আজকাল ওয়েবডেস্ক: চাকরিজীবীদের অবসরকালীন আর্থিক সুরক্ষার অন্যতম ভরসা এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ড। প্রতি মাসে কর্মীর বেতনের একটি অংশ এবং নিয়োগকর্তার সমপরিমাণ অবদান এই তহবিলে জমা পড়ে। দীর্ঘ সময় ধরে সুদ যুক্ত হতে হতে এই অর্থ অবসরের সময় বড় অঙ্কের সঞ্চয়ে পরিণত হয়। তবে অনেকেই মনে করেন, ইপিএফে জমা হওয়া অর্থ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ করমুক্ত। বাস্তবে বিষয়টি ততটা সহজ নয়। অবদান জমা, সুদ অর্জন এবং টাকা তোলার প্রতিটি ধাপে করের নিয়ম আলাদা।
কর ও বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞদের মতে, ইপিএফকে একটি একক করমুক্ত প্রকল্প হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং কোন পর্যায়ে কী ধরনের কর সুবিধা পাওয়া যায়, তা স্পষ্টভাবে জানা জরুরি। এই নিয়মগুলি বুঝতে পারলে কর্মীরা ভবিষ্যতের আর্থিক পরিকল্পনা আরও ভালোভাবে করতে পারবেন এবং অপ্রত্যাশিত করের বোঝাও এড়াতে পারবেন।
ইপিএফে প্রতি মাসে সাধারণত কর্মী এবং নিয়োগকর্তা উভয়েই কর্মীর বেসিক বেতনের ১২ শতাংশ করে জমা দেন। তবে এই দুই অবদানের ক্ষেত্রে করের নিয়ম এক নয়। কর্মীর নিজের অবদানের ক্ষেত্রে পুরনো কর ব্যবস্থায় আয়কর আইনের ধারা ৮০সি অনুযায়ী নির্ধারিত সীমার মধ্যে কর ছাড় দাবি করা যায়। কিন্তু যারা নতুন কর ব্যবস্থা বেছে নিয়েছেন, তারা সাধারণভাবে এই ছাড়ের সুবিধা পান না।
অন্যদিকে, নিয়োগকর্তার অবদান পুরনো এবং নতুন—উভয় কর ব্যবস্থাতেই নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে কর সুবিধার আওতায় থাকে। ফলে কর্মীদের কর পরিকল্পনার সময় নিজের অবদান এবং নিয়োগকর্তার অবদানকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা উচিত।
ইপিএফের আরেকটি বড় আকর্ষণ হল প্রতি বছর জমা হওয়া সুদ। দীর্ঘমেয়াদে এই সুদই সঞ্চয়ের পরিমাণ অনেক বাড়িয়ে দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, যতদিন একজন ব্যক্তি কর্মরত থাকেন এবং ইপিএফ অ্যাকাউন্টে নিয়মিত অবদান জমা পড়ে, ততদিন পর্যন্ত অ্যাকাউন্টে জমা হওয়া সুদ সাধারণভাবে করমুক্ত থাকে। এই কারণেই দীর্ঘমেয়াদি অবসর পরিকল্পনার জন্য ইপিএফকে অন্যতম সেরা সঞ্চয় প্রকল্প হিসেবে ধরা হয়।
তবে ইপিএফ থেকে টাকা তোলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল পাঁচ বছরের অবদান সংক্রান্ত নিয়ম। সাধারণভাবে, যদি কোনও কর্মী অন্তত পাঁচ বছর ইপিএফে অবদান রেখে থাকেন, তাহলে সেই অর্থ তোলার সময় কর দিতে হয় না। তবে এই পাঁচ বছর একই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার প্রয়োজন নেই।
ধরা যাক, একজন কর্মী প্রথম সংস্থায় তিন বছর কাজ করার পর চাকরি পরিবর্তন করলেন এবং নতুন প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়ে পুরনো ইপিএফ অ্যাকাউন্টটি স্থানান্তর করলেন। এরপর আরও তিন বছর অবদান জমা দিলেন। সেক্ষেত্রে মোট অবদানের সময় হবে ছয় বছর এবং সেই কর্মী সাধারণভাবে করমুক্তভাবে ইপিএফের অর্থ তুলতে পারবেন।
অনেকেরই প্রশ্ন থাকে, চাকরির মধ্যে বিরতি বা কেরিয়ার ব্রেক হলে পাঁচ বছরের হিসাব নতুন করে শুরু হবে কি না। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি তা নয়। এখানে গুরুত্বপূর্ণ হল মোট কত বছর ইপিএফে অবদান জমা হয়েছে। মাঝখানে চাকরি না থাকলে সেই সময়টি পাঁচ বছরের হিসাবের মধ্যে ধরা হবে না, তবে আগের অবদানের বছরও বাতিল হবে না।
উদাহরণ হিসেবে, কেউ যদি তিন বছর চাকরি করার পর উচ্চশিক্ষার জন্য তিন বছরের বিরতি নেন এবং পরে আবার চাকরিতে যোগ দিয়ে আরও তিন বছর ইপিএফে অবদান রাখেন, তাহলে মোট অবদানের সময় হবে ছয় বছর। ফলে তিনি করমুক্ত উত্তোলনের সুবিধা পেতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইপিএফ এখনও চাকরিজীবীদের জন্য সবচেয়ে কর-সাশ্রয়ী অবসরকালীন সঞ্চয় প্রকল্পগুলির একটি। তবে এর কর সংক্রান্ত নিয়ম প্রতিটি ধাপে আলাদা। তাই অবদান, সুদ এবং উত্তোলনের নিয়ম ভালোভাবে বুঝে আর্থিক পরিকল্পনা করলে ভবিষ্যতে কর সংক্রান্ত জটিলতা এড়ানো সম্ভব।















