আজকাল ওয়েবডেস্ক: মুর্শিদাবাদ জেলা থেকে প্রত্যেক বছর লক্ষাধিক মানুষ পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করার জন্য ভিন রাজ্যে যান। কেরালা, মহারাষ্ট্র ,গুজরাট দিল্লি সহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় মুর্শিদাবাদের প্রচুর মানুষ বছর ভর নির্মাণ শ্রমিক, কৃষি শ্রমিক বা ছোটখাটো কলকারখানায় কাজ করে  দিন গুজরাণ করেন। সেখান থেকে তাঁদের পাঠানো টাকায় সংসার চলে মুর্শিদাবাদে থাকা তাদের পরিবারগুলোর। 

খুশির ঈদের আগেই ইতিমধ্যে ভিন রাজ্যে থাকা পরিযায়ী শ্রমিকেরা একে একে বাড়ি ফিরতে শুরু করে দিয়েছেন। খুশির ঈদের প্রায় একমাস পরে মুর্শিদাবাদ জেলায় আগামী ২৩ এপ্রিল বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ঈদ উপলক্ষে জেলায় ফিরে আসা শ্রমিকেরা যাতে বিধানসভা নির্বাচন পর্যন্ত নিজেদের বাড়িতে থেকে ভোট দিয়ে তবেই কর্মস্থলে ফিরে যান তা সুনিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেসের তরফ থেকে। 

তৃণমূল সুত্রের খবর, মুর্শিদাবাদ জেলার প্রায় ২ লক্ষ মানুষ পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে ভিন রাজ্যে কাজ করেন। এই পরিযায়ী শ্রমিকদের মধ্যে বেশিরভাগই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। তৃণমূল কংগ্রেসের লক্ষ্য পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে কর্মরত ব্যক্তিরা বাড়ি ফিরে এসে ভোট দিয়ে তবেই যেন নিজেদের কর্মস্থল ফিরে যায়। এই লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই তৃণমূল কংগ্রেসের নিচের তলার নেতারা ভিন রাজ্যে কর্মরত পরিযায়ী শ্রমিকদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ রাখতে শুরু করেছেন। পরিযায়ী শ্রমিকদের ভোট পর্যন্ত জেলাতেই রাখার জন্য শাসক দলের তরফ থেকে স্বাস্থ্য শিবির করার মতো বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা চলছে।

মুর্শিদাবাদ জেলার ২২টি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে বেশিরভাগ আসনেই সংখ্যালঘু ভোটারদের প্রাধান্য বেশি। ২০২১-এর নির্বাচনে মুর্শিদাবাদ জেলায় ২০টি আসনে তৃণমূলের জয়ের পিছনে সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক এবং পরিযায়ী শ্রমিকরা বড় ভূমিকা নিয়েছিল বলে অনেকেই মনে করেন। 

বিজেপি শাসিত বিভিন্ন রাজ্যে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলা ভাষাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর বাংলাদেশী সন্দেহে একাধিক অত্যাচারের ঘটনাকে মনে রেখে তৃণমূল কংগ্রেস চাইছে পরিযায়ী শ্রমিকরা ঈদ উপলক্ষে ঘরে ফিরে ভোট দিয়ে নিরাপদেই থাকুক। 

প্রসঙ্গত গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশনের তরফ থেকে যে ভোটার তালিকার প্রকাশ করা হয়েছে তাতে মুর্শিদাবাদ জেলার প্রায় ১১ লক্ষের বেশি মানুষের নাম তালিকায় ওঠেনি। সূত্রের খবর, ভোটার তালিকায় এখনও 'বিচারাধীন' থাকা প্রচুর মানুষ পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে ভিন রাজ্যে কর্মরত রয়েছেন। তৃণমূল কংগ্রেস চাইছে নিজেদের ভোটাধিকার সুনিশ্চিত করার জন্য সমস্ত পরিযায়ী শ্রমিকেরা যাতে বিধানসভা নির্বাচন শেষ হওয়া পর্যন্ত জেলাতেই থেকে যান। 

কেরালায় পরিচয় শ্রমিক হিসেবে কর্মরত সুতির বাসিন্দা রহিম শেখ বলেন," গত কয়েক বছর ধরে নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে আমি কেরালায় কর্মরত রয়েছি। পরিবারের সঙ্গে ঈদের ছুটি কাটানোর জন্য দু'দিন আগে বাড়িতে ফিরেছি। তবে পরিবারের লোকজন এবং স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বের অনুরোধের পর আমি ঠিক করেছি ২৩ এপ্রিল ভোট দিয়ে তারপরই নিজের কর্মস্থলে ফিরে যাব।"


