আজকাল ওয়েবডেস্ক: তৃণমূল কংগ্রেস যখন তার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখোমুখি (নবাগত বিধায়ক ঋতব্রত ব্যানার্জির নেতৃত্বে একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী নিজেদেরই দলের 'আসল কর্তৃপক্ষ' বলে দাবি করছে তখন অনেকেই এই পরিস্থিতির সঙ্গে 'মহারাষ্ট্র মডেল'-এর তুলনা করছেন। কয়েক বছর আগে শিবসেনা ও এনসিপি-কে ঘিরেও একনাথ শিন্ডে এবং অজিত পাওয়ার গোষ্ঠীর বিদ্রোহে এ ধরনের এক সংকট তৈরি হয়েছিল। ফলে শিবসেনা এবং এনসিপি-তে ভাঙন ধরেছিল। তবে ঋতব্রত কিন্তু শিন্ডে বা পাওয়ারের মতো কেউ নন। তিনি কোনও জননেতাও নন। তাহলে বড় প্রশ্ন হল- কীভাবে একজন নবাগত তৃণমূল বিধায়ক মমতার বিরুদ্ধে ৬০ জন বিধায়ককে একজোট করতে পারলেন? তাও আবার নির্বাচনী বিপর্যয়ের মাত্র কয়েক সপ্তাহের ভেতর।

এটা বোঝা জরুরি যে, তৃণমূলের ক্ষেত্রে ঘটনাপ্রবাহ এত দ্রুত এবং নাটকীয়ভাবে কীভাবে মোড় নিল? মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন দল কেবল এক-দুটি নির্বাচনেই জয়লাভ করেনি, বরং টানা তিনটি মেয়াদে বাংলার শাসনভার সামলেছে। সাম্প্রতিক সময় পর্যন্তও দলটি রাজনৈতিকভাবে অজেয় বা অপ্রতিরোধ্য বলেই মনে হত। অথচ, নির্বাচনী পরাজয়ের পরপরই (এমনকি বিজেপি সরকার তাদের পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিসভা গঠন করে ওঠার আগেই) তৃণমূলের অন্দরে দলত্যাগ এবং অসন্তোষের ঢেউ উঠতে শুরু করে।

**তৃণমূলের সংকটের নেপথ্যে**
তৃণমূলের এই সংকটের মূলে রয়েছে একটি গুরুতর অভিযোগ, দলের পক্ষ থেকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে শোভনদেব চ্যাটার্জিকে সমর্থন জানিয়ে লেখা একটি চিঠিতে নাকি দলেরই বিধায়কদের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। বিধায়ক সন্দীপন সাহা এবং ঋতব্রত বিধানসভা সচিবালয়ে একটি অভিযোগ দায়ের করার পরই এই বিতর্কটি প্রকাশ্যে আসে।

অভিযোগ দায়েরের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তৃণমূল দলবিরোধী কার্যকলাপের দায়ে ওই দুই বিধায়ককে দল থেকে বহিষ্কার করে। এই বহিষ্কারের ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন দলের অন্দরে জোর গুঞ্জন চলছিল যে- ঋতব্রত ব্যানার্জি দল ভাঙার চেষ্টা করছেন এবং অদূর ভবিষ্যতে তিনিই নিজেকে 'আসল তৃণমূল' হিসেবে দাবি করতে পারেন। বেশ কিছুদিন ধরেই তৃণমূলের জন্য পরিস্থিতিটা অশুভ সংকেত দিচ্ছিল। গত রবিবার তৃণমূলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৬০ জনই মমতার বাসভবনে আয়োজিত একটি বৈঠকে অনুপস্থিত ছিলেন। এমনকি মঙ্গলবার, নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর মমতার প্রথম রাজপথের বিক্ষোভেও মাত্র আটজন বিধায়ক এবং ছয়জন সাংসদ উপস্থিত ছিলেন।

এই ঘটনাগুলিই তৃণমূলের অন্দরে দানা বাঁধতে থাকা অসন্তোষের গভীরতাকেই স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছিল। শেষমেশ বুধবার বিদ্রোহী গোষ্ঠী বিধানসভার অধ্যক্ষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এবং ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে সমর্থন জানিয়ে ৬০ জন বিধায়কের স্বাক্ষর-সহ একটি চিঠি জমা দেয়। তবে, বিদ্রোহী গোষ্ঠীর বিধায়করা মমতা ব্যানার্জিকেই দলের নেত্রী হিসেবে ঘোষণা করেছে। সংবাদমাধ্যমকে তৃণমূলের এক বিদ্রোহী বিধায়ক বলেছেন, "আমরা মমতা ব্যানার্জি নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছি না। আমরা দল ভাঙার কিংবা আলাদা কোনও দল গঠনের চেষ্টাও করছি না। আমরা তৃণমূলের পতাকার নীচেই কাজ করে যাব।" পরে বিধানসভার অধ্যক্ষ ঋতব্রত ব্যানার্জিকেই বিরোধী দলনেতার পদ মঞ্জুর করেন।

