আজকাল ওয়েবডেস্ক: ১৯৯০ সাল, এক অদম্য কংগ্রেস নেত্রী তরুণী মমতা ব্যানার্জি আন্দোলনরত অবস্থায় হাজরা মোড়ে আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন। সেই ঘটনা দু'টো দিক থেকে মোড়-ঘুরানো অধ্যায় হিসেবে প্রমাণিত হয়েছিল। প্রথমত, সেই হামলা তাঁকে একজন লড়াকু এবং জননেত্রী হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিল। আজও কলকাতার তৃণমূল কংগ্রেস কার্যালয়ে দেখা যায়, সেই সময়ের ছবিগুলো দেওয়ালজুড়ে সগৌরবে শোভা পাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, এটি পরবর্তীকালে তৃণমূল কংগ্রেস গঠনের পটভূমি তৈরি করেছিল। কংগ্রেস নেতারা মমতাকে যথেষ্ট জোরালো সমর্থন দেননি - এই ক্ষোভে মমতা ব্যানার্জি দল ত্যাগ করেন এবং তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেন। বাকিটা ইতিহাস।
ব্যক্তিগত আঘাতকে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করা মমতা ব্যানার্জির রাজনৈতিক কৌশলের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে, বিজেপি তাঁর ওপর প্রাণঘাতী হামলার চেষ্টা করছে- এমন অভিযোগ তুলে হুইলচেয়ারে বসে প্রচার চালানো তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য রাজনৈতিকভাবে ফলদায়ক হয়েছিল।
যদিও ২০২৬ সালের নির্বাচনী প্রচার চলাকালীন মমতা শারীরিকভাবে আহত হননি, তবুও তিনি বারবার বিজেপির পক্ষ থেকে আক্রমণের আশঙ্কার কথা তুলে ধরেছিলেন। তবে বিজেপি সেই ফাঁদে পা দেয়নি। অনেকেই মনে করেন, ২০২১ সালে গেরুয়া বাহিনী যে ভুল করেছিল, এবার তারা সচেতনভাবেই তা এড়িয়ে গিয়েছে।
এখন প্রশ্ন হল, অভিষেক ব্যানার্জি কি ঠিক একই কৌশল অনুসরণ করার চেষ্টা করছেন? তিনি কি এমনটা আশা করছেন যে, সম্প্রতি তাঁর দিকে পাথর ও ডিম ছোড়ার যে অভিযোগ উঠেছে - সেই ঘটনাটি তাঁকে রাজনৈতিকভাবে ঠিক সেভাবেই প্রতিষ্ঠিা দেবে, যেভাবে ১৯৯০ সালে হাজরা মোড়ের আক্রমণ তাঁর পিসি-কে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করেছিল?
তবে বেশ কিছু কারণে এই তুলনা ধোপে টেকে না।
১৯৯০ সালের বাংলা আর ২০২৬ সালের বাংলা - অনেকটাই আলাদা। সেই সময়ে, বাংলার রাজনীতি মূলত কংগ্রেস এবং বামফ্রন্টের মধ্যকার একটি দ্বিমেরু-কেন্দ্রিক লড়াইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সেখানে একটি তৃতীয় বিকল্প শক্তির উত্থানের সুযোগ ছিল এবং মমতা ব্যানার্জি অত্যন্ত সফলভাবে সেই শূন্যস্থানটি পূরণ করেছিলেন।
তাছাড়া, সেই সময়ে বামফ্রন্ট কোনও সর্বভারতীয় শক্তি ছিল না। ফলে তাদের সম্পদ ও প্রভাবের পরিধি ছিল সীমিত। মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা যখন পরিবর্তিত হতে শুরু করল এবং বাংলা তার চিরাচরিত রাজনৈতিক গণ্ডির বাইরে নতুন কিছু খুঁজতে চাইল, ঠিক তখনই তৃণমূল কংগ্রেস একটি বিকল্প শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
