অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়: এই রাস্তাটা রঞ্জু কি দেখছে প্রায় ত্রিশ বছর? এই পাড়াতেই ওর জন্ম, পড়াশোনা। নেতাজী নগর ডে কলেজ। তার দু’বছরের মাথায় অনার্স কেটে যাওয়া। খাতা লেখার চাকরি। ভ্যাপসা গরমের সন্ধেয় রঞ্জু কেপিসি হাসপাতালের উল্টোদিকে এসে দাঁড়ায়। এই ফুটপাথ ধরে আজ প্রায় ত্রিশ বছর ধরে সে হেঁটে আসছে। সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে চারপাশ পালটে যায়। সস্তার হাতঘড়িতে প্রায় সাড়ে আটটা বাজতে যায় এখন।
নটায় আবারও দোকানে ফিরবে রঞ্জু। সাড়ে নটায় দোকান বন্ধ। হিসেব মিলিয়ে সবকিছু গুছিয়ে তুলতে সাড়ে দশটা প্রায়। তারপর ঘরে ফিরে রুটি-তড়কা, ঘুম। মা’র কথা শুনে মাঝে মাঝে বিরক্ত হওয়া। এ্যাসবেস্টসের ছাউনি থেকে ঝুলতে থাকা পাখার বিকট, ঘুটঘুটে শব্দ। ঘামে ভেজা পিঠ, কপাল, বুক। তবুও রঞ্জু এই সময়টায়, ঠিক এই ফুটপাথের এই জায়গাটায় এসে দাঁড়ায়। যদিও এ অভ্যাস ওর বেশিদিনের নয়। হয়তো দিন সাতেক, বড়জোর দশ। ওই কোণটায়, ওই যে চায়ের দোকান, নড়বড়ে কাঠের কাঠামোর উপর, সাতটাকা করে নেয় একেক কাপ। বড় কাগজের কাপ দেয়। মোবাইলে পেমেন্ট হয়। সেই ভাল। খুচরোর বাজার খুব খারাপ চলছে। রঞ্জু সামনের দিকে তাকায়।
সুকান্ত সেতু থেকে যাদবপুর এইট বি বাসস্ট্যাণ্ড। গত দশ-পনেরো বছরেই পালটেছে কেমন। ঝাঁ চকচকে গয়নার শোরুম বসেছে। মল্লিকদের বিরাট মিষ্টির দোকান। টিভি, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিনের শোরুম। পুরনো দোকানগুলো যদিও আগের মতোই আছে অনেকটাই। তবে এরই মধ্যে বেশ কয়েকটা ক্যাফে তৈরি হয়েছে। ফুটপাথে বেড়েছে ভিখিরির সংখ্যা। এমনকি তাদের ভিক্ষা চাওয়ার কৌশলেও পরিবর্তন এসেছে। বৈষম্য প্রকট, অথচ যেন সেলেবেল। বিক্রি হয়েই যায়।
মেয়েটা আসছে। রঞ্জুর চোখ মেয়েটাকে অনুসরণ করে। ছিপছিপে চেহারা। পরনে বাহারি কসমেটিক্সের দোকানে বসা মেয়েদের মতো ফর্ম্যাল শার্ট আর প্যান্ট। মুখের মেকআপ আবছা হয়ে এসেছে। চোখের পাতায় ক্লান্তির ছাপ। রঞ্জুর মেয়েটাকে ভাল লাগে। ওর জীবনে গত দশদিনের অক্সিজেন।
মেয়েটাকে রঞ্জু প্রথম দেখেছিল যেদিন, দূরে দাঁড়িয়ে টিভি, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিনের ঝাঁ চকচকে শোরুমের ঠিক পাশটাতেই যে বাহারি খেলনা আর শয্যাসামগ্রীর দোকান, তারই সামনে দাঁড়িয়ে সে তার বান্ধবীকে ইশারায় কিছু দেখাচ্ছিল। তারপর ওরা দুজন, পরস্পরের দিকে চেয়ে নিঃশব্দে মিটিমিটি হেসেছিল খানিক। তারপর একসাথে ঘাড় ঘুরিয়ে গটগট করে রঞ্জুর পাশ দিয়ে হেঁটে গিয়েছিল। প্রায় সমস্ত সময়েই সেই মেয়েটার মুখ রঞ্জুর দিকেই টানা ফেরানো ছিল। যদিও একবারও কারোর চোখে চোখ পড়েনি। রঞ্জুর সেই নিয়ে কোনো হতাশা নেই।
