পটাশপুরের অলিগলি এখন এক অদ্ভুত দৃশ্যের সাক্ষী থাকছে। আধুনিক যুগের চাকচিক্যময় প্রচার, আকাশছোঁয়া ফ্লেক্স আর বড় বড় এলইডি স্ক্রিনের ঝকঝকে দুনিয়াকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বাংলা যেন ফিরে যাচ্ছে তার পুরনো ঐতিহ্যে। কাঁধে ঝোলা আর হাতে একগুচ্ছ লিফলেট নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাল-ডাল আর সামান্য নগদ সাহায্যের আরজি জানাচ্ছেন সিপিআই প্রার্থী সৈকত গিরি।
2
10
কোনও বড় কর্পোরেট ফাণ্ডিং বা কোটি টাকার বিজ্ঞাপন নয়, মানুষের দেওয়া মুষ্টিভিক্ষার ওপর ভর করেই লোকসভা নির্বাচনের কঠিন লড়াইয়ে নামলেন পূর্ব মেদিনীপুরের এই তরুণ বাম প্রার্থী। এক সময় বামেদের প্রচারে এই দৃশ্য অতি পরিচিত থাকলেও দীর্ঘ সময় ক্ষমতার অলিন্দে থাকার ফলে সেই 'ঝোলা-রাজনীতি'র অভ্যাস কিছুটা ফিকে হয়েছিল।
3
10
তবে বর্তমানে দলের তহবিলের ভাঁড়ারে টান পড়ায় সৈকত গিরি যেন সেই বামপন্থী শিকড়েই ফিরে গেলেন। পটাশপুরের কোনও গৃহস্থের উঠোনে গিয়ে তিনি বলছেন, "আমরা সাধারণ মানুষের দল, আমাদের লড়াইটাও আপনাদের জন্য। একটা পতাকা বা ফেস্টুন বানানোর মতো সামর্থ্য আমাদের নেই। সামান্য কিছু সাহায্য করুন, নগদ না পারলে একমুঠো চাল দিলেও চলবে।" তাঁর এই আন্তরিক আরজিতে সাড়া দিয়ে কেউ দশ-কুড়ি টাকা বাড়িয়ে দিচ্ছেন, আবার কেউ কৌটো ভরে চাল ঢেলে দিচ্ছেন প্রার্থীর কাঁধে থাকা ঝোলায়।
4
10
রাজনৈতিক লড়াইয়ের ময়দানে প্রার্থীরা যখন তাঁদের কোটি কোটি টাকার সম্পত্তির খতিয়ান দেন, ঠিক সেই সময়েই ২০২৬ সালের ২রা এপ্রিল পেশ করা সৈকতের নির্বাচনী হলফনামা এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। হলফনামা অনুযায়ী তাঁর আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত সাদাসিধে; গত পাঁচটি আর্থিক বছরে তিনি কোনও আয়কর রিটার্ন জমা দেননি কারণ তাঁর আয় আয়করের সীমার নিচে।
5
10
বর্তমানে তাঁর একমাত্র আয়ের উৎস হল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিআই) থেকে পাওয়া মাসিক ২,৮০০ টাকার ভাতা। হলফনামা পেশ করার সময় তাঁর কাছে নগদ ছিল মাত্র ২,০০০ টাকা। সৈকতের মোট অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ ৩,১০,১০৪.৭১ টাকা, যার মধ্যে স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার সেভিংস অ্যাকাউন্টে ৬২,১৫৪.৭১ টাকা, একটি পিপিএফ অ্যাকাউন্টে ২,৩৬,৪৫০ টাকা এবং ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার অ্যাকাউন্টে ১০,০০০ টাকা রয়েছে।
6
10
আশ্চর্যের বিষয় হল, তাঁর নিজের নামে কোনও কৃষিজমি, বসতবাড়ি বা অন্য কোনও স্থাবর সম্পত্তি নেই। ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স এবং পিপিএফ ছাড়া শেয়ার বাজার বা বিমা পলিসিতেও তাঁর কোনও বিনিয়োগ নেই এবং তাঁর নামে কোনও ব্যাঙ্ক ঋণ বা সরকারি বকেয়া নেই।
7
10
সৈকত গিরির শিক্ষাগত যোগ্যতাও নজরকাড়া; তিনি ইংরেজি এবং শিক্ষা—এই দুটি বিষয়ে স্নাতকোত্তর এবং বি.এড. ও ডি.এল.এড. ডিগ্রিধারী। এই উচ্চশিক্ষা থাকা সত্ত্বেও তিনি বর্তমানে নিজেকে ‘বেকার’ এবং একজন একনিষ্ঠ ‘সমাজকর্মী’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। পটাশপুরের লোকসভা নির্বাচনে এই শিক্ষিত কিন্তু আর্থিকভাবে স্বচ্ছলতাহীন প্রার্থীর ‘মুষ্টিভিক্ষা’র লড়াই তাই এলাকাবাসীর কাছে এক বিশেষ আবেগঘন দিক হয়ে উঠেছে।
8
10
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পথ বেছে নেওয়ার পেছনে রয়েছে বাস্তব পরিস্থিতি এবং বামেদের কেন্দ্রীয় তহবিলে জৌলুসের অভাব। প্রচারের খরচ সামলাতে জনমত ভিক্ষাই এখন প্রধান সম্বল, আর সেই সংগৃহীত চাল-টাকা দিয়েই তৈরি হচ্ছে নির্বাচনী পোস্টার।
9
10
তবে সৈকত কেবল মাঠেই লড়ছেন না, ফেসবুক ও সোশ্যাল মিডিয়ায় কিউআর কোড দিয়ে ডিজিটাল মাধ্যমেও হাত বাড়িয়েছেন তহবিলের জন্য।
10
10
পুরনো ঐতিহ্য আর নতুন প্রযুক্তির এই মিশেলে এক অভিনব নির্বাচনী লড়াই দেখছে জেলা, যেখানে মানুষের সঙ্গে তৈরি হচ্ছে এক গভীর আত্মিক যোগ। এখন দেখার বিষয়, এই আবেগনির্ভর প্রচার ভোটবাক্সে কতটা প্রভাব ফেলে।