অ্যাঞ্জেলিকা ভট্টাচার্য: এমন একেকটা সময় আসে সব কিছু ওলট পালট হয়ে যায়। কিছু পরিস্থিতি আসে শুধুমাত্র মানুষ চেনাতে। যাদের আপন ভাবতাম তারা দূরে দাঁড়িয়ে মজা দেখে। আর পর বলে যাদের দূরে ঠেলে দিয়েছিলাম তারা ঝাঁপিয়ে পরে। নিজেদের সাধ্যের বাইরে গিয়েও আগলে রাখে। আমার বাবার মুখে ছোট থেকে একটা কথা শুনে আসছি – “অন্য কাউকে কখনও কথা দিয়ে বিঁধবি না। কথার জ্বালা তিরের জ্বালা থেকেও মারাত্মক।”

  

আমার সাতাত্তর বছরের বাবা কখনও কাউকে ঝাঁঝালো দু'টো কথা বলেছে বলে মনে পড়ে না। বাবা পাড়া প্রতিবেশি, অফিসের কলিগের কাছে যতটা প্রিয় ঠিক গাছেদের কাছেও মনে হয় ততটাই প্রিয়। রাস্তার কত অনাথ গাছ আমাদের হালিসহরের বাড়ির বাগানে আশ্রয় পেয়েছে। তার সঙ্গে কাঠবিড়ালি, আর নানা ধরনের পাখি। বুলবুলিগুলো তো মাঝে মাঝে বাবার মাথাতে এসে বসত। বাবা কপট রাগ দেখিয়ে বলতো – “পাকা পেঁপেগুলো তোদের জন্য গাছেই রেখে দিয়েছি। যা তাড়াতাড়ি খেয়ে নে। আমার টাকে কোনো স্বাদ নেই।”

 

বুলবুলি শিষ দিয়ে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে যেত। বাবা আবার তেড়ে গিয়ে বলত – “আমি কারও ধন্যবাদ নিই না।”

 

“অহনা চক্রবর্তী! ডাক্তার আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাইছেন।”

 

নার্সের ডাকে চমকে উঠলাম। আজকাল খুব বেশি ভয় পাচ্ছি। “হ্যাঁ আমি। আমার বাবা......।”

 

“হ্যাঁ জানি তো। ভিতরে আসুন।”

 

এই ডিপার্টমেন্টে তিনমাস ধরে আমার যাতায়ত বেড়ে গেছে। শেষ একমাস তো বাবাকে রাতদুপুরেও ভর্তি করতে হয়েছে। কখনও অস্বাভাবিক বমি, নয়তো লুসমোশন। হিমোগ্লোবিন কমে গেছে অনেক। এগুলো নাকি কেমো চলাকালীন হয়। কিন্তু তিনদিন ধরে খুব বাড়াবাড়ি। শরীরটা ভাল যাচ্ছে না। এবার কেমো নেওয়ার পর থেকে বেশি কষ্ট হচ্ছে। বাবা কথা বলতে পারছে না। চারিদিকে নল বাবাকে আবৃত করে রেখেছে। কিন্তু ডাক্তারবাবু কি বলবেন আমি জানি না।

 

-“মে আই কাম ইন ডক্টর?”

 

- “ওহ ইয়েস ইয়েস। প্লিজ সিট।”

 

- “আমার বাবা কেমন রেসপন্স করছে ডক্টর?”

 

-“দেখো অহনা আমি কিছু লুকোতে চাই না। বাস্তবটা তো আমদের মেনে নিতে হবে।”

 

আমার গলাটা শক্ত হয়ে আসছে।–“আর কি কোনও আশা নেই?”

 

ডাক্তার কিছুক্ষণ চুপ ।-“না আর আশা নেই। অরগ্যান ঠিক মতো কাজ করছে না।”

 

-“বাবা যে খুব কষ্ট পাচ্ছে।”

 

-“অহনা আমরা মৃত্যুর কষ্টটা কিছুটা কম করতে পারি। যাতে উনি ঘুমের মধ্যে চলে যান। তোমাকে তার জন্য অনুমতি দিতে হবে আমাদের। ইটস নন এস্ক্যালেসন। তুমি পারবে?”

 

-“আমি বাবার সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাতে চাই। বাবা আমায় শুনতে পাবে তো?”

 

-“হ্যাঁ পাবে।”

 

ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে কিছু ফর্মালিটিস ছিল। নন এস্ক্যালেসন-এর জন্য আমায় কিছু ফর্মে সাইন করতে হবে। তারপর ক্রমশ বাবার লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলা হবে। 

 

বাবাকে হসপিটালের বেডে শুয়ে একদম ভাল লাগছে না। আমি বাবার হাতটা ধরলাম – “বাবা আর ছ'মাস পরেই আমার ৫০ বছরের জন্মদিন। তুমি বলেছিলে বনগাঁতে যে জমিটা কিনেছ সেখানে ৫০টা গাছ লাগাবে। বাবা মনে আছে আমি বলেছিলাম আমার ১০০ বছর হলে ১০০টা গাছ লাগিও। তুমি হেসেছিলে বলেছিলে অতদিন কারও বাবা মা বাঁচে না। তুমি তো কথা দিয়ে কখনও খেলাপ করোনি। এবার আমার ৫০ বছরের জন্মদিন কী হবে?” 

