আজকাল ওয়েবডেস্ক: মাঝে চলে গিয়েছে অনেকটা সময়। সর্বসাধারণের কাছে এখন যোগাযোগের জন্য নানা উন্নত যন্ত্রপাতি। সময়ের চাকা ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে বদলে গিয়েছে নির্বাচনী প্রচারের সংজ্ঞাও। একসময় ভোট আসা মানেই ছিল পাড়ায় পাড়ায় দেওয়াল দখলের লড়াই। চুনকামের গন্ধে ম-ম করত পাড়ার অলিগলি। আর সেই সাদা ক্যানভাসে ফুটে উঠত রাজনৈতিক দলের তীক্ষ্ণ সব ছড়া, ব্যাঙ্গাত্মক কার্টুন আর প্যারোডি। কোথাও শ্লেষ, কোথাও বিদ্রূপ—দেওয়াল লিখন ছিল বাঙালির এক অনন্য রাজনৈতিক শিল্পকলা। কিন্তু আজ? আধুনিক যন্ত্রসভ্যতার দাপটে সেই শিল্প এখন ‘নীরবে নিভৃতে কাঁদে’।

ভোটযুদ্ধের দামামা বেজে গিয়েছে ঠিকই, কিন্তু রাজ্যের অন্যান্য জায়গার মতো হাওড়ার উত্তর থেকে দক্ষিণ—দেওয়ালগুলোর দিকে তাকালে এখন যেন এক অদ্ভুত শূন্যতা গ্রাস করছে। এবারের বিধানসভা উপলক্ষে দেওয়াল লিখনের পর্ব চুকে গেলেও সেখানে পুরনো দিনের সেই ধারাল ছড়া বা আকর্ষণীয় কার্টুন আর চোখ টানে না। অথচ ইতিহাস বলছে, ১৯৬৯-এর নির্বাচনে যখন যুক্তফ্রন্ট জিতেছিল, তখন কংগ্রেসের দেওয়ালে লেখা হয়েছিল— যুক্তফ্রন্টে কী পেলাম/ গুলি-বুলি-লাল সেলাম। পাল্টা জবাব দিতে ছাড়েনি বামেরাও।

৩৪ বছরের বাম জমানায় আবার দেওয়ালে দেওয়ালে ফিরত বিরোধীদের লেখা সেই ছড়া— ‘চাঁদ উঠেছে ফুল ফুটেছে/ ছাঁদনাতলায় কে?/ হাতি নাচছে, ঘোড়া নাচছে/ জ্যোতিবাবুর বে।’ পাল্টা জবাবে ইন্দিরা গান্ধীকে নিয়েও ছড়া কাটতেন বামপন্থীরা। ১৯৮৯-এর নির্বাচনে বফর্স কেলেঙ্কারি নিয়ে রাজীব গান্ধীকে আক্রমণ করে লেখা ‘গলি গলি মে শোর হ্যায়/রাজীব গান্ধী চোর হ্যায়’ স্লোগান গোটা দেশে নাড়া ফেলে দিয়েছিল। রাজনৈতিক তর্ক বিতর্কে এই স্লোগানটি নিয়ে এখনও আলোচনা হয়। এমনকী ২০১১-র পটপরিবর্তনের সময় তৃণমূলের সেই বিখ্যাত ‘মা-মাটি-মানুষ এক্সপ্রেস’-এর দেওয়াল লিখন আজও প্রবীণ ভোটারদের স্মৃতিতে টাটকা।

হাওড়ার প্রবীণ বাসিন্দা পুলকেশ নস্কর আক্ষেপের সুরে বলেন, “ছোটবেলায় দেখতাম ভোট মানেই একটা উৎসব। এখন দেওয়ালগুলোতে সেই মেজাজ নেই। ছড়া খুঁজতে এখন আতশ কাচ লাগে।” তবে তিনি এও মেনে নিয়েছেন, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন ব্যবস্থাকে গ্রহণ করতেই হবে।

একই সুর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের গলাতেও। হাওড়া জেলা সদরের বিজেপি সম্পাদক অজয় মান্নার মতে, ডিজিটাল প্রচারের ব্যাপক প্রসারের কারণেই দেওয়াল লিখনের গুরুত্ব কমেছে। অন্যদিকে, সিপিএম জেলা সম্পাদক দিলীপ ঘোষ মনে করেন, প্রচারের মাধ্যম বদলালেও প্রতিভা হারিয়ে যায়নি। দেওয়াল লিখনে আগের মতো আক্রমণাত্মক বা সৃষ্টিশীল ছড়া কম দেখা গেলেও সমাজ মাধ্যমে তা বিপুলভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।

সংখ্যায় নগণ্য হলেও কিছু দেওয়ালে এখনও ছড়ার মাধ্যমে লড়াই চলছে। যেমন তৃণমূলের পক্ষে “পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বেঁধেছে জোট/ জোড়া ফুলে মারবে ভোট।” বা মমতা ব্যানার্জির প্রকল্প নিয়ে লেখা— “স্কুলে যেতে সবুজসাথী/ অসুস্থ হলে স্বাস্থ্যসাথী।”

বিজেপির পাল্টা ছড়া “সবুজ ঘাসে জোড়া ফুল/ বাংলা ডোবাবে তৃণমূল।” অথবা “মা কাঁদছে/ মাটি ফাটছে/ মানুষ বলছে/ বিজেপি আসছে।”

 বামেরাও ঝড় তুলছে “গ্রামে গ্রামে পড়ছে সাড়া/ চোরেরা এবার পড়বে ধরা।” বা তৃণমূল-বিজেপি আঁতাঁত নিয়ে খোঁচা— “ও পাড়ার মোদি আর/ এ পাড়ার মমতা।"

যদিও ফ্লেক্স, ব্যানার আর সোশ্যাল মিডিয়ার রিলসের ভিড়ে দেওয়াল লিখন আজ কোণঠাসা। একসময় যেখানে দেওয়াল দখল নিয়ে রক্তক্ষয়ী লড়াই চলত, আজ সেখানে অনেক দেওয়ালই ফাঁকা পড়ে থাকে। কার্টুন বা প্যারোডির জায়গা নিয়েছে গ্রাফিক ডিজাইন। বাঙালির নির্বাচনী সংস্কৃতি থেকে এই ঘরোয়া সৃজনশীলতা কি তবে চিরতরে হারিয়ে যাবে? উত্তরটা সময়ের গর্ভেই লুকিয়ে। তবে প্রবীণদের চোখে এখন শুধুই সেই পুরনো দিনের রঙিন স্মৃতি আর দেওয়ালে দেওয়ালে এক অজানা বিমর্ষতা।