বুধবার সকালে ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ খ্যাত প্রখ্যাত পরিচালক অনীক দত্ত-র আকস্মিক ও মর্মান্তিক প্রয়াণে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে গোটা টলিপাড়া। নিজের আবাসনের চত্বর থেকে ওঁর নিথর দেহ উদ্ধারের পর থেকেই ওঁর মৃত্যুর আসল কারণ নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র ধোঁয়াশা। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে ঘটনাটি ‘আত্মহত্যা’ বলে অনুমান করা হলেও, তদন্তকারীরা জানিয়েছেন যে ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়। আজ সন্ধ্যায় পরিচালকের দেহ ময়নাতদন্তের জন্য এসএসকেএম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হবে।

অনীকের এই আকস্মিক চলে যাওয়া যেন কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছেন না ওঁর ছবির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ, বর্ষীয়ান অভিনেতা পরান বন্দ্যোপাধ্যায় । বড়পর্দার পাশাপাশি একাধিক বিজ্ঞাপনেও অনীকের পরিচালনায় কাজ করেছেন তিনি। ‘আজকাল ডট ইন’-এর সঙ্গে কথা বলার সময় প্রবীণ অভিনেতার গলা বুজে আসছিল তীব্র বিষাদে।

 

 

বিস্ময় ও শোকের ধাক্কা সামলে পরান বন্দ্যোপাধ্যায় স্মৃতিচারণ করে বলেন, “জানি না কী বলব, কীভাবে বলব। ওঁর সঙ্গে আমার আলাপ বহু বছরের। ও যে নেই, এটা বলতেও গলা কাঁপছে আমার। ও আমার থেকে কত ছোট... কী যে হয়ে গেল আচমকা! এত স্পিরিটেড, পড়াশোনা জানা এবং ‘উইটি’ মানুষ ভাবা যায় না। ওঁর রসবোধ ছিল মারাত্মক। শুটিংয়ের ফাঁকে আমাকে একবার বলেই ফেলেছিল, ‘ওহ পরানদা, একটু খারাপ অভিনয় কি একেবারেই করতে পারেন না? মাঝেসাঝে চেষ্টা করে দেখুন না!’ আসলে সমাজের প্রতি তীব্র মনোযোগ ছিল ওঁর, না থাকলে এমন ব্যঙ্গাত্মক ছবি বানানো যায় না।”

অনীক দত্ত যে কাজের ক্ষেত্রে চরম ‘পারফেকশনিস্ট’ ছিলেন, সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে পরান শোনালেন ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ শুটিংয়ের এক মজাদার ও নস্টালজিক গল্প। পরিচালক হিসেবে অনীক সেটের ডিজাইন থেকে শুরু করে কস্টিউম— সব বিভাগেই নাক গলাতেন এবং একটু এদিক-ওদিক হলেই প্যানিক করে অস্থির হয়ে উঠতেন।

 

 

সেই অভিজ্ঞতার কথা টেনে পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এর একটা দৃশ্যে আমার চরিত্রটির মদ্যপান করে একটু ঢুলুঢুলু হয়ে কথা বলার কথা ছিল। আমি শট দিচ্ছি, কিন্তু অনীকের পছন্দ হচ্ছে না। খালি বলছে— ‘স্পিড, স্পিড, আরও একটু স্পিড।’ বুঝলাম, ও ঠারেঠোরে আমাকে অভিনয় শেখানোর চেষ্টা করছে! আমার ভারী বিরক্ত লেগেছিল। শেষমেশ রেগে গিয়ে বলেই ফেললাম, ‘তুমিই দেখিয়ে দাও।’ এত লোকের সামনে উপায় না দেখে অনীক নিজেই অভিনয় করে দেখাল। ওটা দেখেশুনে আমি বললাম, ‘অনীক, তুমি খুব বাজে অভিনয় করলে, তাই আমি ওটা নকল করতে পারছি না! তবে এবারে আমি যা করছি দ্যাখো।’ শটটা দেওয়ার পর অনীকের এতটাই ভালো লেগেছিল যে ও এক গাল হাসি নিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল। এই ছিল আমাদের অনীক।”

আদর্শে অটল, খামখেয়ালি অথচ অসম্ভব প্রতিভাবান এই মানুষটির এমন মর্মান্তিক পরিণতি কোনওভাবেই মেনে নিতে পারছে না স্টুডিও পাড়া। এসএসকেএম-এর ময়নাতদন্তের রিপোর্টের পরেই হয়তো পরিষ্কার হবে, বাংলা সিনেমার এই ‘অপরাজিত’ পরিচালকের জীবনের শেষ দৃশ্যটা ঠিক কীভাবে লেখা হয়েছিল।