থিয়েটার জগতের নক্ষত্রপতন। রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ও নাট্যব্যক্তিত্ব ব্রাত্য বসুর দীর্ঘদিনের মঞ্চের সঙ্গী, অভিনেতা সম্রাট ঘটক আর নেই। সহযোদ্ধার প্রয়াণে শোকস্তব্ধ ব্রাত্য বসু। শুধু শোকপ্রকাশ নয়, বরং বন্ধুর উদ্দেশ্যে সমাজমাধ্যমে এক হৃদয়স্পর্শী খোলা চিঠি লিখলেন নাট্যকার। যে চিঠিতে উঠে এল তাঁদের দীর্ঘ ২৫ বছরের পথচলা, বন্ধুত্ব, লড়াই এবং এক অদ্ভুত বিষণ্ণতার গল্প।
ব্রাত্য বসুর ‘ব্রাত্যজন’-এর মঞ্চ মানেই সম্রাট ঘটকের উপস্থিতি। দীর্ঘদিনের নাট্যসঙ্গী আজ না ফেরার দেশে। শোকের এই মুহূর্তে ব্রাত্য বসু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সম্রাটকে নিয়ে লিখলেন এক মর্মস্পর্শী খোলা চিঠি। ২০০০ সালে ২৫ বছর বয়স থেকে যে পথচলা শুরু হয়েছিল, তা যেন আজ এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে গেল।
ব্যক্তিগত জীবনে সম্রাট কেমন ছিলেন, তার এক অকপট স্বীকারোক্তি দিয়েছেন ব্রাত্য। তাঁর কথায়, “সম্রাট ছিল মৃদুভাষী, নম্র, সজ্জন এবং একইসঙ্গে অনিয়ন্ত্রণযোগ্য, নাশকতাধর্মী এবং নৈরাজ্যপ্রবণ।” তিনি আরও লিখেছেন, সম্রাট এক অদ্ভুত ‘অলৌকিক সংবেদন’-এর অধিকারী ছিল, যা তাকে শেষ পর্যন্ত এক প্রবল বিচ্ছিন্নতা ও নিঃসঙ্গতার দিকে ঠেলে দিয়েছিল। অবসাদ আর প্রেমহীনতার সেই মোহেনজোদারো স্তূপ থেকে সম্রাট আর বেরিয়ে আসতে পারেননি। সম্রাটের বিষয়ে বলতে গিয়ে ব্রাত্য আরও লিখছেন, “ব্রাত্যজনের আরও বিভিন্ন থিয়েটারে আলো ও অন্ধকারের ভেতর দিয়ে নিঃশব্দে নিজের আত্মাকে উজাড় করে দিয়েছে সম্রাট। প্রতিটি চরিত্রে, প্রতিটি সংলাপে সম্রাট নিজের এক টুকরো জীবনবোধ রেখে গেছে। আমার পরিচালিত ‘তারা’ ছবিতে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েও সেই এক চিরাচরিত অনন্য সম্রাট। মীরজাফরে রিহার্সালে সাব টাইটলিং করেছে, এমনকি আমার জোরাজুরিতে ব্রাত্যজনের নাট্যপত্রতে নাট্য সমালোচনা লিখেছে। লিখেছে ব্ল্যাক থিয়েটার নিয়ে প্রবন্ধ, ‘থিয়েটারের হাড়গোড়’ গ্রন্থে নাট্যভাষা নিয়ে নিবন্ধ।ব্রাত্যজনের দলের সঙ্গে অভিনয় করতে সম্রাট গেছে, যেমন দেউলটি থেকে দিল্লি, তেমনই লন্ডন থেকে মার্কিন যুক্তরাজ্য…এখনও মনে পড়ে, এক রাতে ওর কথায় ওর ফ্ল্যাটে নিমন্ত্রণে গেলে, থালায় ধোঁয়া ভর্তি ভাত, আর ওর নিজের হাতে রান্না করা খাবারের কথা, ওর সেই সহর্ষ, আন্তরিক, আনন্দিত দুটি উজ্জ্বল চোখের কথা। আর একরাশ স্বপ্ন আর নতুন উদ্দীপনার কথা। ওর কৌতুক বোধও প্রবল তীব্র আর অন্তর্ঘাতী ছিল।”
এই চিঠিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শব্দের ফাঁকফোকরে উঠে এসেছে নীচু তারে বাঁধা নাট্যকারের বিষাদের সুর – “আমার পুরনো বহু সঙ্গীদের ভেতরে আমি নিশ্চিত ভাবেই বহুদিন হল মারা গিয়েছি। আমার ভেতরে তাদেরও অনেকে মারা গেছেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে দেখা না হলেও সম্রাট সচল আর তুঙ্গ জীবন্ত হয়ে আমার ভেতরে বেঁচে ছিল।”
বহু চরিত্রে অভিনয় করলেও, দর্শক আজও মনে রেখেছেন ‘রুদ্ধসঙ্গীত’ নাটকে তাঁর করা ‘হেমাঙ্গ বিশ্বাস’ চরিত্রটি। আজ সেই সদাহাস্যময় মুখে মৃত্যুর ঘোর। বন্ধুকে নিয়ে ব্রাত্যর শেষ উপলব্ধি— “আজীবন আমার ভেতরে ধকধক করে বেঁচেও থাকবে। অবিকল সম্রাটের মতই।”
ব্রাত্য বসু তাঁর চিঠিতে লিখেছেন, “সম্রাট আর আমি একসঙ্গে বহুবার ব্রাত্যজনের মঞ্চে উঠেছি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে।” ‘শহর ইয়ার’, ‘হেমলাট’, ‘কৃষ্ণগহ্বর’, ‘রুদ্ধসঙ্গীত’, ‘কে?’, ‘বোমা’, ‘মীরজাফর’—এমন বহু নাটকে সম্রাট নিজের অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছেন। শুধু মঞ্চ নয়, ব্রাত্যর পরিচালিত ছবি ‘তারা’-তেও সম্রাট ছিলেন অনন্য। এমনকী নাট্যপত্র বা থিয়েটার নিয়ে প্রবন্ধ লেখাতেও তিনি ছিলেন সমান দক্ষ। দেউলটি থেকে দিল্লি, লন্ডন থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র—ব্রাত্যজনের সঙ্গে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে নাটকের টানে ছুটে গিয়েছেন তিনি।















