প্রতি বছরের মতো এ বছরও দুর্গাপুজোর মুখে গ্রাম থেকে শহরে এসেছে ৭০ বছরের তিলক ঢাকি। সঙ্গে তার নাতি-নাতনিরা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একটাই কাজ, দুর্গাপুজোয় ঢাক বাজানো। এই ঢাকই তাদের জীবিকা, এই ঢাকই তাদের পরিচয়। প্রতিবছর জমিদার অগ্নীশ্বরের বাড়িতে পুজোর বোধন থেকে সন্ধিপুজো পর্যন্ত ঢাক বাজিয়ে এসেছে তিলক। কিন্তু এ বছর ছবিটা বদলে যায়।
অগ্নীশ্বরের ছেলেরা সিদ্ধান্ত নেয়, এবার আর আসল ঢাক নয়, লাউডস্পিকারে বাজবে রেকর্ডেড ঢাকের শব্দ। মিউজিক প্লেয়ারে সেট করা যান্ত্রিক তালই নাকি যথেষ্ট। বোধন আর সন্ধিপুজোর আরতিতে ঢাকির প্রয়োজন নেই -এই বার্তাই কার্যত দিয়ে দেওয়া হয়।অগ্নীশ্বর তিলককে ডেকে কিছু টাকা হাতে ধরিয়ে বলেন, ঢাক না বাজিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে। কথায় কোনও রাগের পরশ লেগে না থাকলেও কিন্তু তাতে ছিল নির্মম অবহেলা। তিলকের কাছে এই মুহূর্তটা শুধুই কাজ হারানোর নয়, এটা অপমানের, অস্তিত্ব হারানোর।ঢাক তার কাছে কেবল বাদ্যযন্ত্র নয়। এটা তার শ্রম, তার আত্মসম্মান, তার জীবনযাপন। যন্ত্রের শব্দের কাছে সেই ঢাক আজ অপ্রয়োজনীয়, এই সত্য মেনে নিতে পারে না তিলক।

সন্ধিপুজোর ঠিক আগে, যখন শহর জুড়ে ঢাকের তালে তালে দেবীর আবাহন, তখনই এক অসম লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নেয় সে। মানুষ বনাম যন্ত্র । লাউডস্পিকারের রেকর্ডেড ঢাকের বিরুদ্ধে নিজের হাতে ধরা ঢাক তুলে নেয় তিলক। শুরু হয় এক প্রতীকী প্রতিযোগিতা যেখানে প্রশ্ন শুধু শব্দের জোর নয়, প্রশ্ন মানুষের অস্তিত্ব।
এই লড়াই আসলে একার নয়। আজ তিলকের মতো অসংখ্য ঢাকি কাজ হারাচ্ছেন। যান্ত্রিক ঢাকের শব্দে থেমে যাচ্ছে জীবন্ত ঢাকের তালে তালে বেঁচে থাকার গল্প। উৎসব যত আধুনিক হচ্ছে, ততই প্রান্তিক হয়ে পড়ছে সেই মানুষগুলো, যাদের হাত ধরে জন্ম নিয়েছিল এই উৎসবের আসল সুর। তিলকের প্রশ্ন সোজা -যন্ত্র তো মানুষই বানিয়েছে। তাহলে যন্ত্র কি মানুষের জায়গা নিতে পারে? প্রযুক্তি কি ঐতিহ্যকে মুছে দিতে পারে?
সন্ধিপুজোর সেই মুহূর্তে ঢাকের প্রতিটা বাড়ি শুধু শব্দ নয়, এক প্রতিবাদ। এক বৃদ্ধ ঢাকির শেষ চেষ্টায় লুকিয়ে থাকে আরও বড় প্রশ্ন, মানুষ কি শেষ পর্যন্ত নিজের সৃষ্টির কাছেই হেরে যাবে, নাকি প্রমাণ করবে যে আত্মা কখনও যন্ত্রে বন্দি হয় না?
তিলক কি পারবে যান্ত্রিক দানবকে হারাতে? উত্তর লুকিয়ে আছে ঢাকের তালে, মানুষের হাতে, আর সেই শব্দে, যা আজও হৃদয়ের ভেতর কাঁপন তোলে। রাহুল সাহা পরিচালিত ছবি ‘ঢাকি’ পরিক্রমা করবে এই প্রশ্নটি নিয়েই।
ছবির পরিচালক তথা চিত্রনাট্যকার রাহুল সাহা এ প্রসঙ্গে বললেন, “ ‘ঢাকি- বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢোলবাদক’ আমার কাছে শুধুমাত্র একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি নয়। এ এক হারিয়ে যেতে বসা সাংস্কৃতিক বাস্তবতার প্রতি আমার ব্যক্তিগত ও আবেগ। বাংলায় ঢাকের শব্দ শুধু সঙ্গীত নয়, তা স্মৃতি, আচার আর পরিচয়ের অংশ। অথচ সেই শব্দের নেপথ্যে থাকা মানুষগুলো অর্থাৎ ঢাকিদের আজ ধীরে ধীরে প্রান্তিক সীমার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।এই ছবি ঢাকিদের জীবনের গল্প বলে, যাঁদের হাতের ছোঁয়া আর ছন্দে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দুর্গাপুজোসহ নানা উৎসব প্রাণ পেয়েছে। তাঁদের নিষ্ঠা, ভালবাসা আর পরিশ্রমের মধ্য দিয়েই এই ছবিতে ধরা পড়েছে বাংলার প্রাণস্পন্দন।
আধুনিকতার নামে যখন যন্ত্রের শব্দ মানুষের শিল্পকে প্রতিস্থাপন করছে, তখন ঢাকিরা শুধু কাজই হারাচ্ছেন না, হারাচ্ছেন তাঁদের সামাজিক মর্যাদা ও অস্তিত্ব। রেকর্ডেড ঢাকের আওয়াজ আজ অনেক জায়গায় জীবন্ত ঢাকির স্থান দখল করে নিয়েছে, যা এই শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলে। “ঢাকি” ছবির মাধ্যমে আমি এই শিল্পীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে চেয়েছি এবং একই সঙ্গে জানতে চেয়েছি, প্রগতির নামে আমরা ঠিক কী হারাচ্ছি? মানুষের হাতের শিল্প কি যন্ত্রের কাছে পরাজিত হওয়া উচিত? আমার বিশ্বাস, এই ছবি মনে করিয়ে দেবে মানুষের গল্প আর জীবন্ত ঐতিহ্যকে বাদ দিয়ে কোনও উন্নতিই সম্পূর্ণ নয়।
