আজকাল ওয়েবডেস্ক: লোকশিল্প সংরক্ষণ ও প্রসারে সরকারি একাধিক প্রকল্প থাকলেও তার বাস্তব সুফল আজও পৌঁছয়নি প্রান্তিক লোকশিল্পীদের কাছে। শিল্পী ভাতা, পরিচয়পত্র কিংবা কোনও সরকারি সহায়তাও পাননি তাঁরা। অথচ নীরবে, নিভৃতে এক প্রাচীন লোকসংস্কৃতির ধারাকে আজও বাঁচিয়ে রেখেছেন।

পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার সবং ব্লকের দশগ্রাম খাজুরি বুথের ডমপাতা এলাকার লোধা সম্প্রদায়ের তিন সহোদর পূর্ণচন্দ্র, শম্ভু ও গুরুপদ কোটাল এই মুহূর্তে সবংয়ের শেষ চাঙশিল্পী। জানা গিয়েছে, এই তিন বৃদ্ধ পেশায় দিনমজুর ও ভিক্ষাজীবী। গীত ও বাদ্যের সম্মিলিত পরিবেশনে ‘চাঙ’ হল লোধা সম্প্রদায়ের মানুষের ঐতিহ্যবাহী লোকসংস্কৃতি ও বিনোদনের প্রধান মাধ্যম।

এক সময় সবংয়ের প্রায় প্রতিটি লোধা পাড়ায় চাঙের গান ও বাদ্যের আসর বসত। বাৎসরিক পুজো, বিয়ে কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে চাঙ ছিল অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। প্রয়োজনে ব্লকের বাইর থেকেও চাঙশিল্পীদের ডেকে আনা হত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ঐতিহ্য আজ প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। বাদ্যযন্ত্র নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং অর্থের অভাবে বহু শিল্পী চাঙ চর্চা ছেড়ে দিয়েছেন।

বর্তমানে এই তিন প্রবীণ সহোদরের হাতেই কোনওক্রমে টিকে রয়েছে সবংয়ের চাঙ সংস্কৃতি। তাও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তাঁদের মধ্যেও ক্রমশ আগ্রহ কমছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল, নতুন প্রজন্মের কেউই এই লোকসংস্কৃতি শিখতে আগ্রহী নয়। ফলে অভাব, অবহেলা ও স্বীকৃতি না পাওয়ার চাপে কার্যত মৃত্যুর প্রহর গুনছে চাঙ।

চাঙ সংস্কৃতি নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করে আসা সবংয়ের চাঁদকুড়ি এলাকার বাসিন্দা, শিক্ষক ও চাঙ গবেষক শান্তনু অধিকারীর মতে, “লোধা সম্প্রদায়ের চাঙ সংস্কৃতি স্পষ্টতই বিলুপ্তির পথে। যাঁরা এখনও এই ধারাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, তাঁরা সবাই অশীতিপর। নতুন প্রজন্মের মধ্যে কোনও আগ্রহ নেই। এই শিল্পীরা যতদিন আছেন, ততদিনই চাঙ টিকে থাকবে। এরপর হয়তো তা শুধু ইতিহাসের পাতায় রয়ে যাবে।”

তিনি আরও জানান, এক সময় লোধা সম্প্রদায়ের পুজো-পার্বণে চাঙ গান ছাড়া দেবীর জাগরণই অসম্পূর্ণ থাকত। বর্তমানে সেখানে সাউন্ড বক্স জায়গা করে নিয়েছে। তাঁর মতে, সরকারি উদ্যোগে প্রশিক্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এখনও এই সংস্কৃতিকে বাঁচানো সম্ভব। শিল্পী ভাতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রকল্প থাকলেও শিল্পীরা ততটা শিক্ষিত না হওয়ার কারণে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগে সমস্যা হচ্ছে, পাশাপাশি স্থানীয় স্তরের উদাসীনতাও এর জন্য দায়ী।

চাঙ শিল্পী শম্ভু কোটালের কথায়, “চাঙ সংস্কৃতি প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ বছরের পুরনো। আমাদের বাপ-ঠাকুরদারাও এই গান গাইতেন। পুজো-পার্বণে ও গ্রামে গ্রামে ঘুরে গান গেয়ে ভিক্ষা করেই সংসার চলত। আমরাও তাই করি। সরকারের কাছে একটাই অনুরোধ—আমাদের শিল্পী ভাতার ব্যবস্থা করা হোক, যাতে কোনওভাবে সংসার চালানো যায়।” লোক সংস্কৃতির এই নীরব অবক্ষয়ের দিকে দ্রুত নজর না দিলে অচিরেই হারিয়ে যেতে পারে সবংয়ের চাঙ যা কার্যত একটা গোটা জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের সুর।