মনিরুল হক, কোচবিহার: ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া ঘিরে নতুন করে আতঙ্ক ছড়াল কোচবিহারে। পরিবারের দাবি, এসআইআর-এর চূড়ান্ত তালিকায় নাম ‘বিচারাধীন’ থাকায় মানসিক চাপে আত্মঘাতী হয়েছেন এক যুবক। চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার গভীর রাতে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে কোচবিহার ১ নম্বর ব্লকের মধুপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের কালপানি গ্রামে। 

 

মৃত যুবকের নাম সামিনুর মিঁয়া (৩০)। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, সামিনুর পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে একজন। তবে তাঁদের বাবার ছয় সন্তান রয়েছে বলে দাবি করে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়ার সময় নির্বাচন কমিশনের তরফে একটি শুনানির নোটিশ পাঠানো হয়। অভিযোগ, তাঁদের বাবার সঙ্গে ষষ্ঠ এক ভোটারের নাম 'ম্যাপড' করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছিল। 

 

এরপর শুনানিতে উপস্থিত হয়ে সামিনুর ও তাঁর ভাইবোনেরা প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দেন এবং নিজেদের পরিচয় সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য কমিশনের প্রতিনিধিদের সামনে তুলে ধরেন। কিন্তু পরে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ হলে দেখা যায়, সামিনুরের বাবা-মায়ের নাম তালিকায় থাকলেও পাঁচ ভাইবোনের নাম ‘বিচারাধীন’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। 

 

পরিবারের দাবি, সেই ঘটনার পর থেকেই গভীর দুশ্চিন্তা ও আতঙ্কে ভুগছিলেন সামিনুর। ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কা এবং প্রশাসনিক জটিলতার ভয়ে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। অভিযোগ, দু’দিন আগে বাড়িতে কীটনাশক খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন তিনি। 

 

পরিবারের সদস্যরা তাঁকে দ্রুত উদ্ধার করে মহারাজা জিতেন্দ্র নারায়ণ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল-এ ভর্তি করান। কয়েকদিন ধরে সেখানে চিকিৎসা চললেও বৃহস্পতিবার গভীর রাতে তাঁর মৃত্যু হয়।

 

ঘটনার পর এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে। পরিবারের দাবি, এসআইআর প্রক্রিয়ায় নাম ‘বিচারাধীন’ থাকায় তৈরি হওয়া আতঙ্কই সামিনুরের মৃত্যুর জন্য দায়ী। যদিও পুলিশ ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে এবং পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে।

 

ভোটের মুখে এসআইআর নিয়ে রাজ্যজুড়ে যখন রাজনৈতিক তরজা তুঙ্গে, তখন এই ঘটনার পর নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে সাধারণ মানুষের উপর এই প্রক্রিয়ার মানসিক প্রভাব নিয়ে। স্থানীয় বাসিন্দারাও ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

 

চলতি সপ্তাহেই এই এক কারণে বাংলার জায়গায় মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে এসেছে। নিজের-সহ পরিবারের দশজনের নাম নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকার 'বিচারাধীন' থাকায় দেশ ছাড়তে হবে। এই আতঙ্কে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় এক প্রৌঢ়ৈর। এমনই অভিযোগ প্রোঢ়ৈর পরিবারের। ঘটনাটি ঘটেছে মুর্শিদাবাদ থানার অন্তর্গত গুধিয়া গ্রামে। মৃত ওই ব্যক্তির নাম আব্দুল শেখ (৭০)। মৃত আব্দুল-সহ তাঁর পরিবারের ১০ জন সদস্যের নাম 'বিচারাধীন' তালিকায় রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। 

 

সূত্রের খবর, নামের বানানে কিছু ভুল থাকায় আব্দুল এবং তাঁর পরিবারের ১০ জন সদস্য এসআইআর -এর শুনানিতে ডাক পেয়েছিলেন। সমস্ত নথি জমা করার পরও ওই পরিবারের সকলের নাম 'বিচারাধীন' তালিকায় রয়ে যায়। 

 

আব্দুল এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা ২৪৪ নম্বর বুথের ভোটার ছিলেন। এসআইআর আতঙ্কে আব্দুলের মৃত্যুর প্রতিবাদে সোমবার সকাল থেকে গুধিয়া বকুলতলা মোড়ে হরিরামপুর-বহরমপুর রাজ্য সড়কের ওপর পথ অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান তৃণমূল নেতৃত্ব-সহ স্থানীয় বাসিন্দারা। ফলে প্রায় এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে অবরুদ্ধ হয়ে যায় যান চলাচল। ইতিমধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে মুর্শিদাবাদ থানার বিশাল পুলিশ। কিন্তু বিক্ষোভকারীরা অবরোধ তুলতে নারাজ। ফলে যানবাহনের পথ পরিবর্তন করতে বাধ্য হয় পুলিশ। 

 

অপর একটি ঘটনায় নির্বাচন কমিশনের 'বিচারাধীন' তালিকায় নাম থাকায় বিষ খেয়ে আত্মঘাতী হওয়ার চেষ্টা করেন এক ব্যক্তি। সোমবার সকালে ঘটনাটি ঘটেছে ফরাক্কা থানার বিন্দু গ্রাম লুথার কলোনী এলাকায়। অসুস্থ ওই ব্যক্তির নাম বাবলু হালদার (৬০)। বর্তমানে ওই ব্যক্তি জঙ্গিপুর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। 

 

ফরাক্কার তৃণমূল বিধায়ক মনিরুল ইসলাম বলেন, "নির্বাচন কমিশনের ভুল সিদ্ধান্তের জন্য মানুষ এখন আত্মহত্যার চেষ্টার মতো চরম পথ বেঁচে নিতে চাইছেন। কী কারণে এত সংখ্যক লোকের নাম 'বিচারাধীন' রেখে নির্বাচন কমিশন তালিকা ঘোষণা করল তা আমরা বুঝতে পারছি না। আমরা নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করছি। পূর্ণাঙ্গ ভোটার তালিকা প্রকাশের পরই যেন নির্বাচনের দিন ঘোষণা করা হয়-আমরা এই দাবিও করছি।"

 

নির্বাচন কমিশনের বার্তা

 

২৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত ভোটার তালিকায় 'বিচারাধীন' হিসাবে চিহ্নিত সমস্ত ভোটারের নাম মাননীয় বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের বিবেচনাধীন রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের ভিত্তিতে কলকাতা হাইকোর্টের পরামর্শে এই বিচারবিভাগীয় আধিকারিকরা কাজ করছেন। এটি স্পষ্ট করে দেওয়া দরকার যে নির্দিষ্ট দিনে শুনানির পর 'বিচারাধীন' ঘোষিত ভোটারদের সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট ইআরও/এইআরও-রা নেননি। আর সেই কারণেই শীর্ষ আদালতের নির্দেশ অনুসারে বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের কাছে 'বিচারাধীন' নামগুলি পাঠানো হয়েছে।