আজকাল ওয়েবডেস্ক: দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিষ্ণুপুর বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল বিধায়ক দিলীপ মণ্ডল। সম্প্রতি তাঁকে ঘিরে রাজনৈতিক মহল থেকে প্রশাসনিক অন্দরে তীব্র চাঞ্চল্য। একদিকে পুলিশের খোঁজে কার্যত বেপাত্তা বিধায়ক, অন্যদিকে আইনি সুরক্ষার আশায় এবার কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হলেন তিনি। 'রক্ষাকবচ' চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হওয়া এই বিধায়ককে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে রাজ্য রাজনীতিতে।
জানা গিয়েছে, কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য-এর এজলাসে রক্ষাকবচের আবেদন জানিয়েছেন দিলীপ মণ্ডল। পুলিশি পদক্ষেপ থেকে আপাত সুরক্ষা চেয়ে আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। যদিও এখনও পর্যন্ত আদালতের তরফে কী নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে প্রশাসনিক মহলে জোর জল্পনা চলছে। তবে এর মধ্যেই বিধায়কের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া একাধিক মামলার তদন্ত আরও তৎপরতার সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে চলেছে পুলিশ।
ঘটনার সূত্রপাত একটি ভাইরাল ভিডিওকে কেন্দ্র করে। সম্প্রতি ভোটের ফল প্রকাশের পর সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে দিলীপ মণ্ডলের একটি ভিডিও। সেই ভিডিওতে তাঁকে বলতে শোনা যায়, “১৫ বছর ধরে অনেক সংযম দেখিয়েছিলাম। শান্তিতে রেখেছিলাম। কিন্তু আর তা হবে না।”
শুধু এই মন্তব্যই নয়, বিজেপির উদ্দেশে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসতেই রাজনৈতিক মহলে শোরগোল পড়ে যায়। গেরুয়া শিবিরের তরফে অভিযোগ করা হয়, একজন জনপ্রতিনিধির মুখে এই ধরনের ভাষা গণতান্ত্রিক পরিবেশের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকারক। ঘটনার পর বিধায়কের বিরুদ্ধে একাধিক এফআইআর দায়ের হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে।
এরপর থেকেই শুরু হয় পুলিশি তৎপরতা। গত বৃহস্পতিবার সকালে দিলীপ মণ্ডলের পৈলানের বাড়িতে পৌঁছে যায় বিপুল পুলিশ বাহিনী ও র্যাফ। বিধায়কের খোঁজে তল্লাশি চালানো হয় বাড়ির বিভিন্ন অংশে। যদিও সেই সময় বাড়িতে পাওয়া যায়নি তৃণমূল বিধায়ককে। কিন্তু তল্লাশি চলাকালীন বাড়ির অন্দরমহলের চিত্র দেখে কার্যত বিস্মিত হয়ে যান পুলিশ আধিকারিকদের একাংশ।
সূত্রের খবর, পৈলানের ওই বিশাল বাড়িতে রয়েছে একাধিক বিলাসবহুল গাড়ি, সুসজ্জিত বাগান, ব্যক্তিগত সুইমিং পুল, দোলনা ও দামি কাঠের আসবাবপত্র। এমনকী বাড়ির ভিতরে একটি কৃত্রিম গুহার মতো নির্মাণও রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। গোটা বাড়ির আড়ম্বর ও জীবনযাত্রার ধরণ ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যেও কানাঘুষো শুরু হয়েছে। যদিও এই বিষয়ে বিধায়কের পরিবার বা তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এদিকে, রবিবার রাতে আরও বড় পদক্ষেপ নেয় তদন্তকারী সংস্থা। রাজ্য পুলিশের টাস্ক ফোর্স এবং ডায়মন্ড হারবার জেলা পুলিশের আধিকারিকরা যৌথভাবে অভিযান চালায় বকখালির ফ্রেজারগঞ্জ এলাকায়। মূলত বিধায়কের পুত্র অর্ঘ্য মণ্ডলের খোঁজেই এই অভিযান চালানো হয় বলে সূত্রের খবর। অভিযানে অর্ঘ্য-সহ মোট পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্তকারীদের দাবি, অভিযুক্তদের কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্রও উদ্ধার হয়েছে। এই ঘটনায় তদন্তের মোড় আরও ঘুরে যায় এবং বিধায়ক পরিবারের উপর চাপ আরও বাড়ে।
সোমবার ধৃতদের ডায়মন্ড হারবার মহকুমা আদালতে পেশ করা হয়। পুলিশ হেফাজতের আবেদন জানিয়ে তদন্তকারীরা আদালতে দাবি করেন, ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে আসতে পারে। অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় অন্য কোনও যোগসূত্র রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর।
অন্যদিকে, বিধায়ক দিলীপ মণ্ডল এখনও অধরা থাকায় তাঁকে খুঁজতে একাধিক জায়গায় তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ। তদন্তকারীদের একাংশের মতে, আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি গ্রেপ্তার এড়াতেই তিনি আত্মগোপন করে থাকতে পারেন। যদিও এ বিষয়ে সরকারি ভাবে কিছু জানানো হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোট-পরবর্তী উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই একজন বিধায়কের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ এবং পরবর্তীতে তাঁর হাইকোর্টে রক্ষাকবচের আবেদন রাজ্যের রাজনৈতিক আবহকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে। এখন নজর আদালতের নির্দেশ এবং পুলিশের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। কারণ, এই ঘটনা আগামী দিনে দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।















