দক্ষ অভিনেতা। দুই বাংলায় তাঁর জুড়ি মেলা ভার। ওপার বাংলার সেরা অভিনেতাদের মধ্যে প্রথম সারিতেই উঠে আসে তাঁর নাম। পদ্মাপারের অভিনেতা হলেও এপার বাংলাতেও তাঁর ভক্তের সংখ্যা যারপরনাই ঈর্ষণীয়। তিনি, চঞ্চল চৌধুরী। এমনিতে নিজের ব্যক্তিজীবন নিয়ে খুব বেশি কথা বলেন না অভিনেতা। খানিক প্রচারবিমুখও বটে। তাই তাঁকে সাক্ষাৎকারের জন্য পাওয়াটা অনেকটা শীতকালে কাঁচামিঠে আম পাওয়ার মতোই!
সম্প্রতি, পরিবার নিয়ে শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন চঞ্চল। ছেলে শুদ্ধ-র হাত ধরে পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়িয়েছেন বিশ্বভারতী, ভুবনডাঙার মাঠ। সেখান থেকে কাজের সুবাদেই কলকাতাকে ছুঁয়ে যাওয়া। তারই এক ফাঁকে আজকাল ডট ইন-এর জন্য সময় বের করলেন ‘পদাতিক’ অভিনেতা।
আচ্ছা, ইন্ডাস্ট্রিতে শোনা যায় মন ভাল করা মিঠে হাসির পিছনে চঞ্চল চৌধুরী মানুষটা নাকি খুব মুডি! আপনার কী মনে হয়, কথাটা সত্যি?
চঞ্চল: (হাসতে হাসতে) আচ্ছা, তোমার একজন পরিচিত মানুষ কিন্তু আমার কাছে এসেছে আজকে। তুমি তাকেও জিজ্ঞেস করে দেখো, আমি মানুষটা মুডি কি না! তবে হ্যাঁ, একটা পর্যায় পর্যন্ত মানুষজনের সঙ্গে খানিক গাম্ভীর্য বজায় রাখতেই হয়। তবে একবার যদি কারও সঙ্গে ওয়েভ লেংথ ম্যাচ করে যায়, তখন তো আর কোনও পাঁচিল-ই থাকে না। আমার নাম চঞ্চল, আড্ডা-আলাপে আমার সেই নামের অর্থটাই আমার ব্যবহারের মধ্যে প্রকাশ পায়। সোজা কথায়, একেবারেই মুডি নই আমি।

ক্যামেরার সামনে চঞ্চল আর বাস্তব জীবনের চঞ্চল –দু’জনের মধ্যে সবথেকে বড় পার্থক্যটা কী?
চঞ্চল: পার্থক্য হচ্ছে...ক্যামেরা যখন চলে আমি তখন একটি চরিত্র। আর বাকি পাঁচজন অভিনেতা-অভিনেত্রীর মতোই। অন্যদিকে, ব্যক্তিগত জীবনে আমি অভিনয় করি না। আমি শুধু ক্যামেরার সামনেই অভিনয় করি! (জোর গলায়) সেখানে আমার পেশাটা কোনওদিনই মুখ্য নয়। সাদামাঠাভাবেই জীবন কাটাই। মানুষ হিসেবে আমার যার সঙ্গে যেমন সম্পর্ক - সন্তান হিসেবে, স্বামী হিসেবে, বাবা হিসেবে অথবা বন্ধু হিসেবে...সেটাই আমি অভিনয়হীনভাবেই পালন করি।
একদিকে ‘দম’ ছবির জন্য কাজাখিস্তান যাচ্ছেন, পরমুহূর্তেই আবার বাংলাদেশের পুবাইলের ‘সাকিন সারিসুরি’ গ্রামে গ্রামীণ বাস্তবতার ছবির শুটিংয়েও আপনি। এই যে তারকা ও অভিনেতার ভারসাম্য রাখছেন, রেসিপিটা কী?
চঞ্চল: 'সাকিন সারিসুরি' গ্রামটার আসল নাম চটের আগা। 'সাকিন সারিসুরি' ধারাবাহিকের শুটিং এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে, তরপর থেকেই ওই গ্রামের নামটা মানুষের মুখে মুখে বদলে যায়। ওই গ্রামে বেশিরভাগ শুটিং করি নাটকের (ধারাবাহিক)। একটা বড় অংশ দর্শককে কিন্তু এইসব নাটকের মাধ্যমেই আমি ছুঁতে পেরেছি। সেই তুলনায় বড়পর্দায়, ওটিটিতে কম কাজ করেছি। যাই হোক, যেটা জিজ্ঞেস করছিলে। এরকম বহুবার হয়েছে ঢাকার বিমানবন্দরে নেমে আমি সরাসরি চলে গিয়েছি ওই গ্রামে নাটকের শুটিং করব বলে। আসলে, আমার কাছে সব মাধ্যমের কাজ সমান। বাজেট, মাধ্যম দেখে বিচার করি না কাজের। একবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেই আমার কাছে বাকি সব ব্যাপার তুচ্ছ। কাজটাই আমার কাছে প্রধান। তাই বড়পর্দাতে কাজ করার সময় যে আন্তরিকতা, সততা দিয়ে কাজ করার চেষ্টা করি ঠিক তেমনভাবেই ওটিটি এবং টেলিভিশনে যখন কাজ করি, সেই সততা, আন্তরিকতার এক ছটাকও কমে না! সেইজন্যেই শুটিং কাজাখিস্তান হোক, আমেরিকা হোক কিংবা বাংলাদেশের কোনও নদীর পাড়ে গ্রাম...কিচ্ছু যায় আসে না!(জোর গলায়)