তৃণমূলের অন্দরের এই বিদ্রোহ যখন সবার চোখের সামনেই উন্মুক্ত হয়ে পড়ছিল, তখন এই পদক্ষেপের দ্রুততা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কৌতূহলী করে তোলে। সর্বোপরি, ঋতব্রত (যিনি সিপিআইএম থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার মাত্র আট বছর আগে তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন) তাঁর দলে একনাথ শিন্ডে কিংবা অজিত পাওয়ারের মতো সেই পর্যায়ের রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর ক্ষমতা রাখেন না।

শিবসেনা ও এনসিপি-র সংকটের চেয়ে এটা কীভাবে আলাদা?
শিন্ডে এবং পাওয়ারের মতো পোড়খাওয়া রাজনৈতিক হেভিওয়েটদের ক্ষেত্রেও, শিবসেনা এবং এনসিপি-তে ভাঙন ধরানোর কাজটি মাত্র কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যে সম্পন্ন হয়নি। এই দলগুলোতে বিদ্রোহ দানা বাঁধার আগে দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে চাপা অসন্তোষ ধূমায়িত হচ্ছিল।

শিবসেনার ক্ষেত্রে, বিদ্রোহের বীজ রোপিত হয়েছিল ২০১৯ সালে, যখন উদ্ধব ঠাকরে সরকার গঠনের লক্ষ্যে নিজেদের আদর্শগতভাবে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর দল কংগ্রেস এবং এনসিপি-র সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন। শিবসেনার বহু নেতা ও কর্মী এই জোটকে একটি 'অস্বস্তিকর মৈত্রী' হিসেবে দেখেছিলেন, যা দলের দীর্ঘদিনের লালিত হিন্দুত্ববাদী আদর্শের পরিপন্থী ছিল।

পরবর্তী দুই বছর ধরে এই ক্ষোভ ক্রমশ পুঞ্জীভূত হতে থাকে। অবশেষে ২০২২ সালে তা চরম আকার ধারণ করে, যখন শিন্ডে, প্রায় ৪০ জন বিধায়কের সমর্থন নিয়ে উদ্ধব ঠাকরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং জোট সরকার (এমভিএ)—কে ক্ষমতাচ্যুত করেন। শিন্ডে তাঁর এই বিদ্রোহের যৌক্তিকতা তুলে ধরে যুক্তি দিয়েছিলেন যে, আদর্শগতভাবে বিপরীত মেরুতে অবস্থানকারী দলগুলির সঙ্গে জোট বাঁধার ফলে শিবসেনার মূল হিন্দুত্ববাদী সত্তা বা পরিচিতি ক্রমশ ম্লান হয়ে যাচ্ছিল।

এখানে মূল শব্দটি হল 'আদর্শ'। শিবসেনা এবং এনসিপি— উভয় দলই সুনির্দিষ্ট কিছু আদর্শের ওপর ভিত্তি করে গঠিত হয়েছে। ঠিক এই কারণেই, বিদ্রোহ এবং পরবর্তী ভাঙনের পরেও, দলের কর্মীদের একটি বিশাল অংশ উদ্ধব এবং শরদ পাওয়ারের প্রতি অনুগত থেকে গিয়েছে।

তৃণমূলের ক্ষেত্রে পরিস্থিতিটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে মমতা ব্যানার্জি যে দলটি গঠন করেছিলেন, তা কখনওই কোনও সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেনি।

ঋতব্রত এবং ৫৭ জন বিধায়কের এই বিদ্রোহের পেছনেও কোনও আদর্শ বা জনসমর্থনের ভূমিকা নেই। এর মূল কারণ হল তৃণমূল নেতৃত্বের প্রতি ক্ষোভ, বিশেষ করে মমতার ভাইপো এবং লোকসভার সাংসদ অভিষেক ব্যানার্জির প্রতি পুঞ্জীভূত অসন্তোষ।

তৃণমূল আনুগত্য বা আদর্শের বন্ধনে আবদ্ধ নয়
গত কয়েক বছরে আমরা লক্ষ্য করা যায় যে, তৃণমূলের নেতা ও কর্মীদের একটি বিশাল অংশ দলের সঙ্গে ঠিক আনুগত্য বা আদর্শ- কোনোটির মাধ্যমেই দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ নয়।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছিল। সেই সময়, তৃণমূল নির্বাচনে পরাজিত হতে পারে, এমন ব্যাপক জল্পনা-কল্পনার মধ্যেই, রাজীব ব্যানার্জি-সহ দলের বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট নেতা নির্বাচনের আগেই দল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। তবে, তৃণমূল যখন বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নির্বাচনে জয়লাভ করল, তখন সেই নেতারা একে একে আবারও দলে ফিরে আসেন। 

