রিয়া পাত্র

১৯৯৮ সাল। বছরের প্রথম দিন। কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেস গড়েছিলেন মমতা। তার আগে দল থেকে বহিষ্কৃত হন তিনি। পরে নিজেই দল থেকে বেরিয়ে, গড়ে ফেলেন নতুন দল। ধীরে ধীরে কিছুজন মমতার তৃণমূল কংগ্রেসে এসেছিলেন। কিছুজন আসেননি। যাঁরা এসেছিলেন, তাঁরা ধীরে ধীরে ঢুকে পড়েছিলেন মমতার 'সিস্টেম'-এ। কিন্তু যাঁরা কংগ্রেসেই রয়ে গিয়েছিলেন, তাঁরা অন্য দলে থেকে দেখলেন, এক সময়ের রাজনৈতিক সহকর্মী 'ডেমোক্রেসি'তে বিশ্বাসী মমতা হয়ে উঠলেন 'অটোক্রেসি'র মুখ। এখন মমতার দল ভেঙে দু'টুকরো বাইরে থেকে। ভিতরের অবস্থা আরও নড়বড়ে, বে-আব্রু। মমতার সঙ্গে যাঁরা কংগ্রেসে আসেননি, কিন্তু মমতা বলতে জানতেন 'লড়াকু' রাজনীতিবিদকে। তাঁরা কী ভাবছেন এখন? এই দিশেহারা অবস্থায়, মমতার ভাবনা নিয়েই বা কী ভাবছেন?

উত্তর খুঁজতে আজকাল ডট ইন যোগাযোগ করেছিল বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা প্রদীপ ভট্টাচার্যের সঙ্গে। রাজনীতির ময়দানে চার দশক ধরে চেনেন মমতাকে। একসঙ্গে জলে-ঝড়ে-মৃতদেহ আগলে, পথে-ঘাটে মিছিল করেছেন। মমতাকে আলাদা হয়ে যেতে দেখেছেন দল থেকে। ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছতে দেখেছেন, দেখছেন ক্ষমতা হারিয়ে একেবারে একলা হয়ে যেতেও। এই প্রসঙ্গে বলতে গিয়েই কংগ্রেস নেতা শুরুতেই বলছেন, পুরনো কথা। বলছেন, 'সিপিএম-এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে ভাল কথা। আমরা সংঘবদ্ধভাবে, মানে- সোমেন মিত্র, আমি, মমতা ব্যানার্জি, সবাই মিলেই লড়াই জারি রেখেছিলাম । দেশ তো চলছিল। হঠাৎ করে উনি বললেন যে বিজেপিকে সঙ্গে নিতে হবে। নইলে সিপিএমের বিরুদ্ধে লড়াই হবে না। স্বাভাবিকভাবেই কংগ্রেসের সঙ্গে রাজনীতিতে বিজেপির  আদর্শের পার্থক্য এতটাই বেশি, আমাদের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। মমতা হাতে ধরে বিজেপিকে নিয়ে এলেন। এখন সেই বিজেপি ওঁর ঘর ভাঙল। বৃত্ত সম্পূর্ণ হওয়ার মতো।'


সঙ্গেই তিনি বলেন, 'মমতা ব্যানার্জি যখন কংগ্রেসের সঙ্গে ছিলেন, তখন কিন্তু তার মধ্যে ডেমোক্রেটিক অ্যাটিটিউড ছিল। কিন্তু তিনি যেদিন ক্ষমতায় এলেন, তারপর থেকেই তার মধ্যে কিন্তু রূপান্তর শুরু হল। প্রথম নির্বাচনে তার অল্পঅল্প প্রতিফলন পেলাম। আমি তখন প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি। বাধ্য হয়েছিলাম বেরিয়ে আসতে। তারপরে তিনি আবারও জিতলেন, আবারও জিতলেন। থার্ড টাইমে জেতার পরে তাঁর অটোক্রেসির সঙ্গে সংযুক্ত হল একটা সাংঘাতিক জিনিস। সেটা হচ্ছে প্লান্টেশন অফ করাপশন। কালটিভেশন অফ করাপশন। ফল তো পেতেই হতো।'

কিন্তু প্রশ্ন, এই সব হারিয়ে মমতা ব্যানার্জি কি দমে গেলেন? নাকি কালীঘাটের বাড়িতে বসে, তিনি ভাবছেন কিছু না কিছু? ভাবলেও কী হতে পারে তা? চার দশকের বেশি সময় ধরে মমতার রাজনীতিকে দেখা প্রদীপ বলছেন, 'আমার নিজের দুটো ধারণা। একটা হচ্ছে ওঁ হয়তো ওঁর অতীতের কথা মনে করছেন। ভাবছেন বিরোধী নেত্রী থেকে ক্ষমতায় থাকা মমতা, কী কী বদল হয়েছিল। কী কী হওয়া ঠিক হয়নি। সঙ্গেই হয়তো ভাবছেন, আমি আমার তৈরি করা দলকে কার হাতে তুলে দিয়ে যাব? ওঁ কিন্তু বুঝতে পারছেন না, কাকে দেবে। উত্তরসূরি খুঁজে পাচ্ছেন না, আর সেই কারণেই দিশেহারা।'


মমতা কি কোথাও গিয়ে ভাবছেন, কংগ্রেসের হাত ধরার কথা? বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা বলছেন, 'আমি যতদূর জানি ওঁকে, নিশ্চয়ই কংগ্রেসের হাত এখন খুব শক্তভাবে ধরবে।' 

কিন্তু কংগ্রেস কি তাতে রাজি হবে? বলছেন,  'এখন শুনছি তৃণমূলের সাংসদরাও কিছু উলটো সুর গাইছে। তা যদি হয়, তাহলে জাতীয় স্তরেও গুরুত্ব কমবে মমতার। এমনিতেও কংগ্রেস এই পরিস্থিতিতে হাত ধরে সাহায্য করলে, হাত যেদিন শক্ত হবে, সেদিন আবার ছেড়ে যাবেন তিনি।' 

কংগ্রেসের মুখপাত্র সুমন রায়চৌধুরী বলছেন, '২০১১ সালের পর , কংগ্রেসের সাহায্য নিয়ে ক্ষমতায় এসে ওঁর একমাত্র দিশা ছিল কংগ্রেসকে ভেঙে দেওয়া, শেষ করে দেওয়া, আজ দেখুন, যাঁদের নির্দেশে ওঁ কংগ্রেসকে শেষ করলেন তারাই ওঁকে শেষ করল। তবে এটাও মানতে হবে, যেভাবে প্রধান বিরোধী দল তৈরি হল বাংলায় একটি দলকে ভাঙিয়ে সেটা গণতন্ত্রের পরিপন্থী।' কংগ্রেস এই পরিস্থিতিতে মমতাকে জায়গা দেবে? দিলেও কতটা? তিনি বল  ঠেলছেন শীর্ষ নেতৃত্বের দিকেই।