ইন্দ্রজিৎ রায়
আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে বীরভূমে রাজনৈতিক উত্তাপ যখন ক্রমশ বাড়ছে, সেই আবহেই খয়রাশোলের গোষ্ঠডাঙ্গাল মাঠে অনুষ্ঠিত জনসভা ঘিরে উঠে এল রাজ্যের অন্যতম শিল্প প্রকল্প ‘দেউচা পাঁচামি’। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এই প্রকল্পকে সামনে রেখেই ভবিষ্যতের শিল্পোন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের রূপরেখা তুলে ধরেন।
বক্তৃতার শুরু থেকেই দেউচা পাঁচামিকে কেন্দ্র করে তিনি স্পষ্ট বার্তা দেন, এটি শুধুমাত্র একটি কয়লাখনি প্রকল্প নয়, বরং রাজ্যের অর্থনৈতিক মানচিত্র বদলে দেওয়ার অন্যতম হাতিয়ার।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কয়লাখনি হিসেবে পরিচিত এই প্রকল্প সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হলে অন্তত এক লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, দীর্ঘদিন ধরে কাজের খোঁজে ভিনরাজ্যে পাড়ি দেওয়া বহু যুবক-যুবতী এবার নিজেদের জেলাতেই কাজের সুযোগ পাবেন।
মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, ইতিমধ্যেই প্রকল্প এলাকায় প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। পাথর উত্তোলনের কাজ চালু হয়েছে এবং যাঁরা জমি দিয়েছেন, তাঁদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পাশাপাশি পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অগ্রাধিকার দিয়ে চাকরি দেওয়ার আশ্বাসও দেন তিনি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “দেওচা পাঁচামিতে যে কোল ইন্ডাস্ট্রি হচ্ছে, সেখানে এক লক্ষ ছেলেমেয়েদের কর্মসংস্থান হবে। মনে রাখবেন, বীরভূম, বাঁকুড়া, পশ্চিম বর্ধমান–এই তিন জেলা আগামী দিনে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেস্টিনেশন হিসেবে গড়ে উঠবে। দেউচা পাঁচামিতে ইতিমধ্যেই কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। পাথর তোলার কাজ। আমরা ইতিমধ্যেই বেশ কিছু চাকরিও দিয়েছি। ক্ষতিপূরণও দিয়েছি। সেখানে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হলে মানুষজন কাজও নিশ্চয়ই পাবেন।”
বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও এই প্রকল্পের গুরুত্ব বিশেষভাবে তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, 'রাজ্যের নিজস্ব কয়লা উত্তোলন শুরু হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ অনেকটাই কমে যাবে।'
এর ফলে ভবিষ্যতে বিদ্যুতের দাম কমার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি তাঁর দাবি, এই প্রকল্প পূর্ণমাত্রায় চালু হলে আগামী ১০০ বছরেও বাংলায় লোডশেডিংয়ের সমস্যা থাকবে না।
পূর্বতন বাম সরকারের আমলে বিদ্যুৎ সঙ্কটের প্রসঙ্গ টেনে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, “তখন একবার নয় হাজার বার শুনতাম, রাতে রাস্তায় বসে থাকতাম, রাতে হ্যারিকেন জ্বালিয়ে পড়তাম। কারণ তখন ছিল লোডশেডিংয়ের সরকার। আমরা স্লোগান দিতাম লোডশেডিংয়ের সরকার আর নেই দরকার। আজকে আপনারা কেন গর্ববোধ করবেন জানেন? এই দেউচা পাঁচামি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়ে গেলে আগামী একশ বছর কোনও বিদ্যুতের অভাব এই বাংলার মানুষের হবে না। পাশাপাশি বিদ্যুতের দামও কমবে। দুর্ভাগ্য, এইদিকে কেউ তাকায়নি। আপনারা কি জানেন এটা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কয়লা খনি?'
তবে এই প্রকল্প ঘিরে বিতর্কও কম হয়নি। জমি অধিগ্রহণ, পরিবেশগত প্রভাব এবং স্থানীয় মানুষের উদ্বেগ—এই সমস্ত বিষয়ও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।
যদিও মুখ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করেন, উন্নয়নের স্বার্থে কাউকে বঞ্চিত করা হবে না, এবং সবকিছুই আইন মেনে ও মানুষের স্বার্থ রক্ষা করেই করা হবে।
সবমিলিয়ে, খয়রাশোলের এই জনসভা থেকে ‘দেউচা পাঁচামি’ প্রকল্পকে সামনে রেখে যে বার্তা দেওয়া হল, তা নিঃসন্দেহে আসন্ন নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং পরিকাঠামোগত উন্নয়ন এই তিনটিকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতের যে স্বপ্ন দেখানো হল, তা বীরভূম-সহ গোটা দক্ষিণবঙ্গের মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। এখন দেখার, এই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে সম্ভব হয়।
