বর্তমান পরিস্থিতিতে, বিশেষজ্ঞদের মতামত - এটি একটি বিদ্রোহের চেয়ে বরং এক ধরনের অভ্যুত্থানই বেশি। রাজনৈতিক বিশ্লেষক সায়ন্তন ঘোষ এক টুইটে লিখেছেন, "বিজেপি যে তৃণমূলের অভ্যন্তরে কোনও শক্তিশালী আদর্শিগত গোষ্ঠী গড়ে তোলার চেষ্টা করছে, এমনটা মনে হয় না। বরং তারা এমন একটি গোষ্ঠীকে নিজেদের দলে টানছে, যাদের প্রধান বৈশিষ্ট্যই হল আনুগত্যের অভাব।"

সুতরাং, এটি স্পষ্ট যে বর্তমান এই অস্থিরতার মূলে আদর্শের চেয়ে বরং নেতৃত্বের প্রতি ক্ষোভই প্রধান ভূমিকা পালন করছে। আর এই পুরো পরিস্থিতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন অভিষেক ব্যানার্জি- যিনি তৃণমূলের কার্যত 'দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর' ব্যক্তি।

তৃণমূলের বেশ কয়েকজন নেতা অভিযোগ করেছেন যে, রাজনৈতিক পরামর্শদাতা সংস্থা 'আই-প্যাক' -এর সহায়তায় অভিষেক যখন দলের কাজকর্ম পরিচালনা শুরু করেন, তখন দলের ওপর মমতার নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই খর্ব হয়ে পড়েছিল। তবে, অভিষেক বিপুল ক্ষমতা ভোগ করলেও, তাঁর পেছনে না ছিল কোনও গণসমর্থন, আর না ছিল তেমন কোনও বিশ্বাসযোগ্যতা। ঠিক এই কারণেই, মমতা ব্যানার্জির চেয়ে বরং তৃণমূলের অসন্তুষ্ট নেতাদের রোষের মুখে অভিষেককেই বেশি পড়তে হয়েছে।

বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র আর পি সিং পুরো পরিস্থিতিটিকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন। 'এক্স' প্ল্যাটফর্মে করা একটি দীর্ঘ পোস্টে আর পি সিং দাবি করেন যে, তৃণমূল দলটি মূলত কোনও আদর্শিক বিশ্বাস বা প্রত্যয়ের ভিত্তিতে নয়, বরং ক্ষমতার ভাগ পাওয়ার লোভেই ঐক্যবদ্ধ ছিল।তিনি বলেন, "তৃণমূলকে এতদিন যা একসূত্রে গেঁথে রেখেছিল, তা কোনও সুশাসনের অভিন্ন রূপকল্প কিংবা কোনো ঐক্যবদ্ধ আদর্শিক অঙ্গীকার ছিল না। বরং তা ছিল ক্ষমতার আকর্ষণ এবং সেই ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি বিশেষ 'ইকোসিস্টেম' বা পরিবেশ।"

বিজেপি নেতা তাঁর টুইটে আরও লেখেন, "অনেকটা বলা যায়, দুর্নীতিই হয়ে উঠেছিল দলটির কার্যত প্রধান আদর্শ এবং সেই আঠা - যা সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক পটভূমি ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী নেতাদের একসূত্রে বেঁধে রেখেছিল। যতদিন দলের ক্ষমতা সুরক্ষিত ছিল, ততদিন সেই বন্ধনও অটুট ছিল। কিন্তু যেই মুহূর্তে দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করল, অমনি সেই বন্ধনও শিথিল হতে শুরু করল।"

সারকথা হল, তৃণমূলের বিদ্রোহী গোষ্ঠীর এই পদক্ষেপের ফলে এখন মমতা ব্যানার্জির ওপরই সেই গুরুদায়িত্ব এসে পড়েছে যে - তাঁকে হয় অভিষেকের পক্ষ নিতে হবে, নতুবা ঋতুব্রত-নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীর পক্ষ অবলম্বন করতে হবে। এখন দেখার বিষয় এটাই যে, কোনও আদর্শিগত আকর্ষণের অনুপস্থিতিতেও মমতা তাঁর দলের ওপর পুনরায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেন কি না এবং দলের নেতাদের একসূত্রে গেঁথে রাখার সেই 'আঠা' হয়ে উঠতে পারেন কি না।