বিভাস ভট্টাচার্য: গাড়ির উপর দাঁড়িয়ে জনসংযোগ করতে করতে যাচ্ছিলেন। রাস্তায় কিছুটা দুরে এক বৃদ্ধা হাত নেড়ে ডাকলেন। চোখে পড়তেই সোজা গাড়ি থেকে নেমে তাঁর কাছে। কী হয়েছে প্রশ্ন করতেই বৃদ্ধা জানালেন, বাড়ির সামনে 'স্ট্রিট লাইট'-এর ল্যাম্পটা খারাপ হয়ে গিয়েছে। অন্ধকারে যাতায়াত করতে খুব কষ্ট হচ্ছে। শুনেই সঙ্গের এক স্থানীয় নেতাকে নির্দেশ, প্রয়োজনে পকেটের টাকা খরচ করে হলেও ল্যাম্প কিনে লাগিয়ে দিতে হবে এবং কাজটা বিকেলের মধ্যে করে দিতে হবে।  বৃদ্ধাকে প্রণাম করে উঠে পড়লেন গাড়িতে। গাড়ি এগিয়ে চলল প্রচার করতে করতে। পাশ থেকে কর্মীদের আওয়াজ উঠল "আমার আপনার ঘরের ছেলে তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী স্নেহাশিস চক্রবর্তী জিন্দাবাদ।" 

গ্রাম ও আধা শহরের মিশ্রণ হুগলির জাঙ্গিপাড়া বিধানসভা কেন্দ্র। এই এলাকায় যেমন রয়েছে কৃষিকাজ ও ব্যবসা তেমনি রয়েছে চাকুরিজীবী মানুষের সংখ্যাও। এলাকায় একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান হলো ফুরফুরা শরীফ। যা মুসলিম ধর্মাবলম্বী মানুষের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি তীর্থক্ষেত্র। গ্রাম ও আধা শহরের মিশ্রণে জাঙ্গিপাড়ায় রয়েছে একাধিক বাণিজ্যকেন্দ্র। গ্রামের ভিতরেও রাস্তাঘাট ভালোই।  

"দেখুন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি তাঁর উন্নয়ন প্রকল্পের যতগুলো পদক্ষেপ নিয়েছেন তার প্রত্যেকটাই এই বিধানসভা কেন্দ্রে হয়েছে।" স্নেহাশিসের দাবি। কিন্তু আপনি তো বিদায়ী মন্ত্রীসভার পরিবহন মন্ত্রী। এই এলাকায় পরিবহনের উন্নয়নের জন্য আপনি আলাদা করে কী কী পদক্ষেপ নিয়েছেন? বিদায়ী পরিবহন মন্ত্রী জানান, "এলাকায় নতুন বাসস্ট্যান্ড থেকে যাত্রীদের চাহিদায় নতুন রুট চালু করা, যেটুকু করা যায় তার সবটাই করেছি। হ্যাঁ, এটা ঠিক সমস্ত দাবি বা চাহিদা তো একবারে পূরণ করা যায় না, ফলে যেটুকু বাকি আছে সেটুকুও আগামীদিনে করে দেব।" 

গ্রামের রাস্তার ধারে ধারে ক্ষেত। ক্ষেতের বিভিন্ন কোণায় পড়ে আছে বস্তাবন্দি আলু। যা রাজ্যের অন্যান্য জায়গার মতো এই অঞ্চলের কৃষকদের কাছেও চিন্তার বিষয়। জানা গেল, কোল্ড স্টোরেজ-এ আর আলু রাখার জায়গা নেই। ফলে বাধ্য হয়েই কৃষকরা আলু প্যাকেটে বন্দি করে ক্ষেতের ধারে ফেলে রেখে দিয়েছেন। ভবিষ্যতেও এই ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। সেই বিষয়ে কী কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভেবেছেন? তৃণমূল প্রার্থীর কথায়, "এই বছরে আলুর অস্বাভাবিক ফলন হয়েছে। দু'এক বছর অন্তর অন্তর এটা হয়। নাবার্ড-এর তথ্য অনুযায়ী হুগলিতে যত কোল্ড স্টোরেজ আছে তার সবকটি একেবারে ভর্তি। এই ফলন তো প্রতি বছর হয় না। ফলে একটা কোল্ড স্টোরেজ যদি এখন তৈরি করা হয় সেটা কিন্তু স্বাভাবিক ফলনের সময় ফাঁকা পড়ে থাকবে। মালিক বড়সড় ক্ষতির মুখে পড়বেন।" 

