টলিপাড়ায় আরও এক যুগের অবসান। শেষ হল বাংলা সিনেমার এক স্বতন্ত্র, স্পষ্টবক্তা ও মেরুদণ্ডী পরিচালকের জীবনাবসান। আর শোনা যাবে না সেই দৃপ্ত, আপসহীন কণ্ঠস্বর। বুধবার নিজের আবাসনের চত্বর থেকেই উদ্ধার হল ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ খ্যাত বিশিষ্ট পরিচালক অনীক দত্ত -র নিথর শরীর। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে অনুমান, এটি আত্মহত্যার ঘটনা। তবে পুলিশ আরও জানিয়েছে, তদন্ত চলছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পূর্ণাঙ্গ না এলে স্পষ্ট করে কিছু বলা সম্ভব নয়। ফলে পরিচালকের মত্যুর কারণ ঘিরে ধোঁয়াশা এখনও অব্যাহত। আজ সন্ধেবেলায় অনীক দত্তের দেহ ময়নাতদন্তের জন্য এসএসকেএম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হবে। 


অনীক দত্তের আকস্মিক মৃত্যুতে হতভম্ব টলিপাড়া। এখনও বিস্ময় কাটেনি বর্ষীয়ান অভিনেতা দুলাল লাহিড়ীরআজকাল ডট ইন-কে জানালেন, এদিন একটি ধারাবাহিকের শুটিং করছিলেন তিনি। তার মাঝেই এই খবরটি পান। শুনে হা-হুতাশ করার আগে বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গিয়েছিলেন। কোনওরকমে নিজেকে সামলে যখন অনীক দত্তের বাড়ি যাওয়ার উদ্যোগ করেছিলেন, শুটিংয়ের চাপে পরিচালকের অনুমতি পাননি। কারণ নির্ধারিত দৃশ্যের শুটিং ছিল। যাই হোক, যতক্ষণে তা পাওয়া গেল প্রয়াত পরিচালকের এক সহকারী তাঁকে জানান, অনীক দত্তের দেহ মর্গে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাই আগামীকাল আসলেই শেষ দেখা হবে। অগত্যা একরাশ মনখারাপ নিয়ে তাই মেনে নিয়েছেন বর্ষীয়ান অভিনেতা। 

অনীক দত্তকে নিয়ে স্মৃতির পাতা উল্টিয়ে দুলাল লাহিড়ী বলে উঠলেন, " পড়াশোনা, রসবোধ, এবং প্রতিভা-সবই ছিল অনীকবাবুর মধ্যে। ছবি পরিচালনার ক্রাফ্টসগুলো জানতেন। ছবি তৈরির বিভিন্ন বিভাগে টিনার তীক্ষ্ণ নজর যেমন ছিল, তেমনই ছিল পরিষ্কার ধারণা। খুব চাইতাম অন্তত ওঁর পরিচালিনায় একটিমাত্র ছবিতে যেন কাজ করতে পারি। দেরি হলেও, তা সম্ভব হয়েছিল। অনীকবাবুর শেষ ছবি যত কাণ্ড কলকাতাতেই আমি একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছিলাম। অনীকবাবু নিজেই সে ছবির প্রস্তাব দিতে ফোন করেছিলেন। বলেছিলেন,'আমার এই ছবিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করবেন? যদি হ্যাঁ বলেন, আমার খুব ভাল লাগবে।' শুনেই বলে উঠেছিলাম, 'গুরুত্বপূর্ণ শব্দটা বাদ দিন। আপনার ছবিতে যেকোনও চরিত্র-ই গুরুত্বপূর্ণ। আমি স্রেফ আপনার ছবিতে কাজ করতে চাই.' শুনে ভারী খুশি হয়েছিলেন। 

 

 

অনীকবাবু কিন্তু অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মেজাজটা খুব ভাল বুঝতেন। স্বাধীনতা দিতেন। তবে নজর রাখতেন। ছবির ওয়ার্কশপের দিনগুলোর কথা টেনে দুলালবাবু জানান, ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’ ছবির প্রস্তুতির সময় অনীকবাবু ইতিমধ্যেই মারাত্মক অসুস্থ ছিলেন। ওঁর বাড়িতেই আবির চট্টোপাধ্যায়, কাজী নওশাবাদের উপস্থিতিতে ওয়ার্কশপ করাচ্ছিলেন ওঁর সহকারী বেণী। দুলাল লাহিড়ীর কথায় -“অনীকবাবু নিজে পাশের ঘরে থাকতেন। প্রয়োজন পড়লে গুটিগুটি পায়ে হেঁটে এসে বেণীকে বলতেন— ‘ব্যাপারটা ওভাবে নয়, এভাবে চাইছি।’ ব্যস, ওটুকুই নির্দেশ দিয়ে আবার ঘরে ফিরে যেতেন। অভিনেতাদের স্বাধীনতায় কখনো হস্তক্ষেপ করতেন না, এটাই ছিল ওঁর ভরসা আর সম্মান প্রদর্শনের অনন্য রীতি।”
শুটিংয়ের মাঝের এক আবেগঘন মুহূর্তের কথা স্মরণ করে প্রবীণ অভিনেতা বলেন, “একদিন আমি অনীকবাবুর পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে গিয়েছিলাম। ও দেখে আঁতকে উঠে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল— ‘এ কী করছেন দুলালবাবু! আমি আপনার থেকে অনেক ছোট।’ আমি পাল্টা জবাব দিয়েছিলাম— আমি আপনার থেকে শুধু এজে (বয়সে) বড়, কিন্তু আপনি বড় ইমেজে (Image)! শুনে খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন অনীকবাবু।”


দেখুন, আমাদেরও তো বয়স হল....আজকাল খুব কষ্ট হয় আচমকা এরকম কোনও খবর শুনলে। আর প্রিয় মানুষের বিষয়ে শুনলে তো কষ্ট চতুর্গুণ বেড়ে যায়। অনীক দত্তের কাজের ভীষণ ভক্ত ছিলাম আমি আর থাকবও। আমার ব্যক্তিগত অভিমত, পরিচালক তপন সিন্হা, বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর উত্তরসূরি ছিলেন তিনি। যে ভূতের ভবিষ্যৎ, বরুণবাবুর বন্ধু-র মতো ছবি বানাতে পারেন, তাঁর ছবি তৈরি করা, ছবির গল্প বলার ক্ষমতা সম্পর্কে আলাদা করে আমার না বললেও চলবে। আমার মনে হয় না, নিজের জীবদ্দশায় আরেকটি অনীক দত্ত আমি দেখে যেতে পারব... " কথা বলতে বলতে গলা বুজে আসে প্রবীণ অভিনেতার।