আজকাল ওয়েবডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভোট কুড়োনোর লড়াইয়ে কেবল দলীয় সংগঠন নয়, বরং জনমোহিনী ক্ষমতা এবং আবেগের মেলবন্ধন ঘটাতে মরিয়া তৃণমূল কংগ্রেস। আর এই কৌশলী লড়াইয়ের ময়দানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তুরুপের দুই প্রধান তাস হয়ে উঠেছেন দুই লোকসভা সাংসদ— সায়নী ঘোষ এবং দেব। এককালে বিনোদন জগতের পরিচিত মুখ হলেও, আজ তাঁরা আর নিছক 'সেলিব্রেটি' নন, বরং দলের দুটি ভিন্ন ধারার রাজনৈতিক স্তম্ভ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

যাদবপুরের সাংসদ সায়নী ঘোষের উত্থান অত্যন্ত পরিকল্পিত এবং নজরকাড়া। মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা এই অভিনেত্রী যখন সক্রিয় রাজনীতিতে পা রাখেন, তখন তাঁর ওপর বড় দায়িত্ব ছিল তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করা। তৃণমূল মুখপাত্র কুণাল ঘোষের মতে, সায়নী কেবল মঞ্চে উপস্থিত থাকার জন্য রাজনীতিতে আসেননি। ২০২১ সালে রাজ্য যুব তৃণমূলের সভানেত্রী হিসেবে তাঁর নিয়োগ প্রমাণ করেছিল যে দল তাঁকে দিয়ে কড়া রাজনৈতিক লড়াই লড়াতে চায়। ২০২৪ সালের নির্বাচনে যাদবপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র থেকে জয়লাভের পর সায়নী আজ বিরোধী শিবিরের কাছে এক তীক্ষ্ণ ও লড়াকু কণ্ঠস্বর। তিনি যেমন আক্রমণাত্মক মেজাজে প্রতিপক্ষকে জবাব দিতে পারেন, তেমনি সপাট বক্তৃতায় যুবসমাজ ও প্রথম দফার ভোটারদের রক্ত গরম করে দিতে পারেন।

অন্যদিকে, সুপারস্টার দেবের রণকৌশল একেবারেই আলাদা। ঘাটালের এই সাংসদ তাঁর শান্ত এবং নম্র আচরণের জন্য সর্বজনগৃহীত। মেদিনীপুর থেকে মুম্বই— তাঁর জীবনের এই চড়াই-উতরাইয়ের গল্প সাধারণ মানুষের কাছে তাঁকে অনেক বেশি কাছের করে তুলেছে। কুণাল ঘোষের ভাষায়, দেবের ক্ষেত্রে নতুন করে পরিচয়ের প্রয়োজন পড়ে না। তাঁর মুখ, তাঁর কণ্ঠ এবং তাঁর পারিবারিক পটভূমি আমজনতার কাছে অত্যন্ত পরিচিত এবং নির্ভরযোগ্য। রাজনৈতিক ময়দানে দেব কখনওই খুব একটা আক্রমণাত্মক মেজাজে থাকেন না, বরং তাঁর উপস্থিতিই যেকোনও সভাকে একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে রূপ দেয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে বাংলার পর্যটনের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর করে তাঁর এই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তাকেই প্রশাসনিকভাবে কাজে লাগাতে চেয়েছেন।

নির্বাচনী রণকৌশল নির্ধারণকারী সংস্থা আইপ্যাক-এর এক পদস্থ কর্তার মতে, এই দুই নেতাকে ঘিরে তৃণমূলের এক সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। সায়নী ঘোষ যেখানে দলের হয়ে লড়াকু এবং 'ফায়ারি' ইমেজ ধরে রাখেন, সেখানে দেব জনমনে এক ধরণের স্নিগ্ধতা ও ভরসা জোগাতে কাজ করেন। সায়নী আকৃষ্ট করেন সেইসব ভোটারদের যাঁরা কড়া রাজনৈতিক বার্তা পছন্দ করেন, আর দেবের আবেদন পৌঁছয় মধ্যবিত্ত পরিবার, চলচ্চিত্র প্রেমী এবং শান্তিপ্রিয় ভোটারদের কাছে।

প্রবীণ তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এই দুই নেতার ভূমিকা খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, সায়নী দলকে দেয় ধারালো ধার, আর দেব দলকে দেয় ব্যাপক প্রসার। সায়নী যেখানে জনসভাকে রাজনৈতিক চার্জড মোমেন্টে পরিণত করেন, দেব সেখানে এক বিশাল জনসমুদ্র টেনে আনেন। বাংলার সাংস্কৃতিক জগতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এই দুই সাংসদ এখন তৃণমূলের আধুনিক প্রচার কৌশলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সব মিলিয়ে, রুপোলি পর্দার এই তারকা যুগল এখন বাংলার রাজনীতির ময়দানে ঘাসফুল শিবিরের সবচেয়ে কার্যকর সম্পদে পরিণত হয়েছেন।