দোকানের সামনে আজকাল এই বাহারি কাচের জানালাগুলো হয়েছে বেশ। বাইরে থেকে দাঁড়িয়েই ভিতরের পুরো দোকানটা দেখে নেওয়া যায়। আগে কেবল টিভির দোকানে এইরকম বড় বড় কাচের জানালা দেখা যেত। এখন সবকিছুই আধুনিক, ব্যঞ্জনাধর্মী। রঞ্জু সেই খেলনা আর শয্যাসামগ্রীর দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।
নরম তুলতুলে গদিমোড়া খাট। মেয়েটা, তার প্রায়-লোলুপ দৃষ্টিতে, কি সেইদিকেই ইঙ্গিত করছিল? রঞ্জু মনে মনে মাথা নাড়ে। রোজ রাতে শোয়া কাঠের তক্তপোশটা যেন ওর পিঠে, শিরদাঁড়ায় অকারণে খোঁচা মারতে চায়। এমন খাটের স্বপ্ন রঞ্জু দেখে না। ওর সোজা-পিঠ কাঠের তক্তপোশেই সুখ। তাই, ওই মেয়েটাও নিশ্চয়ই আদেখলে-অভাবীর মতো, এমন তুলতুলে আরাম পছন্দ করবে না। রঞ্জু আশটা-পাশটা ভাবতে থাকে কেবল। মেয়েটার নাম বোধহয় মালিনী, অথবা তিতলি। নীহারিকাও তো হতে পারে বোধহয়। ইংরেজি নিয়ে অনার্স পড়তে যাওয়াই রঞ্জুর কাল হয়েছিল। ডিকেন্স, জয়েস, উলফ – রোম্যান্টিকতা ভুলে নোটস মুখস্থ করতে গিয়ে রঞ্জু ক্রমশ বুঝেছিল, স্রোত ভুলে বিপ্লবের পথ সকলের জন্য নয়। অনার্সের মায়া কাটিয়ে রঞ্জু শেষমেশ কোনওমতে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে … তুলোর খেলনা খরগোশগুলোর দিকেই এবারে চোখ পড়ল তার।
মেয়েটা নির্ঘাৎ এগুলোই দেখছিল। রঞ্জু মনে মনে নিজের পিঠ চাপড়ে দেয়। তুলতুলে নরম চেহারা, জুলজুলে চোখ। মনে হয় যেন জ্যান্ত। মেয়েটাও নিশ্চয়ই এই কথাই ভেবেছিল তখন। রঞ্জুরা কি অনেক বেশি কিছু দাবি করে ফেলছে? দু’কামরার ছোট্ট ঘর। একটু হাওয়া-বাতাস চলবে। লাইনের জল। বিদ্যুৎ। ঘরের মেঝেতে একজোড়া খরগোশ। নাহয় তুলোরই হোক। একপাশের দেওয়ালে, কাচ লাগানো কাঠের ছোট্ট শোকেসে, কিছু বই আর ঘর সাজানোর সামগ্রী। মাথার উপর বনবন করে পাখা ঘুরবে। কাজ থেকে ফিরে কোনোদিন রঞ্জু চা করবে, কোনোদিন নীহারিকা। এমন সাদামাঠা চোখেও রঞ্জুরা একেকদিন, সেই বিশেষ একদিনেরই স্বপ্ন দেখতে চায়।
রঞ্জুর চোখ চকচক করছে। মেয়েটা মাঝেসাঝেই একই দোকান থেকে চা খায়। বেশিরভাগ দিনেই সে একলাটি থাকে। সঙ্গে বান্ধবী থাকে না। রঞ্জু লক্ষ করেছে সব। একদিন গিয়ে কথা বলবে? রঞ্জুর কথা বলতে ইচ্ছে হয়। সে মেয়েটার গলা শোনেনি কোনওদিন। মনে মনে কেবল কল্পনা করেছে। বাইরে থেকে দেখলে সে যে ঠিক কোনধরণের পেশায় রয়েছে, তা আন্দাজ করতে বিশেষ বেগ পেতে হয় না। তবু রঞ্জু মনে মনে আরও বড় করে কল্পনা করে। এ মেয়েটা নিশ্চয়ই অনার্স গ্র্যাজুয়েট। হয়তো দূরশিক্ষায় এখনও পড়াশোনা করছে। রঞ্জুর হাতের চা ক্রমশ ঠাণ্ডা হয়।
সামনের ফুটপাথে নাতনিকে কোলে নিয়ে হাত বাড়িয়ে বসে থাকা বৃদ্ধা, হঠাৎই যেন বিরক্ত হয়ে গজগজ করে ওঠে। হাত পা নেড়ে কাংস্য-কণ্ঠে সামনের কুলওয়ালার সঙ্গে কী নিয়ে যেন বকুনি জুড়ে দেয়। মেয়েটা চলে গেছে। রঞ্জু আজও ঘড়ি ধরে নির্দিষ্ট চায়ের দোকানের সামনেটায় এসে দাঁড়ায়। মেয়েটা এসেছে।
