সায়ন দত্ত 

 

আকাশ আজ কোনও মেঘমল্লার গায়নি। 

বৃষ্টি মানেই রোমান্টিসিজম… এই নিখুঁত কর্পোরেট বিভ্রমটাকে আজ সজোরে এক চপেটাঘাত করেছে প্রকৃতি। আষাঢ়ের এই জল কোনও প্রেমিকার চোখের জল নয়... এ যেন এক তীক্ষ্ণ, ধারালো ব্লেড। যা সরাসরি ভেঙে পড়েছে। যেন বহুদিনের জমানো অভিমান একসঙ্গে নেমে আসছে টালির চাল, ভাঙা রাস্তা আর নির্বাচনী পোস্টারের গায়ে। দেওয়ালে সাঁটা মুখগুলো… প্রতিশ্রুতির রঙে আঁকা। বৃষ্টিতে ধুয়ে ধীরে ধীরে একে অন্যের মধ্যে মিশে যাচ্ছে। কারও মুখ আর আলাদা করে চেনা যায় না। হয়তো এটাই সবচেয়ে সৎ ছবি।

 

এই ভূমিকাহীন বৃষ্টি খুব নিঃশব্দে, সন্তর্পণে শহরের আকাশচুম্বী অহংকারের ওপর থেকে ‘উন্নয়ন’-এর মেকি প্রলেপটা চেঁছে ফেলছে। আর ঠিক তখনই ওই চকচকে প্রসাধনের আড়াল থেকে বেরিয়ে পড়ছে শহরটার আসল কঙ্কাল… ড্যাম্প ধরা দেওয়াল, উপচে পড়া নর্দমা আর কিছু মরচে-ধরা মানুষের ভিজে যাওয়া বেঁচে থাকা।

 

জলিল কাকার চায়ের দোকানের টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ যেন কোনও অদৃশ্য টাইপরাইটারে অবিরাম লেখা হয়ে চলা বিচারের রায়। কে সেই বিচারক, কেউ জানে না। শুধু জানা যায়, রায় ঘোষিত হচ্ছে প্রতিদিন, প্রতি রাতে আর আসামির কাঠগড়ায় বদলাতে থাকে মুখ… কখনও বেকার ছেলেটা, কখনও উচ্ছেদ হওয়া সংসার, কখনও অন্য কোনও প্রান্তিক মানুষ।

দোকানের বেঞ্চে বসে নীরা। খাতার পাতায় আধখানা লেখা কবিতা, বাকিটা বৃষ্টির জলে ভিজে অক্ষরগুলো একে অপরের গায়ে গড়িয়ে পড়েছে, ঠিক যেভাবে দুটো মানুষের মধ্যে না-বলা কথা গড়িয়ে পড়ে নীরবতায়। তার উল্টো দিকে বসে ধ্রুব, ভেজা ছাতাটা মেলে রেখেছে শুকোতে দেওয়ার ভান করে, আসলে চোখ সরিয়ে রাখার একটা অজুহাত খুঁজছে মাত্র।

নীরা খাতার পাতায় গড়িয়ে পড়া জলের দাগগুলোর দিকে তাকিয়ে খুব নীচু গলায় বলল, “চিঠিটা আজকেও আসেনি, তাই না?”

ধ্রুবর হাসিতে কোনও উত্তাপ ছিল না। সে ভিজে ছাতাটার দিকে তাকিয়েই বলল, “চিঠি আসার তো কথা ছিল। কিন্তু ওরা তা না পাঠিয়ে বোধ হয় বুঝিয়ে দিল... যোগ্যতা থাকলেও, দাঁড়ানোর জমিটাই নিলাম হয়ে গেছে।” 

“জমি তো আর আকাশ থেকে পড়ে না, বানাতে হয়।” 

“কে বানাবে? যাদের বানানোর কথা, তারা তো… বাদ দে।”

কথাটা বলেই ধ্রুব জানলার বাইরে তাকায়। ভিজে পোস্টারের মুখগুলো তখনও নিয়ম মেনে আকার হারাচ্ছে, একটার সঙ্গে আরেকটা মিশে গিয়ে তৈরি করছে এক অচেনা মুখ বা হয়তো সব মুখ এক রকম। আর তার পাশেই বাস স্টপের ভাঙা শেডটার নীচে এখন এক জমাট বাঁধা নৈঃশব্দ্য। রাস্তার উল্টোদিকে একটা বিশাল বিলবোর্ডের হাসিমুখের রং গলে গলে পড়ছে পিচের রাস্তায়। ঠিক যেন ক্ষমতার অলিন্দ থেকে চুঁইয়ে পড়া অদৃশ্য রক্ত। আর ওই শেডের নীচে, সেই মুছে যাওয়া রঙের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে তিনটে মানুষ। যাদের জুতোর তলায় ক্ষয়ে যাওয়া সময়, কাঁধের কাছে ভিজে লেপ্টে থাকা শার্ট আর হাতে জ্বলন্ত স্ক্রিন... ওরাই তো তারা। ওদের শারীরিক দূরত্ব হয়তো কয়েক ফুটের, কিন্তু মাঝখানের অদৃশ্য পরিখাটায় বয়ে যাচ্ছে যোজন যোজন বৈষম্য।

