আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির হার অনেক বড় আকার ধারণ করেছে। গত সাত মাসের মধ্যে ফেব্রুয়ারি মাসে এই খাত থেকে সর্বাধিক অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে। ফলে আইটি শেয়ারের গ্রাফ নেমেছে নীচে। নিফটি আইটি ইন্ডেক্সে অন্তর্ভুক্ত ১০টি সংস্থার বাজারমূল্য মিলিয়ে প্রায় ৬২.৮ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত কমে গিয়েছে। 

ন্যাশনাল সিকিওরিটি ডিপোজিটরি লিমিটেডের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ফেব্রুয়ারিতে আইটি শেয়ারের প্রায় ১.৬৯ লক্ষ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে নিফটি আইটির সূচক নেমেছে প্রায় ১৯.৫% এর কাছাকাছি। দুই দশকে, এক মাসে এমন নিম্নমুখী সূচকের মান আর দেখা যায়নি। এমন অবস্থা শেষ দেখা গিয়েছিল ২০০৮-এর বিশ্ব জুড়ে হওয়া আর্থিক সঙ্কটের সময়ে। 

শেয়ার বাজারে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ঘিরে। আমেরিকার প্রযুক্তি সংস্থা যেমন- অ্যান্থ্রোপিক এবং প্যালান্টির টেকনোলজিস নতুন এআই অটোমেশন প্রযুক্তির ঘোষণা করেছে। এর ফলে অনেক বিনিয়োগকারীর মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আগে অনেক সফটওয়ারের কাজ অনেক ইঞ্জিনিয়াররা মিলে করতেন, আগামীতে সেই সমস্ত কাজ এআই দিয়ে করা যাবে। 

দীর্ঘদিন ধরে ভারতের আইটি শিল্প একটি নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী মডেলের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। মূলত এটি দাঁড়িয়ে আছে লেবার আর্বিট্রাজ বা কম খরচে দক্ষ জনবল ব্যবহারের উপরে। অর্থাৎ বড় বড় বিদেশি সংস্থার জন্য ভারতীয় কোম্পানিগুলি বহু ইঞ্জিনিয়ার নিয়ে কাজ করে। এইভাবে কাজ করেই দীর্ঘদিন ধরে বড় মুনাফা এসেছে। কিন্তু এআই ব্যবহারের ফলে বদলাতে পারে পরিস্থিতি। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে মানুষের বদলে প্রযুক্তিই খরচ কমানোর প্রধান উপায় হয়ে উঠতে পারে। ফলে যে কোনও প্রজেক্টে সময় কম খরচ হবে। সফটওয়ার দিয়ে শুধু এআই-কে প্রম্পট দিয়ে করিয়ে নেওয়া যাবে অনায়াসে। 

আরও একটি বড় পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। আগে সংস্থাগুলি সাধারণত কর্মীদের ঘন্টা হিসাবে অর্থ দিত। অর্থাৎ, একজন মানুষ কতক্ষণ কাজ করছেন, তার উপরে নির্ভর করত তাঁর উপার্জন। কিন্তু এখন অনেক সংস্থা, প্রজেক্টের ফলাফলের উপর ভিত্তি করে অর্থ প্রদান করছে। ফলে কর্মীদের উপার্জন কমছে দ্রুত। পাশাপাশে, এর ফলে, আইটি সংস্থাগুলির লভ্যাংশে চাপ পড়তে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। 

ভারতের বড় আইটি সংস্থাগুলি ইতিমধ্যে এআই ক্ষেত্রে অংশীদার হতে শুরু করেছে। যেমন- টাটা কন্সাল্টেন্সি সার্ভিসেস ঘোষণা করছে, তারা ওপেন এআই-এর সঙ্গে হাত মেলাতে চলেছে। অন্যদিকে, ইনফোসিস হাত মিলিয়েছে অ্যান্থ্রোপিকের সঙ্গে। এদের সকলের লক্ষ্য এআই নির্ভর নতুন এন্টারপ্রাইজ সফটওয়্যার তৈরি করা। তবে, এই সফটওয়ারকেন্দ্রীক বাজার এখনও পুরোপুরি তৈরি হয়নি বলে দাবি বিশেষজ্ঞদের। 

আইটি শেয়ারের পতনের নেপথ্যে আরও একটি কারণ রয়েছে বলে দাবি বিশ্লেষকদের। আমেরিকার চাকরির বাজারকে ঘিরে তথ্য সম্প্রতি প্রকাশ পেয়েছে। সেখানে স্পষ্ট বোঝা যায়, অনেক মানুষ চাকরির সুযোগ পেয়েছে। এর ফলে ধারণা তৈরি হয়েছে যে আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক ফেডেরাল রিজার্ভ হয়তো শীঘ্রই সুদের হার কমাবে না। উচ্চ সুদের হার সাধারণত, প্রযুক্তিতে লগ্নি করা শেয়ারের উপর চাপ তৈরি করে। 

ভারতের আইটি সংস্থাগুলির আয়ের একটা বড় অংশ আসে আমেরিকান গ্রাহকদের কাছ থেকে। সেখানে খরচ কমলে প্রযুক্তিকেন্দ্রিক প্রকল্প বা প্রজেক্টও কমে যেতে পারে। তবে আশার কথা এই যে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা পুরোপুরি ভারতীয় বাজার থেকে সরে যাননি। ফেব্রুয়ারিতে মোট হিসাবে প্রায় ২.২৬ লক্ষ কোটি টাকা তারা বিনিয়োগ করেছেন।  শেয়ার বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আইটি খাতে এখন একটি ভ্যালুয়েশন রিসেট চলছে। ভারতের আইটি শিল্প বিশ্বের আইটি পরিষেবা বাজারে বড় ভূমিকা রাখে। প্রতি বছর ২২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি পরিষেবা ভারত থেকে বিশ্বের বাজারে রপ্তানি হয়। তবু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে উৎপাদন হার কমেছে। বিশ্বজুড়ে আইটি পরিষেবা শিল্প এখন মাত্র ৩% থেকে ৫% হারে বাড়ছে। এআই নিয়ে অনিশ্চয়তা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। 

তবে অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, ভয়টা হয়তো কিছুটা অতিরঞ্জিত। তাঁদের মতে এআই কোড লিখতে পারে ঠিকই। ভুল খুঁজে ঠিক করতেও পারে। হয়ত কিছু সফটওয়্যারের কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে করতেও পারে। কিন্তু, বড় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির প্রযুক্তি ব্যবস্থা খুব জটিল। সেগুলি পরিচালনা করতে এখনও মানুষের স্কিল বা দক্ষতার উপরেই নির্ভরশীল হতে হবে। আবার অনেকের মতে, এআই আসলে ইঞ্জিনিয়ারদের কাজ দ্রুত করবে। কিন্তু পুরোপুরি বদলে দিতে পারবে না। তাছাড়া সফটওয়্যার তৈরি সস্তা হলে আরও বেশি সংস্থা ডিজিটাল প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে পারে। সেক্ষেত্রে আইটি পরিষেবার বাজার ভবিষ্যতে আরও বড়ও হতে পারে। তবে বিনিয়োগকারীরা আপাতত বিনিয়োগ করার আগে সতর্ক হচ্ছেন। কোথায় বিনিয়োগ করবেন, সেই নিয়ে ভাবনা চিন্তা করছেন।