হাত বাড়িয়ে সে চা নিল। রঞ্জু দেখছে। মেয়েটা ওর দিকে তাকায়। এই প্রথম, রঞ্জু ঘাবড়ে গিয়ে গপ করে এক ঢোক গরম চা গিলে ফেলে একপাশে সরে গিয়ে দাঁড়ায়। মেয়েটা পাত্তা দেয় না। সে আবারও ঘাড় নীচু করে নিজের চায়ে চুমুক দেয়। রঞ্জুর বাবাকে মনে পড়ছিল। অনার্সটা থাকলে সে কি আজ এই মেয়েটাকে মন খুলে মনের কথা সবটুকু বলে ফেলতে পারত? নাকি কেবল সিনেমাতেই দেখা যায় ওসব? মেয়েটার সঙ্গে রঞ্জুর কথা বলতে ইচ্ছে করছে। মনে মনে ও কল্পনা করেছে কতবার। মেয়েটার গলা কেমন হবে? অতিরিক্ত সূক্ষ নয়, আবার যেন মেদবহুলও নয়। ওর ছিপছিপে চেহারার মতোই, ছিপছিপে কণ্ঠস্বর, স্পষ্ট উচ্চারণ আর মেজাজি আওয়াজ। রঞ্জু আপনমনেই যেন হেসে ফেলতে চায়। আজ মেয়েটার পরনে আকাশি শার্ট। মুখের মেকআপ প্রতিরাতের মতোই হালকা, আবছা হয়ে এসেছে। মেয়েটার ফোন আসছে। হাত নামিয়ে চায়ের ভাঁড়টা ঝুড়িতে ফেলে দিয়ে মেয়েটা ফোনে কথা বলে। রঞ্জু হাত নেড়ে ইঙ্গিত করে। চমকে উঠে মেয়েটা কান থেকে ফোনটা নামিয়ে আনে এবার।
-“মানে, আমার পয়সা আপনি দেবেন কেন? আমি চেয়েছি আপনার কাছে? অদ্ভুৎ!”
মাথা নীচু করে রঞ্জু সরে এসেছিল। তড়িঘড়ি করতে গিয়ে জিনিসপত্র গোলমাল করে ফেলায় ওর জুড়ি মেলা ভার। যদিও ঘটনাটা বেশিদূর বাড়েনি। মেয়েটাও পয়সা মিটিয়ে, ঘাড় ঘুরিয়ে উলটো ফুটপাথ বেয়ে চলে গিয়েছিল। রঞ্জুকেও চেনা দোকানদার ও অন্যান্য মানুষেরা, “ধুর! কী যে করিস,” বলে কাটিয়ে দিয়েছিল। মোটকথা কাল থেকে রঞ্জুকে আর সাড়ে আটটার সময় কেপিসি হাসপাতালের উলটোদিকের ফুটপাথে এসে কারোর জন্য অপেক্ষায় সময় কাটাতে হবে না। রঞ্জু পিঠ সোজা করে কাঠের তক্তপোশটার উপর গা এলিয়ে দেয়।
বড্ড গরম আজ। রঞ্জু শুয়ে আছে। ঘামের চোটে তার ঘুম আসছে না। মেয়েটার গলায় সুর নেই। তাই এহেন মোহভঙ্গেও রঞ্জুর ততখানি অস্বস্তিবোধ জাগে না। আদতে ভাবনার আদান-প্রদান বড় ভঙ্গুর তো বটেই, দৃষ্টিভঙ্গির প্রেক্ষিতেও তার অর্থ আমূল বদলে যায়। রঞ্জু জানে মেয়েটা আবারও সেই চায়ের দোকানে আসবে। কেবল রঞ্জু নিজেই কোনওদিন আর, তার চোখের দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারবে না। একেকজন মানুষ সামান্য কিছুতেই বড় দমে যায় বোধহয়। জোরপূর্বক একলা হয়ে তারা একলা থাকতে চায়।
পিঠের তক্তপোশটা আজও, অন্যান্যদিনের মতোই যেন আরামের মনে হচ্ছে। রঞ্জুর মা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। রঞ্জু গুনগুন করে। ওর মা জিজ্ঞেস করেন, “তাহলে এ’মাসের ওষুধ?”
-“আনব মা,” রঞ্জু জবাব দেয়। রঞ্জু গুনগুন করে। এখন সে আর খরগোশের স্বপ্ন দেখে না। ঘরের ভ্যাপসা গরমে রঞ্জুর গুনগুনানি সুর ক্রমশ তরল অন্ধকারের মতো ছড়িয়ে পড়তে থাকে।















