রিয়া পাত্র: সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসে এখন চরম ডামাডোল। দল কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে— মমতা ব্যানার্জি নাকি বিদ্রোহী নেতা তথা বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত ব্যানার্জি? এই নিয়ে যখন নির্বাচন কমিশনে দুই তরফই নিজেদের আইনি নথি জমা দিয়েছে এবং টানটান উত্তেজনা চলছে রাজনৈতিক মহলে, ঠিক তখনই বড় চাল চালল ঋতব্রত শিবির। এবার সংগঠন গুছিয়ে নেওয়ার কাজে কোমর বেঁধে নেমে পড়ল তারা। শনিবার দুপুরে তপসিয়ার একটি হোটেলে এক হাইভোল্টেজ বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল ঋত-শিবিরের তরফে। সেই বৈঠকেই চূড়ান্ত হয়ে গেল দলের নতুন জেলা সভাপতি ও মুখপাত্রদের তালিকা। যা বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

এদিনের এই বৈঠকে হাজির হতে দেখা গেছে তৃণমূলের একসময়ের বহু চেনা এবং পুরনো মুখকে। শান্তনু সেন, অশোক রুদ্র, নারায়ণ গোস্বামীর মতো নেতারা একে একে তপসিয়ার সভাকক্ষে প্রবেশ করেন। 

শনিবারের এই সাংগঠনিক রদবদলের সবচেয়ে বড় চমক অবশ্যই বীরভূমের 'কেষ্ট' ওরফে অনুব্রত মণ্ডলের অবস্থান। গরু পাচার মামলায় জেলে থাকার সময় বীরভূমের জেলা সভাপতি পদ খুইয়েছিলেন অনুব্রত। নেত্রী মমতা ব্যানার্জি নিজে সেই জেলার রাশ হাতে রেখেছিলেন এবং অন্য কাউকে সেই পদ দেননি। তবে জেল থেকে ফেরার পর সাম্প্রতিক নির্বাচন ও রাজনৈতিক আবহে বীরভূমের কোর কমিটিতে থাকলেও জেলা স্তরে যোগ্য গুরুত্ব না পাওয়ায় অনুব্রত ক্ষুব্ধ ছিলেন বলে তাঁর ঘনিষ্ঠ সূত্রের খবর। শুক্রবার বিধানসভায় ঋতব্রত শিবিরের সঙ্গে এক বিধায়কের মাধ্যমে ফোনে অনুব্রতের চূড়ান্ত বোঝাপড়া সম্পন্ন হয়। আর শনিবার সশরীরে উপস্থিত না থাকলেও ঋতব্রতপন্থী 'আসল তৃণমূল'-এর বীরভূম জেলা সভাপতির গুরুদায়িত্ব ফিরিয়ে দেওয়া হল অনুব্রত মণ্ডলকেই। তাঁর পাশাপাশি বীরভূমের পরিচিত মুখ অভিজিৎ সিংহ ওরফে রানা সিংও এই নতুন জাতীয় কর্মসমিতিতে জায়গা করে নিয়েছেন। ফিরহাদ হাকিম, অরূপ রায়, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের পর অনুব্রতের মতো হেভিওয়েট নেতার এই শিবির বদল বীরভূমের রাজনীতির সমীকরণ পুরোপুরি বদলে দেবে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

এদিনের বৈঠক শেষে ঋতব্রত শিবিরের পক্ষ থেকে বিভিন্ন জেলার সভাপতিদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। নতুন এই তালিকায় হাওড়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অরুণাভ সেনকে, পশ্চিম মেদিনীপুরের সভাপতি হয়েছেন প্রদীপ সরকার এবং ঘাটালের সাংগঠনিক প্রধান করা হয়েছে সঞ্জয়কে। পাশাপাশি বাঁকুড়ার দায়িত্ব পেয়েছেন রথীন ব্যানার্জি, পুরুলিয়ায় উজ্জ্বল কুমার, পূর্ব বর্ধমানে রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় এবং পশ্চিম বর্ধমানে নগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়। কলকাতার বুকেও নিজেদের সংগঠন মজবুত করতে উত্তর কলকাতার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সন্দীপন সাহাকে এবং দক্ষিণ কলকাতার সভাপতি করা হয়েছে দেবাশিস কুমারকে। এছাড়া ডায়মন্ড হারবারে শুভাশীষ দাশ, সুন্দরবনে গণেশ মণ্ডল এবং হাওড়া সদরে সৃষ্টিধর ঘোষ সভাপতি হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের সামনে দলের বক্তব্য তুলে ধরার জন্য সন্দীপন সাহা, আখরুজ্জামান, কোহিনুর মজুমদার ও সুদীপ রাহাকে মুখপাত্রের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের আগেই ঋতব্রত শিবিরের এই ঝোড়ো ব্যাটিং বাংলার রাজ্য রাজনীতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, সেটাই এখন দেখার।