মমতা ব্যানার্জির জ্বালাময়ী বক্তৃতা এবং একজন 'রাস্তার লড়াকু নেত্রী' হিসেবে তাঁর ভাবমূর্তি বহু মানুষকে এই বিশ্বাস জুগিয়েছিল যে, একমাত্র তিনিই পারেন বাংলায় প্রকৃত পরিবর্তন নিয়ে আসতে। এমনকি ২০২১ সালেও, অনেক ভোটারের কাছে হুইলচেয়ারে বসা মমতা, বিজেপির সেই নেতৃত্বের চেয়ে অধিক গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছিলেন। এছাড়াও সেবার বিজেপি নেতাদের আচরণকে বঙ্গবাসীর বেশিরভাগই কঠোর ও দাপুটে বলে মনে করত। তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক শক্তি এবং একজন রাজনৈতিক লড়াকু হিসেবে তাঁর দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত ভাবমূর্তি তৃণমূলের পক্ষেই কাজ করেছিল।
অন্যদিকে, ক্ষমতায় হারানোর পর বর্তমানে অভিষেক ব্যানার্জি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন। স্বয়ং তৃণমূল কংগ্রেসই এখন চাপের মুখে পড়েছে। দলের অভ্যন্তরে থাকা প্রবীণ নেতারা এখন মুখ খুলতে শুরু করেছেন এবং অনেক সমালোচকই এর আংশিক দায় দলের ' সেকেন্ড ইন কমান্ড' অভিষেক ব্যানার্জির ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন। তাঁর পিসির (মমতা ব্যানার্জি) ঠিক উল্টো, এই ‘ভাইপো’(এই নামেই তিনি জনগণের কাছে পরিচিত) প্রতিপক্ষের চোখে প্রায়শই এমন একজন হিসেবে প্রতিভাত হন, যিনি বিশেষ সুবিধাভোগী এবং দুর্নীতির অভিযোগে কলঙ্কিত। ফলস্বরূপ- মমতা ১৯৯০ সালে, এমনকি ২০২১ সালেও ভোটারদের মনে যে গভীর সহানুভূতির সঞ্চার করতে পেরেছিলেন, অভিষেক আজ আর সেই একই সহানুভূতি জাগাড়ের আশেপাশেও নেই।
তাছাড়া, ১৯৯০-এর দশকের বামফ্রন্টের তুলনায় বর্তমানের বিজেপিও এক সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাঁচের প্রতিপক্ষ। বাংলায় একদা নগণ্য উপস্থিতি ছিল পদ্ম প্রতীকের। আজ সেই দলই বাংলা তথা দেশের ক্ষমতায়। বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ এক শক্তিশালী জাতীয় রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত হয়েছে বিজেপি। তাদের হাতে রয়েছে বিপুল পরিমাণ সম্পদ এবং এই রাজ্যে নিজেদের প্রভাব-প্রতিপত্তি বিস্তারে তারা আজও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
মমতা ব্যানার্জি বিলক্ষণ অবগত যে, তাঁর দল বর্তমানে নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তবে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, তিনি অভিষেক ব্যানার্জিকে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। এই ক্ষমতা-হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটি সফল করতে হলে, অভিষেককে অবশ্যই সাধারণ মানুষের মাঝে আরও ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে হবে।
সম্ভবত ঠিক এই কারণেই, অভিষেককে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মমতা ব্যানার্জি তড়িঘড়ি হাসপাতালে ছুটে গিয়েছিলেন। ‘ইন্ডিয়া’ জোট এবং সমগ্র তৃণমূল কংগ্রেসকে অভিষেকের পাশে সমবেত করে, তিনি হয়তো দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের ওপর তাঁর দাবিকে আরও জোরালো করে তোলারই আশা করছেন।
কিন্তু অভিষেক তো আর মমতা নন। আর ২০২৬ সালও তো ১৯৯০ সালের মতো নয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থায় বিজেপি নিশ্চিতভাবেই এমন পদক্ষেপ করবে, যাতে বাংলার ভোটাররা এই মৌলিক পার্থক্যটির কথা কখনওই ভুলে না যান।















