আজকাল ওয়েবডেস্ক: ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবার মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জের বিধানসভার মাঠে। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে সামশেরগঞ্জ আসনে এবার মূল লড়াই দুই বিড়ি ফ্যাক্টরির মালিকের। 

গত বিধানসভা নির্বাচনে সামশেরগঞ্জ আসন থেকে তৃণমূলের প্রতীকে  জয়ী হয়েছিলেন আমিরুল ইসলাম। এবছর রাজ্যের শাসকদল আসন পরিবর্তন করে আমিরুলকে ফরাক্কা বিধানসভা কেন্দ্রে লড়তে পাঠিয়েছে।  তাঁর পরিবর্তে এবার সামশেরগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূলের  প্রার্থী মহম্মদ নুর আলম ,যিনি এলাকায় 'বিজলী  বিড়ি'কোম্পানির মালিক হিসেবে পরিচিত। 

অন্যদিকে কংগ্রেস এবার নির্বাচনী ময়দানে নামিয়েছে এলাকার অপর এক পরিচিত বিড়ি ব্যবসায়ী নাজমে আলমকে।  তিনিও এলাকার পরিচিত বিড়ি ফ্যাক্টরি, 'আনন্দ বিড়ি' কোম্পানির মালিক। 

মুর্শিদাবাদ জেলার রাজনীতিতে জঙ্গিপুর মহকুমার বিড়ি শ্রমিকেরা নির্বাচনী ময়দানে প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণে বরাবরই বড় ভূমিকা পালন করে থাকেন। তাই জঙ্গিপুর মহকুমায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী তালিকায় বরাবরই বিড়ি শিল্পপতিদের নাম থাকে। এবছরও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন 'শিব বিড়ি' কোম্পানির মালিক তথা জঙ্গিপুরের বিদায়ী বিধায়ক জাকির হোসেন। জঙ্গিপুরে তৃণমূল সাংসদ খলিলুর রহমান নিজেও একজন বড় বিড়ি ব্যবসায়ী। পাশাপাশি সাগরদিঘির তৃণমূল প্রার্থী বায়রন বিশ্বাসও বিড়ির ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তবে সামশেরগঞ্জ কেন্দ্রে এবার দুই বিড়ি 'ব্যারন'-এর লড়াই সকলের নজর কেড়েছে। 

মুর্শিদাবাদ জেলার জঙ্গিপুর মহকুমায় প্রায় ১০ লক্ষ বিড়ি শ্রমিক থাকেন। বিড়ি শ্রমিকদের ভোট যে রাজনৈতিক দলের পক্ষে থাকে তাঁদের প্রার্থীর জয় একপ্রকার নিশ্চিত এখানে। তাই তৃণমূলের পক্ষ থেকে সামশেরগঞ্জ কেন্দ্রে একজন বিড়ি ফ্যাক্টরি মালিককে দলের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করতেই 'লোহা দিয়ে লোহা কাটার' নীতি মেনে কংগ্রেসও অপর এক জনপ্রিয় বিড়ি ফ্যাক্টরির মালিককে তাদের দলের প্রার্থী করেছে বলেই অনেকের অনুমান। 

সামশেরগঞ্জের মাটিতে পা দিলেই বোঝা যায় তৃণমূল বা কংগ্রেস দুই রাজনৈতিক দলের প্রার্থীই সক্রিয় রাজনীতির ময়দানে একেবারেই 'আনকোরা'। প্রার্থী হিসেবে নাম ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘন্টা আগে তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন নুর আলম। আর কংগ্রেস প্রার্থী কবে সরকারিভাবে 'হাত' চিহ্ন ধরেছেন তা মনে করতে পারেন না জেলার অনেক কংগ্রেস নেতাই। তবে অনেকেই বলে থাকেন, ভোটের ময়দানে প্রথম নামলেও পর্দার আড়ালে থেকে দু'ই প্রার্থী দীর্ঘদিন ধরে অনেক প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণ করেছেন। এবার তাঁদের নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণ হওয়ার পালা। 

