বলিউডের মেগা-অ্যাকশন ছবি ‘আলফা’ মুক্তি পেয়েছে বড়পর্দায় আর ছবি দেখার পরেই এক অদ্ভুত এবং রোমাঞ্চকর মিল খুঁজে পাবেন বাঙালি সিনেপ্রেমী ও বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর ভক্তরা। যশ রাজ ফিল্মসের স্পাই ইউনিভার্সের এই ছবিতে দেখানো হয়েছে, একটি বিশেষ বৈজ্ঞানিক ফর্মুলা বা ‘আলফা সিরাম’ শরীরে যাওয়ার পর আলিয়া ভাট এবং শর্বরী ওয়াঘের চরিত্র দুটি অবিশ্বাস্য রকমের শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই সিরামের প্রতিটি গুণ এবং অলৌকিক ক্ষমতার কথা শুনলে সত্যজিৎ-ভক্ত যেকোনও বাঙালির মনে পড়তে বাধ্য গিরিডির সেই বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানীকে— যিনি আর কেউ নন, সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্টি প্রফেসর ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু!
এটি কি শুধুই এক অদ্ভুত কাকতালীয় মিল? না কি বলিউডের এই আধুনিক স্পাই থ্রিলার অবচেতনেই হোক বা সজ্ঞানে, অনুপ্রাণিত হয়েছে সত্যজিতের ‘শঙ্কু ডায়েরি’ থেকে? মিলগুলো কিন্তু সত্যিই চমকে দেওয়ার মতো।
১. মিরাকিউরল বনাম আলফা সিরাম: সর্বরোগহর মহৌষধ
‘আলফা’ ছবিতে দেখানো হয়েছে, মানুষের শরীরে বাসা বাঁধা যেকোনো জটিল এবং মারণ রোগও নিমেষে নিরাময় করে দিচ্ছে এই আলফা সিরাম। ঠিক এই জায়গাতেই চলে আসে প্রফেসর শঙ্কুর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার ‘মিরাকিউরল’-এর কথা। ল্যাবরেটরির তৈরি ওষুধ নয়, বরং উত্তর ভারতের এক সাধুর নির্দেশে দুর্গম পাহাড়ি জায়গা থেকে পাওয়া এক বিশেষ গাছড়া আর তার সঙ্গে খাঁটি বৈজ্ঞানিক ফর্মুলা মিলিয়ে শঙ্কু তৈরি করেছিলেন এই বড়ি, যা সেবন করলে ক্যানসার থেকে সাধারণ সর্দি-কাশি— পৃথিবীর যেকোনও রোগব্যাধি জাদুর মতো সেরে যেত। বলিউডের ‘আলফা সিরাম’-এর মধ্যেও কিন্তু লুকিয়ে আছে সেই একই জাদুকরী রোগমুক্তির ক্ষমতার আভাস।
২. অতি-মানবীয় শক্তি এবং ক্ষত নিরাময়
আলফা সিরামের দৌলতে আলিয়া আর শর্বরীর শরীর এতটাই চটপটে ও শক্তিশালী যে, তাঁদের যেকোনও গুরুতর ক্ষত বা আঘাত অন্যদের তুলনায় অত্যন্ত দ্রুত শুকিয়ে যায়। প্রফেসর শঙ্কুর ডায়েরি যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা জানেন শঙ্কুর তৈরি ‘মিরাকিউরল’ অয়েনমেন্ট কিংবা তাঁর আবিষ্কৃত একাধিক শক্তির ওষুধের কাজও ছিল অবিকল এক। মানুষের শারীরিক ক্ষমতাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেওয়া এবং জীবনীশক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করার এই ফর্মুলা শঙ্কু আজ থেকে কয়েক দশক আগেই ডায়েরির পাতায় লিখে গিয়েছেন।
৩. অতি-প্রাকৃতিক শ্রবণশক্তি ও অলফ্যাক্টরি পাওয়ার
ছবির চরিত্ররা বহুদূরের ছোট্ট ছোট্ট জিনিসের আওয়াজ, এমনকি কারও পায়ের শব্দও অনায়াসে শুনতে পায়। মনে করে দেখুন প্রফেসর শঙ্কুর তৈরি সেই ছোট্ট যন্ত্রটির কথা— ‘মাইক্রোসোনোগ্রাফ’ ! যা কানে লাগালে পোকামাকড়দের হাঁটাচলা কিংবা তাদের নিজেদের মধ্যে ফিসফিসানিও স্পষ্ট শুনতে পেতেন শঙ্কু। শুধু তা-ই নয়, শঙ্কুর ডায়েরিতে এমন এক বিশেষ ওষুধের ইনজেকশনের উল্লেখ রয়েছে, যা শরীরে নিলে মানুষের ঘ্রাণশক্তি বা অলফ্যাক্টরি পাওয়ার এতটাই বেড়ে যেত যে, মাইলের পর মাইল দূর থেকেও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম গন্ধ পাওয়া সম্ভব হতো। ‘আলফা সিরাম’ যেন শঙ্কুর এই আলাদা আলাদা আবিষ্কারগুলোকে এক বোতলে পুরে তৈরি করা একটি আধুনিক ককটেল!
আজকের হলিউডি ‘মার্ভেল’ বা ‘ডিসি’র সুপারহিউম্যান সিরাম (যেমন ক্যাপ্টেন আমেরিকার সুপার সোলজার সিরাম) দেখে যাঁরা অভ্যস্ত, তাঁরা হয়তো একে আন্তর্জাতিক ঘরানার বিজ্ঞান কল্পকাহিনি বলবেন। কিন্তু ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যাবে, মার্ভেল কমিক্সের অনেক আগেই সত্যজিৎ রায় বাংলা সাহিত্যে এই ‘সুপার-হিউম্যান’ ফর্মুলার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে গিয়েছিলেন।
বলিউডের চিত্রনাট্যকাররা কি তবে সত্যিই হলিউডকে নকল করতে গিয়ে অজান্তেই ছুঁয়ে ফেললেন বাঙালির নিজস্ব প্রফেসর শঙ্কুকে? না কি আধুনিক বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর সমস্ত পথ ঘুরেফিরে শেষ পর্যন্ত মিলে যায় সত্যজিতের সেই কালজয়ী ভাবনার চৌহদ্দিতেই?
উত্তরের চাবিকাঠি তোলা রইল পাঠকদের কোর্টেই। প্রেক্ষাগৃহে যখন আলিয়া ভাট সিরামের জোরে অসাধ্য সাধন করবেন, তখন পর্দায় সুপারহিরোইনকে দেখে তালি দেবেন, নাকি মনে মনে গিরিডির ল্যাবরেটরির সেই খাঁটি বাঙালি প্রফেসরের দূরদর্শিতার কথা ভেবে গর্ব বোধ করবেন— সেই সিদ্ধান্ত না হয় আপনারাই নিন!
