 
ফারাক্কা তৃণমূল বিধায়ক মনিরুল ইসলাম বলেন," বিজেপি সরকার যেভাবে মানুষের স্বাধীনতা হরণ করার চেষ্টা করছে তাতে পরিযায়ী শ্রমিকরা আতঙ্ক রয়েছে। এসআইআর নিয়ে  সাধারণ মানুষের মন থেকে এখনও  আতঙ্ক যায়নি। প্রচুর পরিযায়ী শ্রমিক আমাদেরকে ফোন করে জিজ্ঞাসা করছেন তাঁরা আদৌ ভোট দিতে পারবেন কিনা।"
 
তিনি বলেন,"ভোট না দিলে বিজেপি সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে সাধারণ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়ে তাদেরকে বহিরাগতভাবে চিহ্নিত করে দিতে পারে।"
 
তৃণমূল বিধায়কের দাবি,"ফরাক্কা বিধানসভা এলাকার ৯০ শতাংশ পরিযায়ী শ্রমিক ঈদের পরও নিজেদের কর্মস্থলে ফিরবেন না। কিছু সংখ্যক শ্রমিক কর্মস্থলে ফিরে গেলেও ভোটের সময় তাঁরা ভোট দিতে ফিরে আসবেন।"
 
রঘুনাথগঞ্জ-১ ব্লক তৃণমূল কংগ্রেস সভাপতি গৌতম ঘোষ বলেন," বিজেপি সরকার নোটবন্দির মত 'ভোট বন্দি' করতে চাইছে। এর জন্য তারা নির্বাচন কমিশনকে  ব্যবহার করতে দ্বিধাগ্রস্ত হচ্ছে না। এই রাজ্য থেকে বিজেপিকে তাড়াতে সব ধর্মের পরিযায়ী শ্রমিকেরা এবার ভোট বাক্সে বিজেপির বিরুদ্ধে তাদের মতাধিকার প্রয়োগ করবেন।"
 
তিনি বলেন," ঈদের পর এক মাস বাড়িতে থাকলে হয়তো কিছু পরিযায়ী শ্রমিকের সমস্যা হবে। কিন্তু বিজেপিকে তাড়ানোর জন্য পরিযায়ী শ্রমিকেরা এই কষ্ট স্বীকার করতে রাজি হয়েছেন। ভোট না দেওয়া পর্যন্ত যাতে কোনও পরিযায়ী শ্রমিক জেলা থেকে চলে না যান তা নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের তরফ থেকে বিশেষ প্রচার চালানো হবে।"
 
অন্যদিকে লালগোলার তৃণমূল বিধায়ক মহম্মদ আলি বলেন," সম্পূর্ণ ভোটার তালিকায় প্রকাশ না করে, যোগ্য ভোটারদের নাম  তালিকায় না তুলে যেভাবে নির্বাচন কমিশন ভোট ঘোষণা করে দিয়েছে আমরা এর নিন্দা করছি। নির্বাচন কমিশন বিজেপির নির্দেশে চলছে। যে গতিতে শুনানি চলছে তাতে ভোটের আগে সমস্ত যোগ্য মানুষের নাম তালিকায় উঠবে বলে আমাদের মনে হয় না। আমরা এই ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়াকেই সমর্থন করছি না।"
 
তৃণমূল বিধায়ক বলেন,"পরিযায়ী শ্রমিকেরা কাজের জন্য বাইরে থাকলেও মমতা ব্যানার্জি সরকার তাঁদের পরিবারের সদস্যদেরকে মিনামূল্যে রেশন ,লক্ষ্মীর ভান্ডার সহ আরও নানা ধরনের সরকারি প্রকল্পের সুবিধা দিচ্ছেন। তার ফলে পরিযায়ী শ্রমিকরা ঈদ উপলক্ষে বাড়ি ফিরে ভোট দেওয়া পর্যন্ত  জেলায় থেকে গেলেও তাঁদের খাওয়া-দাওয়ার কোনও সমস্যা হবে না।"

তৃণমূল কংগ্রেসের মুর্শিদাবাদ সাংগঠনিক জেলা সভাপতি অপূর্ব সরকার বলেন ,"খুশির ঈদের আগে যাতে সকল পরিযায়ী শ্রমিক নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন তা সুনিশ্চিত করতে আমাদের দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জি এবং বহরমপুরের সাংসদ ইউসুফ পাঠান কেন্দ্রীয় রেল মন্ত্রীকে মুর্শিদাবাদ পর্যন্ত অতিরিক্ত ট্রেন চালানোর আবেদন করেছেন।"