তবে সামশেরগঞ্জের মাটিতে কোন বিড়ি ফ্যাক্টরির মালিক বেশি জনপ্রিয় তা নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত এখানকার জনগণ। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, কংগ্রেস প্রার্থী নাজমে আলমের বিড়ি কোম্পানি আশির দশকে পথ চলা শুরু। তবে তুলনামূলকভাবে অনেক নতুন তৃণমূল প্রার্থী নুর আলমের বিড়ি কোম্পানি। যদিও দান-ধ্যান এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে দুই রাজনৈতিক দলের প্রার্থীকেই অতীতে বহুবার দেখা গিয়েছে। 

রাজ্য জুড়ে চলা এসআইআর পর্বে, মুর্শিদাবাদ জেলায় সবথেকে বেশি, প্রায় ১১ লক্ষ ভোটারের নাম 'বিচারাধীন' তালিকায় ছিল।  তার মধ্যে সামশেরগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রেই প্রায় ১.১৯ লক্ষ ভোটারের নাম 'বিচারাধীন' তালিকায় ছিল, যা জেলার মধ্যে সর্বোচ্চ। 

সূত্রের খবর,মঙ্গলবার পর্যন্ত মুর্শিদাবাদ জেলায় প্রায় সাড়ে চার লক্ষের বেশি ভোটারের নাম এসআইআর পর্বে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। তার মধ্যে সামশেরগঞ্জ বিধানসভা এলাকার প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটারের নাম স্থায়ীভাবে 'ডিলিট' হয়েছে। 

তাই এবার সামশেরগঞ্জের মাটিতে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের সংখ্যালঘু দুই প্রার্থীর লড়াই যথেষ্ট কঠিন। এই কেন্দ্রে বিজেপির তরফ থেকে প্রার্থী করা হয়েছে দলের প্রাক্তন জেলা সভাপতি ষষ্ঠীচরণ ঘোষকে। 

তবে ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে প্রায় ১৬ হাজার ভোটে সামশেরগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্র থেকে এগিয়ে থাকার তথ্য কংগ্রেস প্রার্থীকে বাড়তি কিছু অক্সিজেন দিচ্ছে বলে দাবি স্থানীয় কংগ্রেস নেতৃত্বের। কংগ্রেস প্রার্থী তাঁর নির্বাচনী প্রচারে বিভিন্ন ইস্যুর সঙ্গে সামশেরগঞ্জে গঙ্গা ভাঙনে  ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির দুরবস্থার কথা বারবার তুলে ধরছেন।  

অন্যদিকে তৃণমূল প্রার্থী  নিজের নির্বাচনী প্রচারে রাজ্য সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের কথা এবং তার সুবিধা কীভাবে সামশেরগঞ্জবাসী পেয়েছেন তার বিস্তারিত খতিয়ান তুলে ধরছেন। তবে বিপুল সংখ্যক সংখ্যালঘু মানুষের নাম ভোটার তালিকায় না ওঠায় চিন্তায় রয়েছেন দুই বিড়ি ফ্যাক্টরির মালিকই। 

তবে সূত্রের খবর এই পরিস্থিতিতে নিজেদের জয় নিশ্চিত করতে ইতিমধ্যেই দুই বিড়ি ফ্যাক্টরির মালিকই নিজেদের কর্মচারী এবং তাঁদের  পরিবারের ভোটব্যাঙ্ককে বড় হাতিয়ার করতে চলেছেন। 

তৃণমূল নেতৃত্ব মনে করছেন, বিড়ি শিল্পে মহিলা শ্রমিকদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় এবং রাজ্য সরকার 'লক্ষীর ভান্ডার' প্রকল্পের মাধ্যমে যেভাবে মহিলাদের উন্নয়ন করার চেষ্টা করেছে তার সুবিধা তৃণমূল প্রার্থী পেতে পারেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা সামশেরগঞ্জ এলাকায় দুই প্রার্থীর ব্যক্তিগত এবং ব্যবসায়িক প্রতিপত্তি থাকায় ভোট প্রচারে টাকা পয়সার খেলাও চলতে পারে। 
 
তবে ৪ মে ইভিএম বাক্স খুললে তারপরেই বোঝা যাবে দুই বিড়ি 'ব্যারন'-এর লড়াইয়ে সামশেরগঞ্জের সাধারণ মানুষ কার পক্ষে রায় দিলেন।