আজকাল ওয়েবডেস্ক: রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণার ২৪ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই প্রশাসনিক অন্দরে শুরু হয়েছে তীব্র টানাপোড়েন। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে মঙ্গলবার একযোগে যে ২০ জন আইপিএস অফিসারকে তাঁদের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, বুধবার তাঁদের জন্য নতুন অ-নির্বাচনী পদের নির্দেশিকা জারি করল নবান্ন। কমিশনের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল, নির্বাচনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কোনও পদে এই অফিসারদের রাখা যাবে না। সেই নির্দেশকে মান্যতা দিয়েই রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তর বুধবার একটি তালিকা প্রকাশ করেছে, যেখানে অপসারিত আধিকারিকদের গোয়েন্দা বিভাগ, প্রশিক্ষণ ও সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু ‘নন-ইলেকশন’ ডিউটিতে নিয়োগ করা হয়েছে।
এই রদবদলের তালিকায় সবথেকে উল্লেখযোগ্য নাম আইপিএস রাজীব মিশ্র। এডিজি (দক্ষিণবঙ্গ) পদ থেকে অপসারিত হওয়ার পর তাঁকে এডিজি (সংস্কার ও সমন্বয়) পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একইভাবে কলকাতা পুলিশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ডিসি (সেন্ট্রাল) পদ থেকে সরানো হয়েছিল ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়কে। তাঁকে এবার রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ অর্থাৎ সিআইডির স্পেশাল সুপারিন্টেন্ডেন্ট (এসএস) পদে পাঠানো হয়েছে। ব্যারাকপুর এবং আসানসোল-দুর্গাপুরের মতো শিল্পাঞ্চলের দুই পুলিশ কমিশনার প্রবীণ কুমার ত্রিপাঠী ও সুনীল কুমার চৌধুরীকে বর্তমানে রাজ্য পুলিশের এসটিএফ-এর আইজি পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো বা আইবি-তে একঝাঁক অভিজ্ঞ অফিসারকে নিয়ে আসা হয়েছে। আইজি (উত্তরবঙ্গ) পদ থেকে অপসারিত সুকেশ কুমার জৈনকে আইবির আইজি করা হয়েছে। একইভাবে হাওড়া ও চন্দননগরের অপসারিত দুই কমিশনার আকাশ মাঘারিয়া ও ডঃ কোটেশ্বর রাওকে আইবির ডিআইজি পদে নিয়োগ করা হয়েছে। এছাড়াও জেলা থেকে সরানো ছয় জন পুলিশ সুপার— যথাক্রমে জোবি থমাস (ইসলামপুর), অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় (মালদহ), আমনদীপ (বীরভূম), কামনাশিস সেন (হুগলি গ্রামীণ), ধৃতিমান সরকার (মুর্শিদাবাদ) এবং হোসেন মেহেদি রহমানকে (জঙ্গিপুর) আইবির স্পেশাল সুপারিন্টেন্ডেন্ট হিসেবে নিয়োগ করে তাঁদের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে চাইছে নবান্ন।
প্রশাসনিক ও পুলিশি কাঠামোয় এই রদবদল কেবল নবান্নের সিদ্ধান্তেই সীমাবদ্ধ নেই। রবিবার রাত থেকেই কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোট করানোর লক্ষ্যে কমিশনের নির্দেশে রাজ্য পুলিশের শীর্ষ স্তরেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। বর্তমান ডিজি পীযূষ পাণ্ডেকে সরিয়ে সিদ্ধনাথ গুপ্তকে রাজ্যের নতুন ডিজি করা হয়েছে। কলকাতা পুলিশ কমিশনার সুপ্রতীম সরকারকে সরিয়ে এই পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অজয় কুমার নন্দাকে। বিনীত গোয়েলকে ডিজি (আইনশৃঙ্খলা) পদ থেকে সরিয়ে আইবি-র শীর্ষ পদে পাঠানো হয়েছে এবং তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন অজয় মুকুন্দ রানাডে। এমনকি প্রশাসনিক শীর্ষ স্তরেও বড় রদবদল ঘটেছে, রাজ্যের নতুন মুখ্যসচিব হিসেবে দুষ্মন্ত নারিয়ালা এবং স্বরাষ্ট্রসচিব হিসেবে সঙ্ঘমিত্রা ঘোষ ইতিমধ্যেই তাঁদের কার্যভার গ্রহণ করেছেন।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার স্পষ্ট জানিয়েছেন, আগামী ২৩ এবং ২৯ এপ্রিল দুই দফায় রাজ্যে ভোট হবে। রাজ্যে নির্বাচনের আদর্শ আচরণবিধি কার্যকর হওয়ার পরেই জেলাস্তরেও ডিআইজি পদের পাঁচ আধিকারিককে বদল করা হয়েছে। কমিশনের লক্ষ্য হলো ভোট প্রক্রিয়ায় কোনওভাবেই যাতে প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব না থাকে। পাল্টা চাল হিসেবে নবান্নও তাদের দক্ষ অফিসারদের হাতছাড়া না করে প্রশাসনিক গুরুত্ব বজায় রেখে বিভিন্ন দপ্তরে পুনর্বহাল করেছে। নির্বাচনের আগে পুলিশ ও প্রশাসনের এই ব্যাপক রদবদল রাজ্যের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে এক নজিরবিহীন পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যা আগামী দিনগুলোতে ভোট পরিচালনায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
