আজকাল ওয়েবডেস্ক: দলবিরোধী কাজের অভিযোগে তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত হওয়া দুই বিধায়কের একজন হলেন ঋতব্রত ব্যানার্জি। অথচ একসময় তিনি ছিলেন সিপিএমের অন্যতম ‘লড়াকু তরুণ মুখ’। তবে এক কেলেঙ্কারি এবং বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারের জেরে বাম দল থেকে বহিষ্কারের পর তাঁর সেই দ্রুত উত্থানে হঠাৎই লাগাম পড়ে যায়। পরবর্তীকালে তিনি তৃণমূলে যোগ দেন এবং দাবি করেন যে, মমতাই হলেন আসল বামপন্থী নেত্রী। আর এবার তৃণমূল থেকেও তাঁকে ছুড়ে ফেলা হল।
সম্প্রতি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে এক ব্যাখ্যামূলক নিবন্ধে তুলে ধরা হয়েছে ঋতব্রতর রাজনৈতিক জীবনের যাত্রার কথা। সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী তথা বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী জানান, তৃণমূলের দুই বিধায়ক—ঋতব্রত ব্যানার্জি ও সন্দীপন সাহা বিধানসভার স্পিকারের কাছে অভিযোগ করেছেন যে, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে সমর্থন জানিয়ে দলের পাঠানো চিঠিতে তাঁদের সই জাল করা হয়েছে। এর ঠিক পরপরই দল থেকে বহিষ্কার করা হয় ঋতব্রতকে।
কলকাতার সাউথ পয়েন্ট হাইস্কুল এবং আশুতোষ কলেজের ছাত্র ঋতব্রত ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে ছাত্রনেতা হিসেবে পাদপ্রদীপের আলোয় আসেন। সিপিএমের ছাত্র সংগঠন এসএফআই-এর সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে দীর্ঘ আট বছর সেই দায়িত্ব সামলান তিনি। বামপন্থী প্রবীণ নেতা তথা সিপিএমের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত সীতারাম ইয়েচুরির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ঋতব্রতর উত্থান ছিল উল্কার গতিতে, বিশেষ করে এমন একটি দলে যা সাধারণত তরুণ মুখদের সামনে আনতে দ্বিধা করত।
মাত্র ৩৪ বছর বয়সে সিপিএম তাঁকে রাজ্যসভার সাংসদ করে পাঠায়। কিন্তু ক্ষমতার অলিন্দে এই দ্রুত আরোহণের ঠিক তিন বছরের মাথায়, ২০১৭ সালে বড়সড় ধাক্কা খায় তাঁর রাজনৈতিক জীবন। দলের আদর্শের সঙ্গে খাপ খায় না এমন জীবনযাপন—বিশেষ করে ঋতব্রতর হাতে অ্যাপেল স্মার্টওয়াচ দেখা যাওয়া এবং দলবিরোধী কাজের অভিযোগে তাঁকে প্রথমে সাসপেন্ড ও পরে বহিষ্কার করে সিপিএম। সেই সময় এই বহিষ্কারকে সিপিএমের ভেতরের প্রকাশ কারাট এবং সীতারাম ইয়েচুরি শিবিরের অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ের ফলাফল হিসেবেও দেখা হয়েছিল। বহিষ্কারের ঠিক কয়েকদিন আগে এক সাক্ষাৎকারে প্রকাশ কারাট, বৃন্দা কারাট এবং বর্তমান রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের মতো শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছিলেন ঋতব্রত। এর কিছুদিন পরেই এক মহিলা তাঁর বিরুদ্ধে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ আনেন। ঋতব্রত পালটা ব্লাকমেলিংয়ের অভিযোগ করলেও, একটি ব্যক্তিগত ভিডিও কলের দৃশ্য ভাইরাল হতেই রাতারাতি কোণঠাসা হয়ে পড়েন এই একসময়ের দাপুটে নেতা।
সিপিএম থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর ঋতব্রত তৃণমূলে যোগ দেন এবং দলের শ্রমিক সংগঠনের প্রধান পদের দায়িত্ব পান। ২০২১ সালে এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্টভাষী এই রাজনীতিক দাবি করেছিলেন, তাঁর তৎকালীন নেত্রী মমতা ব্যানার্জিই আসলে প্রকৃত বামপন্থী নেতা।
২০২৪ সালে প্রাক্তন সাংসদ জহর সরকারের ইস্তফার পর তৃণমূল ঋতব্রতকে আবারও রাজ্যসভায় পাঠানোর সুপারিশ করে। এরপর চলতি বছরেই উলুবেড়িয়া পূর্ব বিধানসভা কেন্দ্র থেকে তাঁকে প্রার্থী করা হয়। এবারের নির্বাচনে যেখানে বহু অভিজ্ঞ তৃণমূল নেতা হেরে ভূত হয়েছেন, সেখানে বিজেপির প্রবল ঝড়ের মধ্যেও জয় ছিনিয়ে নেন ঋতব্রত।
তবে জেতার পরপরই তিনি আবারও চর্চায় চলে আসেন, যা তৃণমূল নেতৃত্বকে মোটেও আনন্দ দেয়নি। দিল্লির বঙ্গভবনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে তাঁর দেখা হওয়া এবং কুশল বিনিময়ের একটি ভিডিও সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয়। পরে সংবাদমাধ্যমকে ঋতব্রত জানান, এটি কেবলই রাজনৈতিক সৌজন্য ছিল। মুখ্যমন্ত্রীর অভিবাদনের জবাবে তাঁর কি মুখ ফিরিয়ে নেওয়া উচিত ছিল—এমন প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন যে, তিনি এই ধরনের রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন না।
এরপরই বিতর্ক দানা বাঁধে যখন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, ঋতব্রত এবং সন্দীপন সাহা বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বোসকে লিখিতভাবে জানিয়েছেন যে, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করার দলীয় প্রস্তাবে তাঁরা সই করেননি। বিধায়কদের সই জালের এই অভিযোগে চরম অস্বস্তিতে পড়ে তৃণমূল শিবির।
ঘটনার পরই তৃণমূলের তরফে বিবৃতি জারি করে ঋতব্রত ব্যানার্জি ও সন্দীপন সাহাকে বহিষ্কার করা হয়। চিঠিতে বলা হয়, তৃণমূলের টিকিটে নির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা বারবার দলীয় নেতৃত্ব ডাক দেওয়া বৈঠক এড়িয়ে গেছেন এবং দলবিরোধী কাজে লিপ্ত হয়েছেন। নাম না করে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা ব্যানার্জি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, "যিনি আগে সিপিএম করতেন, তিনিই এসব করছেন। অন্যদের বঞ্চিত করে আমরা ওনাকে টিকিট দিয়েছিলাম। যাঁদের বঞ্চিত করেছি, তাঁদের কাছে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। ওর কোনও নীতি নৈতিকতা নেই।" এমনকি বিস্ময়করভাবে মমতা বলেন, ''সিপিএমের সঙ্গে আমি এই ব্যাপারে অন্তত একমত যে ওকে তাড়িয়ে দিয়েছিল দল থেকে।''
ঋতব্রতর জন্য তৃণমূলের সফর এখানেই শেষ হল। তবে রাজনীতিতে যেকোনো শেষের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এক নতুন শুরু। বাম থেকে তৃণমূল, এবং মাত্র এক দশকের মধ্যে রাজ্যসভা ও রাজ্য বিধানসভা—উভয় জায়গাতেই প্রতিনিধিত্ব করা এই নেতার পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল।















