতেই কেবল ভাল গানবাজনা হয়, এমনটা নয়। গোটা বাংলা জুড়েই সংস্কৃতির একটা নিরন্তর ধারা আছে। কিন্তু আমরা বড় বেশি শহর মুখাপেক্ষী হয়ে উঠেছি। পারফর্মারস অফ বেঙ্গলের মূল লক্ষ্য হচ্ছে সবাই মিলে নাচ, গান, বাজনা করুক সেটা নিশ্চিত করা। কয়েকজন শিল্পীর মধ্যে ব্যাপারটা যেন কুক্ষিগত না হয়ে থাকে। এটা শো পাওয়ার মঞ্চ বা সংগঠন না। শিল্পীরা মানুষদের ভাল রাখেন, কিন্তু তাঁদের ভাল রাখার খবর কেউ রাখে না। তাঁদেরও তো কিছু বলার থাকতে পারে। তাঁদের ভাল থাকা নিশ্চিত করতে, তাঁদের কথা শোনার জন্য এই সংগঠন। বাংলায় সবার পয়সা আছে, শুধু শিল্পী ফ্রি। আলো, মাইক, ইত্যাদি সকলে তাঁদের প্রাপ্য টাকা পেয়ে যান। কেবল শিল্পীদের টাকা দেওয়া নিয়েই সমস্যা। শিল্পীদের ভাল রাখা, ভাল থাকা, অধিকার সুরক্ষিত করার কথা বলা লক্ষ্য আমাদের।" তিনি এদিন আরও বলেন, "এতদিন ২০-৩০ জন শিল্পী ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কাজ পেয়েছেন, বাকিরা যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কাজ পায়নি। এটা তো মনোপলি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেই জায়গাটা আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা করছি। লক্ষ্য শিল্প চর্চার ব্যাসার্ধ আরও বড় করা, যাতে আরও মানুষ যাতে এসে সেখানে যাতে বসতে পারেন। শিল্পীদের তো এটা পেশা। কেউ যেমন সরকারি চাকুরে, কেউ স্কুলে পড়ান, ব্যবসা করেন বা অন্য কিছু, তেমনই শিল্পীরা পারফর্ম করে রুটিরুজি আয় করেন। একই সঙ্গে আমাদের পারফর্মারস অফ বেঙ্গলের উদ্দেশ্য তাই জেলার শিল্পীদের তুলে আনা। একজন ফকির ঘরের লোককে আমি কী করে ফকিরি গান শেখাব? সেই ধৃষ্টতা বা স্পর্ধা যেন আমার কখনও না আসে। একটা ব্যালেন্স বজায় রাখতে চাই।"
দেব চৌধুরীর নিজের সংগঠন সহজিয়া ফাউন্ডেশন। এই সংগঠনের মাধ্যমে কী কাজ করেন তাঁরা? গায়ক বলেন, "২০০৮ সাল থেকে কাজ শুরু করি। ২০১০ সালে মিনিস্ট্রি অফ কালচারের একটি স্কিম ছিল যেখানে মাসে ২০০০ টাকা পাওয়া যেত। সেটা যাতে লোকশিল্পীরা পান সেটা নিয়ে কাজ শুরু করি। এখন ৩০০ এর বেশি লোকশিল্পীর জন্য এটা আয়োজন করতে পেরেছি। এটা সম্পূর্ণ সমাজসেবামূলক কাজ। এছাড়া অন্যান্য নানা প্রজেক্টে আমরা কাজ করেছি।" লোকগান বা লোকশিল্পীদের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে দেব বলেন, "ধরা যাক কেউ লোকগান শিখলেন। তারপর তিনি নিজেকে বিরাট বড় ফকিরি শিল্পী মনে করতে শুরু করলেন, ওয়ার্কশপ করান। আমি যদি লোকগান, ভাওয়াইয়া গান শিখে থাকি, সেটা তো সমুদ্রের তীরে বসে দুই এক মুঠো বালি কুড়ানোর মতো। আমি কীভাবে সেটা নিয়ে ওয়ার্কশপ করাব। আসলে শহুরে লোকজন লোকসঙ্গীতকে নাগরিক ঔদ্ধত্যে গিলে খেতে চায়। যেমন বড় মাছ ছোট মাছকে গিলে খায়।"
