আজকাল ওয়েবডেস্ক: সোনারপুরে তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জিকে ঘিরে বিক্ষোভ, ডিম ও ইট ছোঁড়ার ঘটনায় রাতভর তল্লাশি চালিয়ে ছ'জনকে গ্রেপ্তার করল পুলিশ।
শনিবারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে তৃণমূল কংগ্রেস এই ঘটনাকে পরিকল্পিত হামলা বলে দাবি করছে, অন্যদিকে বিরোধীরা বলছে, এটি সাধারণ মানুষের ক্ষোভের স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ। তবে ঘটনার পর থেকেই প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছে এবং হামলার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করতে জোরদার তদন্ত শুরু করেছে।
শনিবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরে এক মৃত তৃণমূল কর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন অভিষেক। দলীয় কর্মীর মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের পাশে দাঁড়াতেই তাঁর এই সফর ছিল বলে তৃণমূল সূত্রে জানা যায়। কিন্তু এলাকায় পৌঁছনোর পরই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ, একদল বিক্ষুব্ধ ব্যক্তি অভিষেকের কনভয় ঘিরে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে। তাঁর গাড়ির দিকে ডিম ছোঁড়া হয়, ইটের টুকরো ছুঁড়ে মারা হয় এবং ‘চোর’, ‘চোর’ স্লোগানে গোটা এলাকা সরগরম হয়ে ওঠে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে নিরাপত্তার কারণে অভিষেককে গাড়ি থেকে নেমে নিরাপত্তারক্ষীদের ঘেরাটোপে হেঁটে যেতে হয়। মৃত তৃণমূল কর্মীর বাড়িতে যাওয়ার পথে তাঁকে ঘিরে বিক্ষোভ চলতেই থাকে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ ও নিরাপত্তারক্ষীরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করলেও কিছু সময়ের জন্য ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।
ঘটনার পরই পুলিশি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। বিরোধীরা প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ তুললেও তৃণমূলের দাবি, এটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত হামলা এবং নিরাপত্তা ভাঙার চেষ্টা।
ঘটনার পর শনিবার রাত থেকেই সোনারপুর থানার পুলিশ ব্যাপক তল্লাশি অভিযান শুরু করে। এলাকার বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়। পাশাপাশি সংবাদমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের মোবাইল থেকে ভিডিওও তদন্তের কাজে ব্যবহার করা হয়।
পুলিশ সূত্রে খবর, ভিডিও ফুটেজ খতিয়ে দেখেই হামলায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত কয়েকজনকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
রাতভর অভিযান চালিয়ে পুলিশ ছ'জনকে গ্রেপ্তার করে। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে হামলার নেপথ্যে অন্য কারও ভূমিকা রয়েছে কি না, তা জানার চেষ্টা চলছে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃতদের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা, অশান্তি সৃষ্টি, নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গের একাধিক ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে।
তদন্তকারীদের দাবি, হামলার ঘটনায় আরও কয়েকজনের জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। ভিডিও ফুটেজে তাঁদের উপস্থিতি ধরা পড়েছে বলে খবর। ফলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই আরও গ্রেপ্তার হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে সম্ভাব্য অভিযুক্তদের খোঁজে বিভিন্ন এলাকায় তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
ঘটনার জেরে রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বের দাবি, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির মদতেই এই হামলা সংগঠিত হয়েছে। তাদের অভিযোগ, অভিষেককে লক্ষ্য করেই পরিকল্পিতভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়েছিল। তৃণমূল নেতাদের বক্তব্য, একজন জাতীয় স্তরের নেতার উপর এই ধরনের আক্রমণ গণতান্ত্রিক রাজনীতির পক্ষে অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, রাজ্যের বিভিন্ন ইস্যুতে মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, শনিবারের ঘটনা তারই প্রতিফলন। বিরোধীদের মতে, সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই প্রতিবাদে সামিল হয়েছিলেন। যদিও ডিম ও ইট ছোঁড়ার ঘটনাকে তারা সমর্থন করেনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা শুধু একটি বিক্ষোভের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি বড় ছবি সামনে এসেছে। শাসকদল এবং বিরোধীদের মধ্যে সংঘাত ক্রমশ তীব্র হচ্ছে এবং তার প্রভাব সাধারণ মানুষের মধ্যেও পড়ছে।
এদিকে পুলিশ স্পষ্ট জানিয়েছে, ঘটনায় জড়িত কাউকে ছাড়া হবে না। সমস্ত ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান এবং অন্যান্য তথ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। হামলার পরিকল্পনা কোথায় হয়েছে, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং এর পিছনে কোনও বৃহত্তর ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সোনারপুরের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের সূচনা হয়েছে। অভিষেককে ঘিরে জনরোষ, নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন এবং পরপর গ্রেপ্তার—সব মিলিয়ে ঘটনাটি আগামী কয়েক দিন রাজনৈতিক মহলের অন্যতম আলোচ্য বিষয় হয়ে থাকবে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।















