আজকাল ওয়েবডেস্ক: বারুইপুরে নাবালিকা ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় নিহত কিশোরীর পরিবারের সঙ্গে বুধবার দেখা করলেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি ও প্রাক্তন সাংসদ অধীর রঞ্জন চৌধুরী। পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি তিনি মূল অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলের পুলিশি এনকাউন্টারে মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে একাধিক প্রশ্ন তোলেন। পুলিশের বয়ান নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে তিনি রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং পুলিশ প্রশাসনের সক্ষমতা নিয়েও কড়া মন্তব্য করেন।
মঙ্গলবার গভীর রাতে পুলিশের গুলিতে প্রভাস মণ্ডলের মৃত্যু হয়। পুলিশ সূত্রের দাবি, ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য তাঁকে ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেই সময় অভিযুক্ত এক পুলিশকর্মীর আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করে এবং গুলি চালায়। আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালাতে বাধ্য হয় পুলিশ। সেই গুলিতেই প্রভাসের মৃত্যু হয় বলে পুলিশের দাবি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক।
বুধবার দুপুরে বারুইপুরে পৌঁছে নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন অধীর। পরিবারের সদস্যদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন তিনি। পরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে পুলিশের দেওয়া ঘটনার বিবরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কংগ্রেস নেতা।
অধীর চৌধুরী বলেন, “পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী একজন অভিযুক্ত কীভাবে একজন পুলিশকর্মীর কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালাতে পারে, তা অত্যন্ত বিস্ময়কর।” তিনি ব্যঙ্গের সুরে বলেন, “যে ব্যক্তিকে নিয়ে পুলিশের দাবি, তিনি একজন সাধারণ ভ্যানচালক এবং মাদকাসক্ত ছিলেন, তিনি যদি সহজেই পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নিতে পারেন, তাহলে রাজ্য পুলিশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে।”
তিনি আরও বলেন, “যদি পুলিশের দাবি সত্যি হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লে পুলিশ কীভাবে তা মোকাবিলা করবে, সেই প্রশ্নও সামনে আসে।” তাঁর বক্তব্য, “একজন অভিযুক্ত যদি পুলিশের কাছ থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হন, তবে সংগঠিত অপরাধী বা জঙ্গি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পুলিশের প্রস্তুতি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।”
শুধু এনকাউন্টার নিয়েই নয়, রাজ্যের সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সরব হন অধীর। তিনি বলেন, “গত কয়েক বছরে পুলিশের পেশাদারিত্ব ও কার্যক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।” তাঁর মতে, সরকার বদলালেই সমস্যার সমাধান হয় না, প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভিত আরও শক্তিশালী করা জরুরি। তিনি মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, “রাজ্য পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার দিকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া উচিত।”
অধীরের বক্তব্য, সাধারণ মানুষের অভিযোগ দ্রুত শোনা এবং নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রশাসনের দায়িত্ব। মানুষের মনে পুলিশের প্রতি যে অনাস্থা তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বারুইপুরের এই নৃশংস ঘটনাকে ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক চাপানউতোর তীব্র হয়েছে। একদিকে শাসক দলের বিভিন্ন নেতার বক্তব্য, অন্যদিকে বিরোধীদের ধারাবাহিক প্রশ্ন— সব মিলিয়ে ঘটনাটি এখন রাজ্যের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। প্রভাসের এনকাউন্টারে মৃত্যুর পর সেই বিতর্ক আরও জোরাল হয়েছে।
তবে পুলিশ এখনও তাদের আগের অবস্থানেই অনড়। তাদের দাবি, অভিযুক্ত পালানোর চেষ্টা করায় এবং পুলিশকর্মীর অস্ত্র ব্যবহার করে গুলি চালানোর পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালানো হয়। সেই ঘটনায় অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছে। পুরো ঘটনার তদন্ত চলছে এবং তদন্তের ভিত্তিতেই পরবর্তী পদক্ষেপ করা হবে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বারুইপুরে নাবালিকা ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় ইতিমধ্যেই একাধিক অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মূল অভিযুক্ত প্রভাসের মৃত্যু তদন্তের গতিপথে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একদিকে পুলিশ তাদের পদক্ষেপকে আইনসঙ্গত বলে দাবি করছে, অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তুলছে। এই পরিস্থিতিতে নিহত কিশোরীর পরিবারের দ্রুত বিচার এবং গোটা ঘটনার স্বচ্ছ তদন্তের দাবিই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। আগামী দিনে তদন্ত কোন দিকে এগোয় এবং এনকাউন্টার নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলির কী জবাব মেলে, সেদিকেই নজর রয়েছে রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের।















