রিয়া পাত্র

শনিবারের বিকেল নামছে তখন। দেশের রাজধানীতে উত্তেজনার পারদ কিছুটা পড়ছে। বাংলার রাজধানীতে যদিও পরিস্থিতি কিছুটা গরম। বৃষ্টিও হয়নি আজ। ওদিকে তৃণমূলের ছাত্রযুবর মিছিলে অনুমতি না মেলায়, পদ্মপুকুর এলাকা খানিক উত্তপ্ত। পুলিশ, কোর্ট কেউ মিছিলের অনুমতি দেয়নি। কালীঘাট শিবিরের দুই নেতা গ্রেপ্তার। পরিস্থিতি দেখতে সোজা হাজির মমতা। এতদূর পর্যন্ত বিষয়টি মোটামুটি রাজনৈতিক, মোটামুটি স্বাভাবিক। তারপরের ঘটনা দিনে দিনে প্রায় স্বাভাবিক হতে চলেছে বঙ্গবাসীর চোখে। তবে শনির ঘটনার পর, অনায়াসে একবার কয়েকদশক ঘেঁটে দেখা যেতে পারে।

 

কী ঘটল? পদ্মপুকুর থেকে বেরিয়ে, আচমকা দেখা গেল, উপাসনার স্কুটিতে বসে, রাজপথে মমতা। দু'জনের গলায় স্লোগান (যদিও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর মাথায় হেলমেট ছিল না)। মমতা লালবাজার যাচ্ছেন, জল্পনা থাকলেও, মাঝরাস্তায় পথ বেঁকে যায় অন্যদিকে। স্কুটি ঢোকে কালীঘাটের গলিতে। গোটা রাস্তায় কী স্লোগান? কেন বাইকে মমতা? কেন হেলমেট নেই? এসব একদিকে সরিয়ে রাখলেও জানতে ইচ্ছে করে, যাঁকে দেখে রাজনীতিতে ওই যুবতী, তিনি যখন তাঁরই বাইকে সওয়ার, বুক ধুকপুক করছিল উপাসনার? হাত কাঁপছিল? গলা কাঁপছিল স্লোগান দিতে? ভয়ে-আনন্দে-উত্তেজনায়-দায়িত্বে? উপাসনা বলছেন, 'পদ্মপুকুর যাওয়ার সময়, দিদির গাড়ি বারবার সিগন্যালে আটকানো হয়েছে। ফলে ফেরার সময় ঠিক হয় বাইকে ফিরবেন। আমাদেরই এক সহযোদ্ধার স্কুটি, আমি চালাই। এটাতো পূর্বপরিকল্পিত ছিল না। ফলে, দিদিকে বাইকে নিয়ে যাওয়া! আমার হার্টবিট বেড়ে যাবে না? হাত কাঁপবে, বুক ধুকপুক করবে, সেটাই তো স্বাভাবিক।' 

 

তবে শনিবারের বিকেলের, মুখ্যমন্ত্রীর কুরশি হারানো মমতার, বাইকে বসে হুঁশ করে লালাবাজার আর কালীঘাটের রাস্তা গুলিয়ে দেওয়া দেখে, মনে পড়ছে ২০০৯ থেকে ২০২৬, একের পর এক 'বাইক রাইড'-এর কথা, অবশ্যই সওয়ার হওয়া মমতা ব্যানার্জির কথা এবং সেসব চালকের কথা। 

 

২০০৯। মমতা তখন ক্ষমতায় আসেননি। রাজ্যে বাম জমানা। জঙ্গলমহল, মাওবাদি, বাম সরকার, সরকারের পুলিশ, অশান্তি- সব মিলিয়ে বাংলা পেরোচ্ছে উত্তাল সময়কাল। আর প্রবল বিদ্রোহের মাঝখান দিয়ে ক্ষমতার আরও কাছে এগোচ্ছেন মমতা। সেই উত্তাল সময়ে, 'ফ্যানবয়' ছত্রধর মাহাতোর স্কুটারে চেপে জঙ্গলমহলে ঢুকেছিলেন মমতা। তখন ডিজিটাল মিডিয়ার রমরমা ছিল না এত। ফলে জঙ্গলমহলের সেই ছবি বহুদিন মানুষের চোখে স্পষ্ট ছিল। তারপর, মমতা ক্ষমতায় এলেন। ক্ষমতা বাড়ল, বহরে বাড়ল নিরাপত্তা। আন্দোলন যাঁর সঙ্গী ছিল, তাঁর দৈনিক সঙ্গী হল, কনভয়। 

 

তবে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরেও, মমতা ব্যানার্জিকে বারবার যেমন মানুষের কাছে যেতে দেখা গিয়েছে, তেমন গাড়ির কাচ নামিয়ে, বাইকে হুঁশ করে পেরিয়েও যেতে দেখা গিয়েছে।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। ফিরহাদ তখন মমতার এক হাত। একের পর এক গুরু দায়িত্ব। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে ২৫ ফেব্রুয়ারি গাড়ি নয় ফিরহাদের ইলেকট্রিক স্কুটার ছিল মমতার নবান্ন যাওয়ার মাধ্যম। চালকের আসনে খোদ ফিরহাদ হাকিম। গলায় পোস্টার ঝুলিয়ে, স্কুটারে চেপে নবান্ন গিয়েছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী।

 

 

 

১ জুন, ২০২৩। গোষ্ঠ পালের মূর্তির পাদদেশ থেকে গান্ধী মূর্তির পাদদেশ পর্যন্ত মিছিল ছিল তৃণমূল কংগ্রেসের। মমতা তখন মুখ্যমন্ত্রী। কুস্তিগীরদের সমর্থনে পথে নেমেছিলেন তিনি। পথেই ওঠেন বাইকে। ওই প্রতিবাদ মিছিলের দিনে, এক ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে পড়েন, তাঁকে নিজের গাড়িতে হাসপতালে পাঠিয়ে, বাইকে কিছুটা পথ যান তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী।

 

 

২০২৬-এর ভোট প্রচার। চন্দ্রিমা তখন মমতার একনিষ্ঠ সৈনিক। সেই চন্দ্রিমার হয়ে প্রচারে গিয়েছিলেন তৎকালীন বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী, প্রার্থী মমতা ব্যানার্জি, ২৫ এপ্রিল। সেদিন বিরাটির বণিক মোড় থেকে বিরাটি মোড় মিছিল ছিল। বিরাটির মিনি বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত গাড়িতে গিয়ে, কিছুক্ষণ পদযাত্রায় পা মেলান। তারপরেই, পথে নবীন রাউত নামের যুবকের বাইকে করে বাকি জনসংযোগ কর্মসূচি সারেন।

 

২০২৬-এর ভোট প্রচার। এপ্রিল ২৭। খাস কলকাতায়, প্রচারে নেমে, সেদিনও এক দলীয় কর্মীর বাইকে উঠে পড়েন মমতা।

 

তারপর, ফের, ২০২৬। ২৫ জুলাই। উপাসনার স্কুটিতে মমতা ফিরলেন কালীঘাট। ক্ষমতায় আসার আগের মমতা থেকে, ক্ষমতা হারানোর পরের মমতা। কিছু ক্ষেত্রে তাঁর 'আন্দাজ' বদলায়নি, স্পষ্ট। খোঁজ নিলে হয়তো দেখা যাবে, ছত্রধর থেকে উপাসনা, ফ্যানবয় থেকে ফ্যানগার্ল, মমতার আন্দাজের মতো, বদলায়নি তাঁদের কাঁপা হাতের উত্তেজনা, ধুকপুকানির গ্রাফও।