বলিউডের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ক্লাসিক ছবি ‘থ্রি ইডিয়টস’ এবং তার মূল চরিত্র ‘ফুংসুখ ওয়াংড়ু’ (বা রনছোড়দাস শ্যামলদাস চঞ্চড়) আদতে কার অনুপ্রেরণায় তৈরি? এতদিন দর্শক থেকে শুরু করে সিনেমা সমালোচক— প্রত্যেকেই জানতেন লাদাখের বিখ্যাত শিক্ষাবিদ ও পরিবেশ আন্দোলনকর্মী সোনম ওয়াংচুকের জীবন এবং তাঁর স্কুল থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে এই চরিত্রটি বুনেছিলেন রাজকুমার হিরানি ও আমির খান । কিন্তু সম্প্রতি লন্ডনের ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটে দাঁড়িয়ে আমির খান দাবি করেন, ছবি বানানোর সময় তাঁরা নাকি সোনম ওয়াংচুককে চিনতেনই না!
আমিরের এই মন্তব্যের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় সোনম ওয়াংচুকের একটি পুরোনো ভিডিও নতুন করে ভাইরাল হয়েছে। আর সেই ভিডিওতে লাদাখের সমাজকর্মীর করা এক বিস্ফোরক দাবি ফাঁস হতেই নেটিজেনরা আমির খানকে ‘মিথ্যেবাদী’ এবং ‘প্রতারক’ বলে তোপ দাগতে শুরু করেছেন।
ভাইরাল হওয়া সেই পুরোনো ভিডিওতে সোনম ওয়াংচুককে স্পষ্ট দাবি করতে শোনা যাচ্ছে যে, ‘৩ ইডিয়টস’ মুক্তি পাওয়ার এক বছর আগে অর্থাৎ ২০০৮ সালে মুম্বইয়ের একটি অনুষ্ঠানে আমির খানের সঙ্গে তাঁর সামনাসামনি দেখা হয়েছিল। শুধু দেখাই নয়, দু'জনের মধ্যে সিনেমা সংক্রান্ত এক গভীর আলোচনাও চলেছিল।
ভিডিওতে সোনম ওয়াংচুক বলছেন, “আমি আমিরকে বলেছিলাম, সিয়াচেনের সীমান্ত উত্তেজনা নিয়ে আপনি একটা ছবি বানাতে পারেন? যেখানে এক চিলতে বরফের টুকরোর জন্য ভারত-পাকিস্তান রোজ প্রায় ৭ কোটি টাকা খরচ করছে। ছবিতে কি দেখানো যায় না যে দুই দেশের সাধারণ মানুষ এই সমস্যার সমাধান করছে আর সেই বেঁচে যাওয়া কোটি কোটি টাকা শিক্ষার কাজে লাগানো হচ্ছে? আমির আমার আইডিয়া খুব মনোযোগ দিয়ে শুনেছিলেন এবং লাদাখে আমার স্কুলের কাজের ওপর একটা অডিও-ভিজ্যুয়াল প্রেজেন্টেশনও দেখেছিলেন।”
ওয়াংচুক আরও জানান, এই ঘটনার পর তিনি মাটির বাড়ি তৈরির স্থাপত্যবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনার জন্য ফ্রান্সে চলে যান। কিন্তু ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে যখন ‘থ্রি ইডিয়টস’ মুক্তি পায়, তখন ওঁর কাছে একের পর এক ফোন ও মেসেজ আসতে শুরু করে যে— ওঁর স্কুল এবং ওঁর চরিত্রের ওপর ভিত্তি করে বানানো একটি ছবি ভারতে ব্লকবাস্টার হিট হয়েছে! শুনে আকাশ থেকে পড়েছিলেন ওয়াংচুক।
সোনম ওয়াংচুক সেই ভিডিওতে আরও একটি বিস্ফোরক তথ্য শেয়ার করেছেন। ছবি মুক্তির খবরের পর তিনি লাদাখে ওঁর নিজের স্কুলে খোঁজ নেন। সেখান থেকে তিনি জানতে পারেন যে, ২০০৮ সালের আগস্ট নাগাদ একটি সিনেমার শুটিং ইউনিট সেখানে এসেছিল। কিন্তু ওঁর স্কুলের পরিবেশ সচেতন ছাত্ররা শুটিং টিমকে ফিরিয়ে দেয়! ওয়াংচুকের কথায়, “ওরা সেটে প্রচুর প্লাস্টিকের জিনিসপত্র ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছিল। আমাদের পরিবেশবান্ধব স্কুলের ছাত্ররা তা দেখে রেগে যায় এবং আমাদের ক্যাম্পাসে শুটিং করার অনুমতি দিতে সরাসরি অস্বীকার করে।”
ওঁর স্কুল থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে শুটিং ইউনিটটি বাধ্য হয়ে লাদাখেরই অন্য একটি স্কুলে গিয়ে ছবির সেই বিখ্যাত ‘লাদাখ স্কুল’ সিকোয়েন্সের শুটিং সারে।
এর ঠিক উল্টো সুর শোনা গিয়েছিল আমিরের মুখে। লাদাখে সোনম ওয়াংচুকের অনশন আন্দোলন নিয়ে কথা বলার সময় আমির দাবি করেছিলেন, “না, ওটা ভুল ধারণা। আমরা যখন ছবিটা বানাচ্ছিলাম, তখন সোনম ওয়াংচুক মশাইয়ের ব্যাপারে আমি কিছুই জানতাম না। সম্প্রতি চতুর (ওমি বৈদ্য)-এর একটা ভিডিও দেখছিলাম যেখানে ও বলছিল ওটা ওঁর ওপর ভিত্তি করে তৈরি... ও ভুল বলছে। আমি স্পষ্ট জানাতে চাই রাজু (হিরানি), অভিজাত (চিত্রনাট্যকার) বা আমি— কেউই সোনমকে চিনতাম না।”
এই বয়ান সামনে আসতেই নেটপাড়ায় সমালোচনার ঝড় উঠেছে। এক ক্ষুব্ধ এক্স ব্যবহারকারী লিখেছেন, “ এই ছবি মুক্তি পেয়েছিল ২০০৯ সালে, অথচ আমির ২০০৮ সালেই সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। এমনকি ওঁর স্কুলে ২০০৮ সালের আগস্টে শুটিং করতেও গিয়েছিল টিম। যে মানুষের স্কুল থেকে ওঁর টিমকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল প্লাস্টিক ব্যবহারের জন্য, সেই সোনমকে আমির চিনতেনই না— এই দাবিটা একেবারেই ধোপে টেকে না!”
অন্য একজন কটাক্ষ করে লিখেছেন, “আমির হয়তো তখন ‘গজনি’ ছবির শুটিং করছিলেন। চরিত্র থেকে বেরোতে পারেননি বলেই হয়তো ওঁর শর্ট-টার্ম মেমোরি লস হয়েছে আর উনি এই মিটিংয়ের কথা বেমালুম ভুলে গেছেন!” অনেকেই আবার আমিরকে ‘সুবিধাবাদী’ বলেও দেগে দিয়েছেন। বিশ্বমঞ্চে সত্যি আড়াল করার এই চেষ্টা মিস্টার পারফেকশনিস্টের ভাবমূর্তিতে বড়সড় ধাক্কা দিল বলেই মনে করছেন সিনে-বিশেষজ্ঞরা।
















