টলিপাড়ায় আরও এক যুগের অবসান। শেষ হল বাংলা সিনেমার এক স্বতন্ত্র, স্পষ্টবক্তা ও মেরুদণ্ডী পরিচালকের জীবনাবসান। আর শোনা যাবে না সেই দৃপ্ত, আপসহীন কণ্ঠস্বর। বুধবার নিজের আবাসনের চত্বর থেকেই উদ্ধার হল ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ খ্যাত বিশিষ্ট পরিচালক অনীক দত্ত -র নিথর শরীর। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে অনুমান, এটি আত্মহত্যার ঘটনা। তবে পুলিশ আরও জানিয়েছে, তদন্ত চলছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পূর্ণাঙ্গ না এলে স্পষ্ট করে কিছু বলা সম্ভব নয়। ফলে পরিচালকের মত্যুর কারণ ঘিরে ধোঁয়াশা এখনও অব্যাহত। আজ সন্ধেবেলায় অনীক দত্তের দেহ ময়নাতদন্তের জন্য এসএসকেএম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হবে। 


অনীক দত্তের আকস্মিক মৃত্যুতে হতভম্ব টলিপাড়া। কোনওরকমে বিস্ময়ে কাটিয়ে উঠিয়েই শোকে ভেঙে পড়েছেন জনপ্রিয় বাংলাদেশি মডেল-অভিনেত্রী কাজী নওশাবা আহমেদ। অনীক দত্ত পরিচালিত শেষ ছবি ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’-এ প্রধান অভিনেত্রীর ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল তাঁকে। আজকাল ডট ইন-এর তরফে ফোনে এ খবর শুনে নিজেকে সামলাতে পারেননি সাবা। অঝোরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। খানিক সময় নিয়ে কোনওরকমে সামলে উঠে বলে ওঠেন, “কী অদ্ভুত বলুন, একজন মানুষকে কত সহজে আমরা স্মৃতি বলে ফেলছি, নেই বলে ফেলছি। অনীকদা শুধু আমার কাছে একজন পরিচালক ছিলেন না। ছিলেন একজন অভিভাবকের মতো। ওঁর সঙ্গে আলাপটাও ভারী অদ্ভুতভাবে হয়েছিল।”

 

 

অনীক দত্তর সঙ্গে নওশাবার আলাপ হওয়ার গল্পটি ছিল আর পাঁচটা সম্পর্কের চেয়ে আলাদা –“বাবা মারা যাওয়ার পর ফেসবুকে বাবার স্মৃতিতে, তাঁকে মনে করে খোলা চিঠি লিখতাম। সেসব পড়েই কিন্তু অনীকদা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সেই লেখাগুলো যে ওঁর মনে ধরেছিল তা বুঝেছিলাম যখন তিনি খুব গাঢ়ভাবে বলেছিলেন, ‘তোমার বাবাকে লেখা চিঠিগুলো পড়েই তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। মনে হয়, আমি মারা যাওয়ার পর আমার মেয়ে রাই-ও আমার জন্য এভাবে খোলা চিঠি লিখবে।’ তারপর কথা বাড়ে। এরপর একদিন উনি যত কাণ্ড কলকাতাতেই ছবির জন্য আমাকে প্রস্তাব দেন। ওভার দ্য ফোন স্ক্রিপ্ট রিডিং হয়, সত্যজিৎ রায় সমন্ধে আমাকে অনেককিছু বুঝিয়েছিলেন। আলোচনায় উঠে এসেছিল কলকাতা শহরের নানান কথা। জানেন, আমার অভিনীত চরিত্রটির নাম আগে কিন্তু ‘সাবা’ ছিল না। আমি সেই ছবিতে সুযোগ পাওয়ার পর অনীকদা সেই চরিত্রটির নাম বদলে আমার নাম রাখেন! 

ছবি আঁকা, ক্লাসিক্যাল মিউজিক শোনানো, কী না করেছেন ওই ছবির জন্য আমাকে গড়েপিটে তৈরি করে নেওয়ার জন্য। বাবার মৃত্যুর পর আমার কাছে অনীকদা শুধুই অভিভাবক নন, একজন শিক্ষক হয়ে উঠেছিলেন। বাংলাদেশে চুটিয়ে মঞ্চে অভিনয় করতে করতে যখন ভাবতাম কোনওদিনও বড়পর্দায় কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ পাব কি না, ঠিক সেই সময় ভরসা জুগিয়েছিলেন অনীকদা। সুযোগ দিয়েছিলেন। এর জন্য আমৃত্যু ওঁর কাছে আমি কৃতজ্ঞ থাকব। 


চলতি মাসেই সত্যজিৎ রায়ের জন্মবার্ষিকীতে শেষবার অনীক দত্তর সঙ্গে দীর্ঘ আড্ডা হয়েছিল নওশাবার। সত্যজিতের আঁকা ছবি, পুরনো ভিডিও নিয়ে দুই বাংলায় আদান-প্রদান চলত। কথায় কথায় ওপার বাংলার কুমিল্লার কথা উঠত বারবার, কারণ ওটাই ছিল অনীক দত্তর আদি বাড়ি। নওশাবা স্মৃতিচারণ করে বলেন, “একবার ভীষণ আবেগপ্রবণ হয়ে অনীকদা বলেছিলেন— ‘জানিস তোরা সবাই মিলে এমন করে অনুরোধ করিস যে ভাবছি শরীরটা ঠিক হলে আর একটা অন্তত ছবি পরিচালনা করব। আমার খুব ইচ্ছে জানিস, কুমিল্লায় আমার সেই ছবিটাও মুক্তি পাবে। বাবা-মায়ের মুখে এত শুনেছি সেই জায়গার কথা, আমাদের সেই বাড়ির কথা, আমার খুব ইচ্ছে জানিস...।’ শেষবার আমি ওঁকে ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’ ছবিটা বাংলাদেশে রিলিজ করার অনুরোধ করি। উনি খুশি হয়ে প্রযোজক ফিরদৌসুল হাসানকে চেষ্টা করতে বলবেন জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ছবি রিলিজ না হলেও এ জীবনে অন্তত একবার বাংলাদেশে আসতে চান। তা আর হল কই?”

বলতে বলতে ফের কান্নায় বুজে আসে নওশাবার গলা। তবে বাবার মৃত্যুর পর জীবন দর্শনের এক নতুন পাঠ শিখেছেন অভিনেত্রী। কথা শেষে ওঁর সংযোজন— “মানুষকে স্মৃতি ভাবতে নেই। অনীক দত্ত ঠিক সেরকমই একজন মানুষ, যাঁকে সবসময় টের পাওয়া যায়। আমার ব্যক্তি জীবনে, শিল্পী জীবনে অনীকদার আশীর্বাদ আমি সারাজীবন টের পাব।”