আজকাল ওয়েবডেস্ক: প্রথম দফার বিধানসভা নির্বাচন মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবেই সম্পন্ন হওয়ার পরই রাজ্যের শিল্পাঞ্চল আসানসোলে সামনে এল অশান্তির ছবি। শুক্রবার রাতের এক খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শনিবার সকাল থেকেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে আসানসোল উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রের একাংশ। নিহত ব্যক্তির নাম দেবদীপ চট্টোপাধ্যায়। তিনি স্থানীয়ভাবে কংগ্রেসের সমর্থক এবং সক্রিয় কর্মী হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলে জানা গিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে খবর, শুক্রবার গভীর রাতে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে গাড়িতে করে বাড়ি ফিরছিলেন দেবদীপ। অভিযোগ, সেই সময়ই একদল দুষ্কৃতী তাঁর গাড়ির পথ আটকে দেয়। এরপর গাড়ি থেকে নামতে বাধ্য করা হয় তাঁকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, প্রথমে বচসা এবং পরে তা মারধরে গড়ায়। অভিযোগ, দুষ্কৃতীরা দেবদীপকে লক্ষ্য করে বেধড়ক মারধর শুরু করে। লাথি, ঘুষি, এমনকি মাটিতে ফেলে নির্মমভাবে আঘাত করা হয়। গুরুতর জখম অবস্থায় পড়ে থাকা দেবদীপকে উদ্ধার করা হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যু হয়।
এই ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে গোটা এলাকায়। শনিবার সকালে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যখন মৃতদেহ আসানসোল দক্ষিণ পুলিশ ফাঁড়ির সামনে এনে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন স্থানীয় বাসিন্দা ও কংগ্রেস সমর্থকরা। দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং কঠোর শাস্তির দাবিতে স্লোগান ওঠে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয় বিশাল পুলিশবাহিনী।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে। আসানসোল উত্তরের কংগ্রেস প্রার্থী প্রসেনজিৎ পুইতুণ্ডি সরাসরি তৃণমূলের বিরুদ্ধে আঙুল তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, এই খুনের নেপথ্যে রয়েছে তৃণমূলের ‘পোষা গুন্ডারা’। তিনি বলেন, “দেবদীপ আমারই আবাসনের বাসিন্দা ছিল। আবাসনের অনেকের মতো সেও আমার হয়ে নির্বাচনী প্রচার করেছিল। শুক্রবার রাতে স্ত্রী ও বাচ্চাকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিল। তখন কিছু দুষ্কৃতী ওর গাড়ি আটকায়। ওদের সঙ্গে বচসা হলে দেবদীপ আমার নাম করে জানায় যে বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ করবে। আমার নাম শুনেই ওরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং ওকে বেধড়ক মারধর করে। শেষ পর্যন্ত ওর মৃত্যু হয়।”
প্রসেনজিৎ আরও দাবি করেন, “এরা তৃণমূলের মদতপুষ্ট দুষ্কৃতী ছাড়া আর কেউ নয়। রাতের অন্ধকারে এরা সাধারণ মানুষের উপর হামলা চালায়। এই ঘটনার বিচার না হওয়া পর্যন্ত আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব।”
অন্যদিকে, এই সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলের জেলা নেতৃত্বের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই ঘটনার সঙ্গে তৃণমূলের কোনও যোগ নেই। জেলা তৃণমূলের রাজ্য সম্পাদক ভি শিবদাসন দাশু বলেন, “কংগ্রেসের এখানে তেমন শক্তিই নেই যে তাঁকে সরানোর জন্য এমন পরিকল্পনা করতে হবে। তৃণমূলের এতটা সময় নেই যে একজন কংগ্রেস সমর্থককে খুন করবে? আসলে কংগ্রেসের হাতে কোনও ইস্যু নেই, তাই তারা তৃণমূলকে বদনাম করার চেষ্টা করছে। তবে ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং জঘন্য। আমরা চাই পুলিশ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করুক এবং দোষীদের শাস্তি দিক।”
ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে এলাকায় এখনও উত্তেজনা বজায় রয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, এখনও পর্যন্ত এই ঘটনায় কোনও লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়নি, তবে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তদন্ত শুরু করা হয়েছে। আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান নেওয়া হচ্ছে। খুব শীঘ্রই দোষীদের চিহ্নিত করে গ্রেফতার করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদী পুলিশ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রথম দফার ভোট শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হলেও এই ধরনের ঘটনা ভোট পরবর্তী হিংসার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিরোধী দলগুলির একাংশ ইতিমধ্যেই এই ঘটনাকে ‘ভোট পরবর্তী হিংসার প্রথম বলি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করতে শুরু করেছে। ফলে নির্বাচন যত এগোবে, ততই এই ধরনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ার আশঙ্কা থাকছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়েছে। অনেকেই বলছেন, “ভোটের পর যদি এমন ঘটনা ঘটে, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?” তাঁদের দাবি, অবিলম্বে এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে এবং দোষীদের দ্রুত শাস্তির আওতায় আনতে হবে।”
সব মিলিয়ে, শান্তিপূর্ণ ভোটের পর আসানসোলে এই খুনের ঘটনা রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশকে নতুন করে নাড়িয়ে দিয়েছে। এখন দেখার, পুলিশ তদন্তে কী উঠে আসে এবং এই ঘটনার প্রকৃত রহস্য কত দ্রুত উদ্ঘাটিত হয়। একইসঙ্গে নজর রয়েছে প্রশাসনের উপর— তারা কীভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দেয় এবং আগামী দফাগুলিতে শান্তিপূর্ণ ভোট নিশ্চিত করে।