আপনার এলাকায় ফুরফুরা শরীফ। যা মুসলিম ধর্মাবলম্বী মানুষের কাছে একটি তীর্থস্থান..। মুখের কথা কেড়ে নিয়ে স্নেহাশিস বলেন, "কাজের কথা বলছেন তো? রাস্তাঘাট, আলো, ওজুখানা, শৌচাগার-সহ যা যা দরকার তার সবটাই মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির উদ্যোগে করা হয়েছে।" 

দেশ-সহ রাজ্যে একটা জ্বলন্ত চাহিদা হল কর্মসংস্থান। এলাকার বেকার যুবক বা যুবতীদের কর্মসংস্থানের জন্য আলাদা কিছু চিন্তাভাবনা আছে? 

স্নেহাশিসের কথায়, "দেখুন কর্মসংস্থান বলতে কিন্তু শুধু চাকরি নয়। সচরাচর আমরা সেটাই বুঝি। সরকারি বা বেসরকারি যেখানেই হোক না কেন, সেখানে কিন্তু তারা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ীই কিন্তু লোক নেবে। কিন্ত খেয়াল রাখতে হবে চাকরির বাইরেও কিন্তু জীবিকা অর্জনের জন্য বিভিন্ন পেশা রয়েছে। সেইদিক দিয়ে দেখতে গেলে দেখবেন গত ১৫ বছরে কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে ৪০ শতাংশ বেকারত্ব কমেছে। আমাদের রাজ্য এমএসএমই-তে প্রথম। ১ কোটি ৩৫ লক্ষ মানুষ এর সঙ্গে যুক্ত। ৯০ লক্ষের বেশি 'ইউনিট' চলছে। জাঙ্গিপাড়ায় তাঁত শিল্প বা জরি শিল্পের সঙ্গে বহু মানুষ যুক্ত‌। আমরা উদ্যোগ নিয়েছি ভবিষ্যতে এই ক্ষেত্রগুলোকে আরও বেশি উন্নত করার।" 

মিষ্টির জগতেও জাঙ্গিপাড়ার একটা আলাদা পরিচিতি আছে। এই অঞ্চলের রাবরি খুবই প্রসিদ্ধ। এখানকার উৎপাদিত রাবরি কলকাতা-সহ অন্যান্য জেলাতেও লোকের রসনার পরিতৃপ্তি আনে। এই রাবরির যাতে উৎপাদন এবং বিপণন আরও বেশি বাড়ানো যায় সেই সম্পর্কে কি কিছু ভেবেছেন? 

প্রার্থীর উত্তর, "প্রস্তাব এলে অবশ্যই ভাবব।" 

প্রার্থী ঘোষণার আগে এবং এই মুহূর্তেও আপনার বিধানসভা এলাকার একজন ব্যক্তি আপনার সম্পর্কে নানান কথা বলে চলেছেন। কীভাবে দেখছেন? 

প্রশ্ন এড়িয়ে না গিয়েই খুব ঠাণ্ডা স্বরে স্নেহাশিস বলেন, "দেখুন রাজনীতি করতে এসে কখনও কাউকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করিনি। জাঙ্গিপাড়ার মানুষ আমায় জানেন। তারপরও বলছি কেউ একজন অতৃপ্ত আত্মার মতো কিছু বলে চলেছেন। যিনি বলে চলেছেন তিনি আজকের সমাজে একজন মূল্যহীন ব্যক্তি। আগামী ৪মে'র পর তিনি নিজেই সেটা বুঝতে পারবেন।"