চূড়ান্ত জনপ্রিয়তা কখনও কখনও শিল্পীসত্তাকে বন্দি করে ফেলে। আপনার ক্ষেত্রে কি এই ভয় কাজ করে?
চঞ্চল: আমার করে না। তবে অনেকের হয়তো করে! আমার করে না এই কারণেই যেহেতু ক্যামেরা বন্ধ হয়ে গেলে আমি আর অভিনয় করি না। ক্যামেরার এপারে আমি কোনও তারকা নই। কোনওদিনই আমি নিজেকে তা ভাবি না, তাই আমার অসুবিধেও হয় না। অন্যদিকে, ক্যামেরার পিছনেও যাঁরা ক্যামেরার সামনের জীবন যাপনের চেষ্টা করে যান, তখন হয়তো তাঁদের এই অসুবিধে হয়!
এমন কোনও চরিত্র আছে, যেটা আপনি ফোটাতে চান কিন্তু এখনও ইন্ডাস্ট্রি সেই সুযোগ আপনাকে দেয়নি?
চঞ্চল: (খানিক ভেবে) দ্যাখো, এরকম নির্দিষ্ট করে কিছু নেই। আলাদা কোনও টার্গেট নেই। তবে হ্যাঁ, যতদিন অভিনয় করব আমার প্রতিটি অভিনীত চরিত্র যেন একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়। সেই বিষয়টি নিয়ে সচেতন থাকি। আগের অভিনীত চরিত্রটিকে আমার নতুন চরিত্রটি যেন ছাপিয়ে যায়, সেই চেষ্টা তো থেকেই।

আচ্ছা, চঞ্চলদা আপনি তো সময় পেলেই আঁকেন। আপনার করা বিভিন্ন শিল্পীর চমৎকার পোট্রেট আমরা দেখেছি। আঁকার প্রতি টান কি ছোট থেকেই? কোথাও শিখেছেন নাকি স্বশিক্ষিত?
চঞ্চল: আঁকার টান আমার ছোটবেলা থেকেই। হ্যাঁ, এই বিষয়ে আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় আঁকা নিয়ে পড়াশোনা করেছি। সেখানে থেকেই স্নাতক ও স্নাতকোত্তর হওয়া। এখন আঁকা নিয়ে খুব বেশি চর্চার সুযোগ পাই না। তবে যখন কাজের চাপ কম থাকে বা ধরো কোনও শুটিংয়ের মাঝখানে কটা'দিন ফাঁকা আছি, ওই সময়টায় রং-তুলি নিয়ে বসে পড়ি।

এই মুহূর্তে কিছু আঁকছেন?
চঞ্চল: গত মাস তিনেক ধরে আঁকা হচ্ছে না। পরপর চারটে ছবির শুটিং করলাম। তবে আবার জলদি বসব কাগজ-পেন্সিল নিয়ে। আসলে, আঁকা আমার হৃদয়ের খুব কাছের। অভিনয় করতে যেমন ভালবাসি, ভাল একটি চরিত্র পেলে যেমন নিজেকে নিংড়ে দিই সম্পূর্ণ...ঠিক তেমনই আঁকতে বসলে নিজেকে সম্পূর্ণ ঢেলে দিই। আঁকার সময়টুকুতে আমি সম্পূর্ণ ডুবে যাই রং-তুলি-কাগজের মধ্যে।
‘শেকড়’-এর ডাবিং করার ফাঁকে পরিবার নিয়ে শান্তিনিকেতন পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়িয়েছেন। আপনার ছেলে শুদ্ধ-কে কী কী দেখালেন?
চঞ্চল: জানো তো, প্রত্যেকের-ই তো শেকড় থাকে। আমরা অনেকেই সেই শেকড়টা অস্বীকার করি। তাই ছেলেকে বোঝালাম, দেখালাম তোমার শেকড়টা কী, কোথায়। কারা তোমার বাবাকে ভালবাসে, তোমার বাবা কাদের শ্রদ্ধা করে, কেন করে...সেগুলো দেখলাম। ছেলেকে তাই আমার শেকড়টা খুঁজতে বলিনি, চিনিয়ে রাখলাম যাতে অস্বীকার না করে।

একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি। এপার বাংলার বহু পরিচালক চঞ্চল চৌধুরী সহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী । কিন্তু বিষয়টা হচ্ছে না। কেন দুই বাংলার শিল্পীরা একসঙ্গে কাজ করতে পারছেন না নিয়মিত? কী মনে হয়?
চঞ্চল: হচ্ছে না কথাটা পুরোপুরি ঠিক না। হ্যাঁ, যে অনুপাতে আগ্রহ প্রকাশ করা হচ্ছে, সেই অনুপাতে কাজ হচ্ছে না। আমিই তো এখানে সৃজিতের পদাতিক ছবিতে কাজ করলাম, ব্রাত্যদার পরিচালনায় শেকড় ছবিতে কাজ করলাম। শেকড় তো এখনও মুক্তিই পায়নি। সবে ডাবিংয়ের কাজ শেষ করলাম। হ্যাঁ, যেটা বলছিলাম...তোমাদের এখানকার যে শিল্পীদের সঙ্গে আমার কাজ করার বহুদিনের ইচ্ছে ছিল, তার কিছুটা পুরো হল। আরও বহুজনের সঙ্গে আমার, আমাদের কাজ করার ভারি ইচ্ছে। সেই ইচ্ছে কিন্তু এখনও পূরণ হয়নি। ঠিক তেমনই এখানকার অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রীদেরও হয়তো আমাদের সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছে রয়েছে। তাই আমার মনে হয়, দুই বাংলার শিল্পীদের একসঙ্গে কাজ করাটা বাড়া দরকার। অবশ্যই দরকার। তবে ওই যে একেবারে যে হচ্ছে না, তা কিন্তু নয়। আসলে, কাজ হচ্ছে না তার নেপথ্যে নানান কারণ থাকতে পারে। ভারত-বাংলাদেশ দু'টো আলাদা দেশ তো...ভিসা পাওয়ার মতো নানান আইনি রয়েছে, কাজের অনুমতি লাগে, নানান ব্যাপার আছে। এছাড়াও কখনও কখনও রাজনৈতিক কারণেও দুই বাংলার একসঙ্গে কাজ করার গতিটাও একটু ঢিমে হয়ে যায়। তাই চাইলে পড়েই আমি এখানে এসে সব কাজ করতে পারব না। সব মিলিয়ে তাই ব্যাপারটা একটু কঠিন।

তাহলে, দুই বাংলার যৌথভাবে কাজ করার গতি বাড়ানো উচিত বলছেন?
চঞ্চল: অবশ্যই। কাজের গতি বাড়লে আমাদের বাংলা ইন্ডাস্ট্রির-ই লাভ। কারণ পৃথিবীজুড়ে বাংলা কন্টেন্টের কিন্তু চাহিদা আছে। এপার-ওপার সব বাংলার কন্টেন্ট মিলিয়েই বলছি। তাই দুই বাংলার যত গুণী শিল্পী আছেন, অভিনেতা-অভিনেত্রীরা আছেন, তাঁরা যদি একসঙ্গে কাজ করেন তাহলে অনেক দ্রুত পৃথিবীজুড়ে যে বাঙালি এবং বাংলাপ্রেমী দর্শকের কাছে দারুণভাবে পৌঁছে যেতে পারব আমরা। পারবই!
&t=313s
শেষ প্রশ্ন। আপনার সামনের কাজগুলো নিয়ে একটু বলুন না। দু’বাংলার কাজ নিয়েই।
চঞ্চল: এখানে ব্রাত্য বসুর পরিচালনায় শেকড় ছবিটি আসবে। ওদিকে, বাংলাদেশে চারটে ছবিতে অভিনয় করলাম। তার মধ্যে দু’টো মুক্তি পাবে আসন্ন ঈদে।
