আজকাল ওয়েবডেস্ক: কল্যাণীর জওহরলাল নেহরু মেমোরিয়াল হাসপাতালে গভীর রাতে কোনও পূর্বঘোষণা ছাড়াই আচমকা পরিদর্শনে পৌঁছে কার্যত চমকে দিলেন রাজ্যের স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী সুমনা সরকার। তবে তিনি সেখানে মন্ত্রীর পরিচয়ে যাননি। মুখে সার্জিক্যাল মাস্ক, সাধারণ পোশাক এবং সঙ্গে শুধুমাত্র একজন সাদা পোশাকের মহিলা নিরাপত্তারক্ষী, একজন ডাক্তারি ছাত্রীর ছদ্মবেশে হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখেন তিনি। প্রথমে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী কিংবা রোগীর পরিজনেরা কেউই বুঝতে পারেননি যে তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন রাজ্যের স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী। আর সেই সুযোগেই হাসপাতালের রাতের পরিষেবা ও বাস্তব পরিস্থিতির খোঁজ নেন তিনি।
বুধবার গভীর রাত প্রায় ১২টা ৪০ মিনিট নাগাদ সুমনা সরকার হাসপাতালে পৌঁছন। কোনও প্রশাসনিক আধিকারিক বা বড় নিরাপত্তা বাহিনীকে সঙ্গে না নিয়েই তিনি সরাসরি জরুরি বিভাগে প্রবেশ করেন। সাধারণ মানুষের মতো হাসপাতালের পরিষেবা পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করেন। জরুরি বিভাগে রোগীদের চিকিৎসা, কর্মীদের উপস্থিতি এবং পরিষেবার মান খতিয়ে দেখেন তিনি। পরিদর্শনের সময় রোগী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও কথা বলেন এবং বিভিন্ন অভিযোগ শোনেন।
পরিদর্শনের সময় সবচেয়ে উদ্বেগজনক যে বিষয়টি তাঁর নজরে আসে, তা হল রাতের শিফটে জরুরি বিভাগে কোনও সিনিয়র চিকিৎসকের উপস্থিতি ছিল না। অভিযোগের সত্যতা নিজের চোখে দেখেই তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। পরে যখন তিনি মুখ থেকে মাস্ক খুলে নিজের পরিচয় প্রকাশ করেন, তখন হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। অনেকেই হতচকিত হয়ে পড়েন, কারণ এতক্ষণ যাঁকে সাধারণ চিকিৎসা-পড়ুয়া বলে মনে করা হচ্ছিল, তিনিই যে রাজ্যের স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেননি।
শুধু জরুরি বিভাগেই নয়, হাসপাতালের একাধিক ওয়ার্ডও ঘুরে দেখেন সুমনা সরকার। ভর্তি থাকা রোগীদের সঙ্গে কথা বলে চিকিৎসা পরিষেবার মান সম্পর্কে জানতে চান। পাশাপাশি কয়েকজন জুনিয়র চিকিৎসকের সঙ্গেও আলোচনা করে রাতের শিফটে কীভাবে পরিষেবা পরিচালিত হচ্ছে, সেই বিষয়েও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেন। রোগীদের পরিবারের সদস্যদের অভিযোগও মন দিয়ে শোনেন তিনি।
পরিচ্ছন্নতার বিষয়েও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, হাসপাতালের প্রায় প্রতিটি বিভাগেই নোংরা পরিবেশ চোখে পড়েছে। কোথাও সন্তোষজনক পরিচ্ছন্নতা নেই। হাসপাতালের বিভিন্ন জায়গায় কুকুর ও বিড়ালের অবাধ বিচরণও তাঁর নজরে আসে। একটি সরকারি হাসপাতালের মতো সংবেদনশীল জায়গায় এই ধরনের পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সুমনা সরকার বলেন, রাতের হাসপাতালে সিনিয়র চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ আসছিল। সেই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতেই তিনি কোনও পূর্বঘোষণা ছাড়াই ছদ্মবেশে হাসপাতালে যান। তিনি বলেন, "প্রতিটি জায়গায় নোংরা। এমন কোনও বিভাগ দেখলাম না, যেটিকে পরিচ্ছন্ন বলা যায়। হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এই ধরনের অব্যবস্থা কোনওভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।"
তিনি আরও জানান, হাসপাতালের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত রিপোর্ট রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে তুলে ধরা হবে। একই সঙ্গে হাসপাতালের পরিষেবা, পরিচ্ছন্নতা এবং চিকিৎসক উপস্থিতির বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর এই আকস্মিক পরিদর্শনের পর হাসপাতাল প্রশাসনের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। রাতের পরিষেবা, সিনিয়র চিকিৎসকদের উপস্থিতি, পরিচ্ছন্নতা এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরিকাঠামো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এই ঘটনার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয় এবং পরিষেবার মানোন্নয়নে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়, সেদিকেই এখন নজর স্বাস্থ্য মহলের।
