 

বাবার হাতের আঙুল যেন একটা নড়ে উঠল। নাকি আমার মনের ভুল! আমার খুব ইচ্ছে করছিল বাবা আমায় একবার দেখুক। 

বাবা আমি তোমায় কোনওদিন মিথ্যে কথা বলিনি। ক্লাস সিক্সে যখন মা মারা গেল। তখন পাশের বাড়ির বীণা কাকিমা বলেছিল, তোর বাবা আবার বিয়ে করবে। তোকে দেখবে না। আমি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আমি কোনও দিন চাইনি তুমি বিয়ে কর আবার। কিন্তু অর্ধেক জীবন পেরিয়ে এসে মনে হয়, তোমার একজন সাথীর দরকার ছিল। তুমি তোমার অফিসের সায়নী রায়কে খুব পছন্দ করতে, তাই না বাবা? দেখতে কী মিষ্টি। কী সুন্দর গান করত। আবৃত্তি করত। কত রকমের খাবার করে নিয়ে আসত আমাদের বাড়ি। মনে আছে বাবা সেবার বাগানে বন্ধুদের নিয়ে রবীন্দ্র জয়ন্তী করলে। আমরা ছোটরা নাচ করলাম। আমায় সায়নী আন্টি সাজিয়ে দিয়েছিল। সেদিন দুপুরে তোমায় আর সায়নী আন্টিকে খুব কাছাকাছি দেখে ফেলেছিলাম। আমি তখন ক্লাস এইট। আমি জানতাম তোমার এত কাছে শুধু আমি যেতে পারি। আর কেউ না। সেদিন সায়নী আন্টিকে বাড়ি ফেরার আগে বলেছিলাম – “সায়নী আন্টি তুমি যদি আমার মা হতে চাও তাহলে আমি চিরকালের জন্য পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাব। আর তার জন্য তুমি দায়ী থাকবে।”

 

আমার কথাটা শুনে খুব ভয় পেয়েছিল মনে হয় আন্টি।ক'দিন পরে শুনেছিলাম বদলি হয়ে গিয়েছে। তুমি খুব কষ্ট পেয়েছিলে মনে হয়। কিন্তু তুমি আসল সত্যিটা জানতে পারনি। সায়নী আন্টিও তোমায় বলেনি বলেই মনে হয়। 

 

নার্স এসেছে। বাবাকে আর এন্টিবায়োটিক দেওয়া হবে না। বেশিরভাগ পাইপ খুলে দেওয়া হচ্ছে। কিছুক্ষণ পর অক্সিজেনের পাইপ খোলা হবে। ডাক্তার বলেছে হয়তো কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বাবা একটা পেনলেস মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাবে। সত্যি কি বাবার কোনও কষ্ট হবে না?

 

এখন ভিসিটিং আওয়ার শুরু হয়েছে। বাবার এক জ্যাঠতুতো ভাই আর তার বউ এসেছে। সম্পর্কে আমার কাকা হচ্ছে। তারা আমাদের খুব যে কাছের লোক তা নয়। এই তিনমাসে একবার এসেছিল শুধু। আজ ভেবেছে দাদা চলে যাওয়ার আগে একবার দেখে যাই। কাকি আমায় জড়িয়ে হাউহাউ করে কেঁদে উঠল – “অহনা তোর তো বিয়েও হল না। তুই একদম একা হয়ে যাবি।”

 

আমি প্রতিবারের মত বলতেই পারতাম – আমার বিয়ে হয়নি কথাটা ভুল। বিয়ে না করাটা আমার চয়েস। কিন্তু আজ কিছু বলতে ইচ্ছে করল না। খুব ছোটবেলায় বাড়ি ভর্তি আত্মীয়স্বজন আসত। মা মারা যাওয়ার পর সবাই ভাবল আমরা বুঝি ভেসে যাব। ছন্নছাড়া জীবন হবে। বাবা একা আমায় কীভাবে সামলাবে। সবাই কেটে পড়ল ক্রমশ। মা একমাত্র সন্তান ছিল। দাদু দিদা যতদিন বেঁচে ছিল খেয়াল রাখত। তারপর সেসব পাট চুকল। কিন্তু বাবা একদিনের জন্য আমায় একা করে দেয়নি কখনও।

 

কাকী চোখের জলে ভেসে যাচ্ছে – “মা কে তো আগেই হারিয়েছিস। এবার বাবাও। একটা মেয়ের পক্ষে একা চলা খুব কঠিন।”

 