দূরে রেললাইনের ধারে একটা প্লাস্টিকের ছাউনির নিচে জড়োসড়ো বসে আছে একটা পরিবার। বাসা ভেঙে যাওয়ার পর তিনদিন হল। তবুও তাদের ঠিকানা এখন অনিশ্চিত। আর ছাদ বলতে আকাশ। বৃষ্টি তাদের গায়ে পড়ছে, আর শহরের কোনও জানলার কাঁচেই সেই দৃশ্য প্রতিফলিত হচ্ছে না। শুধু কাঁচের গায়ে গড়িয়ে পড়ছে বিজ্ঞাপনের আলো, ঝকঝকে, নিস্পৃহ।

নীরার হাতের পাতায় জমে থাকা চায়ের ভাপ যেন কোনও অতীতের নিঃশ্বাস। সে ধ্রুব-র হাতের দিকে তাকায়, তারপর নিজের হাতের দিকে। দুটোর মাঝখানে টেবিলের কাঠ, আর কাঠের চেয়েও শক্ত এক না-বলা দূরত্ব অথচ খানিক আগেও হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যেত। প্রতিবার বৃষ্টির শব্দটাই যেন সেই সাহসটুকু শুষে নিচ্ছে।

“যদি কাল সকালটাও এরকমই অন্ধকার থাকে? যদি...” নীরা থেমে যায়। বাক্যটা শেষ করার সাহস তারও নেই। 

ধ্রুব তখনও পোস্টারের দিকে তাকিয়ে।

“তাহলে এই বৃষ্টিটাই আমাদের শেষ ইশতেহার হয়ে থেকে যাবে নীরা। বাইরে তাকিয়ে দ্যাখ... যাদের মুখ ছিল, তারা সবাই কেমন মিশে গিয়ে একটাই ঝাপসা অবয়ব হয়ে যাচ্ছে। এই বৃষ্টিটা না থামলেই ভাল... জল সরে গেলে তো আবার আমাদের ওই হারিয়ে যাওয়া কঙ্কালগুলোর দলেই ভিড়তে হবে। বাকি সব তো মুছে যাচ্ছে… দেখছিস না!”

জলিল কাকা চায়ের গ্লাস ধুতে ধুতে গুনগুন করে ওঠে কোনও পুরনো দিনের গান, যার কথা এখন আর মনে নেই, শুধু সুরটুকু আটকে আছে জিভের ডগায়… ঠিক যেমন এই শহরে অনেক কিছুরই কথা হারিয়ে গেছে, শুধু সুরটুকু ঘুরপাক খাচ্ছে অলিগলিতে।

 

রাত বাড়ে। বৃষ্টি একটুও কমে না। নীরা আর ধ্রুব বসে থাকে, দু'জনেই জানে বাড়ি ফেরার সময় হয়েছে অনেকক্ষণ, তবু কেউ ওঠে না। যেন এই সাময়িক আশ্রয়টুকুর মধ্যেই লুকিয়ে আছে এমন কিছু, যা বাড়ি ফিরলেই হারিয়ে যাবে।

রাস্তার উল্টোদিকের ল্যাম্পপোস্টের রুগ্ন হলুদ আলোটা আজ বড্ড বেশি নিস্পৃহ। পিচগলা রাস্তায় জমে থাকা জলে সেই আলো যখন ঠিকরে পড়ে, মনে হয় যেন কয়েক হাজার ভাঙা কাচের টুকরো ছড়িয়ে আছে। একটা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মসৃণ গাড়ি তীব্র বেগে ছুটে যায়, চাকার নীচ থেকে ছিটকে আসা কাদাজল অবলীলায় ধুয়ে দেয় ফুটপাথের শেষ দাবিটুকুও। শেডের নীচে গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকা কুকুরটার চোখে কোনও আক্রোশ নেই, শুধু আছে এক আদিম অস্তিত্বের সংকট। ও জানে, এই শহরে ওর আর শেডের নীচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর অবস্থা আজ আসলে একই বিন্দুতে এসে মিশেছে। প্রান্তিকের কোনও আলাদা জাত হয় না।

শেষ পর্যন্ত ধ্রুব উঠে দাঁড়ায়, ছাতাটা মেলে ধরে।

 “চল, এগিয়ে দিই।”

নীরা তার দিকে তাকায়। কিছু বলে না। শুধু উঠে দাঁড়ায়, আর দুজনে হেঁটে যায় একই ছাতার নীচে, একে অপরের কাঁধ প্রায় ছুঁয়ে, অথচ দূরত্বটা তখনও অটুট।

পেছনে পড়ে থাকে জলিল কাকার দোকান, ভিজে পোস্টারের ক্ষয়ে যাওয়া মুখগুলো আর রেললাইনের ধারে প্লাস্টিকের ছাউনির নীচে জেগে থাকা এক রাত।

বৃষ্টি তখনও পড়ছে। কারও জন্য থামছে না।

শুধু একটা ছাতার নীচে, দুটো মানুষ, আর তাদের মাঝে না-বলা কত কথা হেঁটে চলেছে অনন্ত পথ। এ যাওয়া গন্তব্যের দিকে, নাকি আরও এক না-জানা রাতের দিকে… কে বলতে পারে!