প্রসঙ্গত, দেব চৌধুরী বাংলার জনপ্রিয় রিয়্যালিটি শো 'সারেগামাপা'র সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। তাঁর হাত থেকেই পদ্মপলাশ, অর্কদীপের মতো কৃতি প্রতিযোগীরা বেড়িয়েছেন। তাঁদের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে, পদ্মপলাশকে তিনি কীভাবে, কোথা থেকে আবিষ্কার করেন সেটা জানালেন। দেব চৌধুরী এদিন বলেন, "পদ্মপলাশকে গ্রামীণ একটা কীর্তনের আসর থেকে প্রথমবার আমিই নিয়ে আসি। গোবরডাঙ্গার দিকে কোথাও একটা কীর্তনের অনুষ্ঠানে ও গান গাইছিল। এটা করোনার আগের কথা। কীর্তনের আসর থেকে অদ্ভুত গান ভেসে এল। সেটা শুনলাম। ওই গান শুনতে শুনতে এত ভাল লাগল যে সেদিন ওই হরিসভাতেই রাতে থাকলাম। ভোরের প্রথম ট্রেনে ফিরেছিলাম। ওর নম্বর নিয়েছিলাম। গুড মর্নিং আকাশের একটা বিশেষ পর্বে কীর্তন দরকার ছিল, তখন ওকে নিয়ে আসি। প্রথম ও টিভিতে অনুষ্ঠান করে এবং দারুণ গাইল। এর আগেও জি বাংলায় অডিশন দিয়েছিল কিন্তু পায়নি। গুরুর কাজ তাকে হাত ধরে রাস্তা পার করানো না। তাকে আলো দেখানো। ভারতীয় সংস্কৃতি গুরুবাদে বিশ্বাস করে। গুরুর কাছে সারেন্ডার করা জরুরি। গুরু গান গাইতে শেখায় না। কী করে গান গাইতে হয় সেটা শিখিয়ে দেয়। শিষ্যের যেমন। ভাল গুরু লাগে, তেমন গুরুরও ভাল শিষ্য লাগে।"
প্রসঙ্গত, অদিতি মুন্সির স্বামী দেবরাজ চক্রবর্তীর গ্রেফতারির পর কীর্তন গায়িকার নামেও একাধিক অভিযোগ উঠেছে। তিনি নাকি শোয়ের প্যানেলিস্টদের প্রভাবিত করতেন। এমনকী তাঁর সহপ্রতিযোগী জানিয়েছেন স্ক্রিপ্টরাইটারের সঙ্গেও নাকি সম্পর্ক ছিল অদিতির। এই বিষয়ে দেব চৌধুরী বলেন, "২০১৫ সালে ও যখন ছিল তখন কালিকাপ্রসাদ লোকসঙ্গীতের ব্যাপারটা দেখতেন। আর পরিচালক ছিলেন অভিজিৎ সেন। ২০১৫ তে কী হয়েছে বলতে পারব না। ২০১৮ সাল থেকে এরকম কিছু দেখিনি। সারেগামাপার সঙ্গে এত বছর কাজ করার সময় কণা মাত্র বিচ্যুতি দেখেনি। এটা কেবল ফেয়ার নয়, সুপারফেয়ার শো। আর পরিচালক অভিজিৎ সেন অত্যন্ত স্থিতধি, সৎ মানুষ। উনি থাকতে এই কাজটা হবে, এটা বিশ্বাস করি না। কাজ করতে করতে কখনও বকাঝকা করেন, সেটা আলাদা। বাচ্চাদের যেমন আমরা গাইড করি, তেমন বকাও খায় ওরা। কিন্তু তাই বলে কেউ গ্রুমারদের প্রভাবিত করবে এটা মনে হয় না। বিশেষ করে যেখানে অভিজিৎ সেন, রথিজিৎ ভট্টাচার্যের মতো মানুষ আছেন। এটা মনে হয় অপপ্রচার চলছে রিয়্যালিটি শোয়ের বিরুদ্ধে। এখানে যে বাচ্চারা আমাদের কাছে থাকে ১০ মাস, তাদের সবাইকে আমরা সন্তানের মতো দেখি। তাদের হয়তো আমরা পেটে ধরিনি, মনে ধরেছি।"
কারও নাম না করলেও দেব চৌধুরী এদিন তাঁর কথার শেষে বলেন, "যাঁরা রিয়্যালিটি শোয়ে গিয়েছেন, তাঁরা হঠাৎ করে একটা খ্যাতি পান। অনেকেই ভাবেন রিয়্যালিটি শোয়ে গেলেই সাফল্য অনিবার্য। সেটা তো নয়। হয়তো কেউ বিজয়ী হল, টপ ১০-এ ছিল কখনও, তারপর তাঁরা হারিয়ে যান অনেক সময়ই। রিয়্যালিটি শো থেকে বেরোনোর পর প্রচার, প্রসার, অর্থ সবই আসে। বিভিন্ন শো থেকে ডাক পান। কিন্তু অনেকেই সেটা ধরে রাখতে পারেন না। মাটির থেকে পা সরিয়ে ফেললেই পতন অনিবার্য।"