এসব কথা শুনে আমার কান্না পাচ্ছে না। কিছু বলতেও ইচ্ছে করছে না। সারা কলকাতা শহর জুড়ে আমাদের অনেক আত্মীয়। কিন্তু বিপদের দিনে তাদের কারওর দেখা পাইনি। বাবার যখন ক্যানসার ধরা পড়ল, ফোন করে সবাইকে জানিয়েছি। কেউ আসেনি। ভেবেছে হয়ত টাকা চাইব। টাকার দরকার ছিল না। আমার অফিস থেকে মেডিক্লেম পেয়েছি। বাবার মেডিক্লেম ছিল। জলের মতো টাকা বেরিয়েছে। কিন্তু টাকার জন্য কারোর কাছে হাত পাততে হয়নি। আমরা দুজনেই জানতাম বাবার ক্যানসার লাস্ট স্টেজে ধরা পড়েছে। কিছুতেই ঠিক হবে না। তবু “সব ঠিক হয়ে যাবে” এই কথাগুলো বলার লোক খুঁজেছি দু'জনেই।

 

পাড়ায় পুরনো লোক কমে এসেছে। তবু যে দু'চার ঘর লোক আছে তারা বাবার রোগ শুনে মনে মনে ভয় পেয়েছে। সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা পায়নি। আমার বাবা কিন্তু সব জেনেও সামনের বছর দুর্গা পুজোর প্ল্যান বানিয়েছে। আমাদের কিন্নর ঘোরার ছক কষেছে। বাবা জানত এগুলো মিথ্যে পরিকল্পনা। আসলে আমরা দু'জন দু'জনের সামনে অভিনয় করে যাচ্ছিলাম। ভাল থাকার অভিনয়।

 

একটু দূরে চায়না দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের ঘরের যাবতীয় কাজ সে একা সামলায়। কচুর শাক থেকে লতি, বাজার থেকে সেরাটা বেছে নিয়ে আসে। বাবা যতবার হসপিটালে ভর্তি হয়েছে, সে ছুটে এসেছে। হাতে করে ফল নয়, মাঠ থেকে কুলেখাড়া শাক নিয়ে এসেছে। কানের কাছে ফিসফিস করে বলেছে –“চিন্তা করো না, দু'বেলা কুলেখাড়া শাকের জল সেদ্ধ করে খাওয়ালেই কাকু ঠিক হয়ে যাবে।” 

   

বাবার অক্সিজেনের পাইপ খুলে দিচ্ছে। এবার কিছুক্ষণের মধ্যে গ্যাস্পিং শুরু হবে। তারপর হয়তো কয়েক ঘণ্টা। বাবার কাছে আমি যে চিরকাল আমার মনের কথা গোপন করে এসেছি। এই শেষ সময়ে আমাকে বলতেই হবে। বাবা তুমি কতবার আমায় জিজ্ঞেস করেছ আমার কাউকে পছন্দ কিনা। আমায় বিয়ে করার কথা বলেছ। আমি বলেছি না আমি এমন কাউকে পাইনি যার সঙ্গে আমার পুরো জীবন কাটিয়ে দিতে ইচ্ছে করেছে কখনও। আমি মিথ্যে বলেছি যেন বাবা!

 

সোহম আমার অফিসেই কাজ করত। খুব ভাল বন্ধু ছিল। কখন তাকে ভালবেসে ফেলেছিলাম বুঝিনি। আমরা দু'জনে ঠিক করেছিলাম আমরা দুই পরিবার মিলে একসঙ্গে থাকব। ওর পরিবার বলতে শুধু ওর মা। সোহম অফিস ট্যুর থেকে ফিরলেই তোমার সঙ্গে দেখা করাতে নিয়ে আসতাম। কিন্তু সোহমের ফেরা হয়নি। প্লেন ক্র্যাশ। আমি তখন যেন দিশেহারা হয়ে গিয়েছিলাম। ওই কোম্পানি ছাড়লাম। নতুন অফিসে জয়েন করলাম। আমার মনে হয়েছিল এটা সায়নী আন্টির অভিশাপ। নয়তো ভগবানের শাস্তি। আমি তারপর অনেক খুঁজেছি সায়নী আন্টিকে। তোমার পুরনো অফিস কলিগদের জিজ্ঞেস করেছি। কেউ বলতে পারেনি। অফিস মিটিংয়ের জন্য দিল্লি গিয়েছিলাম সেবার। ওখানকার একজন স্টাফের কাছে শুনলাম ওদের ফ্ল্যাটে একজন বাঙালি ভদ্রমহিলা একাই থাকতেন। অবিবাহিত। বাথরুমে পড়ে গিয়ে মারা যান। চারদিন পর তার পচাগলা দেহ বার করা হয়। আমি নাম জানতে চাইলে উনি ছবি দেখান। বাবা আমি ভাবিনি সায়নী আন্টির এমন বীভৎস মৃত্যু হতে পারে। আমি তোমায় জানাতে পারিনি।

 

বাবা আমি সোহমকে কোনওদিন ভুলতে পারব না যেন! আমার একা থাকতে ভয় করে। তুমি প্লিজ যেও না বাবা। তোমার অনা এখনও অন্ধকারকে খুব ভয় পায়। বাবা এখন মৃত্যুর শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে আছে। আমি কেবিনের বাইরে আমার ল্যাপটপ অন করে বসে আছি। কোথায় কী ফর্মালিটি, কাগজ জমা দিতে হবে তার খোঁজ নিচ্ছি। ‘হি ইস এক্সপায়ারড’ এই কথাটা শোনার অপেক্ষায় বসে আছি।