সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়: কেয়াতলা পাড়ার তো বটেই... আমাদের একেবারে নিকটতম প্রতিবেশী ছিলেন উৎপলা সেন... সতীনাথ মুখোপাধ্যায়। সঙ্গীতের এমন যোগ্য সমাহার খুব কমই দেখা গেছে বোধহয়।
উৎপলা সেন.... যাঁকে আমরা বেলু পিসিমা বলতাম... ছিলেন দারুন হাসিখুশি প্রাণবন্ত এক মহিলা। তুলনায় সতীনাথ বাবু ( না ওনাকে পিসেমশাই বলে ডাকার সাহস আমি অন্তত করিনি ) ছিলেন বেশ রাশভারী, গানমগ্ন প্রকৃতির... অবশ্যই ভীষণ ভদ্র। মনে পরে খুব ঘটা করে সরস্বতীপূজো হত। বেলু পিসিমা কিন্তু দারুন রান্নাও করতেন!
আমাদের পাড়ার-- কেয়াতলার -- দুর্গাপুজোর খুব একটা নাম ডাক ছিলনা... কিন্তু বিজয়া সম্মিলনী বা জলসা বললে লোকে এক ডাকে চিনত। ঢাকুরিয়া, যাদবপুর তো বটেই.....ভবানীপুর, চেতলা থেকে মানুষজন দুপুর দুপুর এসে পড়তেন। পাড়া না বেপাড়া এই বেয়ারা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার মানসিকতা তখন কারোর ছিল না।
সতীনাথ- উৎপলা ছিলেন আমাদের জলসার শিল্পী সংগ্রাহক। ওঁনাদের জন্য পুজোর চাঁদা ধার্য্য করা থাকত সেটাই।
কে না এসেছেন.. লতা-আশা-মুকেশ-রফি ছাড়া..... যত দূর মনে পরে সব্বাই প্রায় কোনও না কোনও বছর গেয়ে গেছেন সেই জলসায়। কোন কোন শিল্পী আসবেন... সেটা ছিল সেই বছরের সবচেয়ে বড়ো সিক্রেট। বেলুপিসিমার এক্কেবারে পার্সোনাল রিকুয়েস্ট যেত। শিল্পীরাও যথাসাধ্য চেষ্টা করতেন একটু সময় হলেও আসবার.... দুটো গান হলেও গাইবার।
ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় বহুবার অ্যাঙ্কর হয়েছিলেন।
ওনার সেই অসাধারন Ready Wit... আহা!
ওনার কথা রয়েছে আমার হিনচে পালং পুঁই বইতে। আরেকদিন বলবো তাঁর কথা। উনি আবার আসতেন সস্ত্রীক (শ্রীমতী নীলিমা বন্দ্যোপাধ্যায় দারুণ রাগপ্রধান ও নজরুল-গান গাইতেন)। সেইরকম যুগলবন্দী কিন্তু আরও কিছু ছিল.... হেমন্ত- বেলা মুখোপাধ্যায় ( সেই শুক -সারির গান)। সলিল- সবিতা চৌধুরী ( আহা! সলিল দার Orchestration-এ সবিতা দির গাওয়া.... ঝিলমিল ঝিলের জলে ঝিকিমিকি....সেই "আহা রে" যেন চোখ বুজলেই শুনতে পাই আজও!)। গোবিন্দগোপাল আর মাধুরী মুখোপাধ্যায় --সেই সুরেলা স্ত্রোত্রপাঠ দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করতেন ।
অপরেশ- বাঁশরী লাহিড়ী (সঙ্গে ফেউ ছোট্ট বাপির তবলা -লহরা)। বেশ মনে পরে অপরেশবাবু তখন মারকাটারি হিট গান গাইছেন.....লাইন লাগাও / টক্কা টরে...
টেলিগ্রাফের ভাষা নিয়ে বাংলা তো বটেই অন্য কোনও ভাষায় কেউ গান গেয়েছেন কি না এই বাঙালের তো জানা নেই.....বাপি যেমন বড়ো হয়ে ভাপ্পি হয়ে....গান বেঁধেছে কউয়া...টাউয়া নিয়ে -- তাও ইউনিক।
বাঁশরী দেবী গাইতেন সেই বিখ্যাত...." হাজার টাকার বাগান খাইল আট আনার ছাগলে.. মরি হায় "!
প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় --নির্মলা মিশ্র-- আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায় --- কড়ার ছিল হয় তিন সখীই আসবেন নাহলে কেউ নয় !
আলপনা দিদি হারমোমিয়াম বাজিয়ে দিচ্ছেন, আর প্রতিমাদি -- নির্মলাদি "কম্বাইন" মেজাজে গাইছেন: "আবীরে রাঙালো কে আমায়.."।
জানেন, লিখতে গিয়ে... এতদিন বাদেও... গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। জানি, বলবেন, আবেগসর্বস্ব বাঙালি। বলুন না, আমার ভারী বয়েই গেল!
শিল্পীদের গ্রিনরুম হতো সতীনাথ-উৎপলার বাড়ি। আর বেলুদির বৈঠকখানার সবচেয়ে সুন্দর গদিমোড়া আরামকেদারাখানি রাখা থাকত মধ্যমণি হেমন্তদার জন্য।
তিনি তখন সুরধারার মধ্যগগনে। অবশ্য তাঁর সেই আসন স্থায়ী হত না। হঠাৎই সিঁড়ির মুখে শোনা যেত, "কই রে, বেলু কই! সতীনাথ! চুপচাপ ক্যান?" গৃহকর্তা-কর্ত্রী সচকিত হয়ে ওঠার আগেই বুঝি পড়িমরি ক'রে চেয়ার ছেড়ে নিচে দৌড়েছেন অন্য দুজন।
"কর্তা এসে গেছেন - শচীন কর্তা"! ঘরে এসে, রোগা-দীর্ঘকায় মানুষটি জমিয়ে বসলেন সেই কেদারায়। হেমন্তের প্রণামোদ্যত হাত দুটি ধরলেন। পাশের নবীন গায়কের মাথায় হাত রাখলেন।
স্মরণের বালুকাবেলায়.....
শচীন দেববর্মন তো পড়শি পাড়ার প্রতিবেশী..ওনার সাউদার্ন পার্কের সেই বাড়ি এখন অবহেলায় পড়ে আছে....পুজোর সময় শহরে থাকলে এসেছেন কত্তোবার।
একবার এসেছিলেন গীতা দত্তকে নিয়ে।
মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়..তখন তরুণ... জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছিলেন সেই ভীষণ সুন্দরী.... ভীষণ স্মার্ট গীতাজির সাথে। এদিকে শচীন কর্তা তাঁর সেই "ব্যাচেলার'স সং" ধরেছেন... :'হায় কি করি যে এ মন নিয়া'!
গান শেষ করে এস.ডি নেমেছেন কি নামেন নি....আমাগো ভানু স্টেজে উঠে হট্টগোল জুড়লেন.....: "দেখসেন কান্ডখান! শচীন কত্তাও আর পারলেন না... আমাদের মনা... মানবেন্দ্র যা শুরু করছস তুই...গাইয়া দিলেন... হায় কি যে করি এই মনা নিয়া..!" গীতা দত্ত ততক্ষণে লজ্জারুণা।
শ্যামল মিত্র তখন সদ্য দারুণ নাম করেছেন.... ছিপখান তিনদাঁড়, হংসপাখা দিয়ে, যাক...যা গেছে তা যাক... রেকর্ড বাজারে পড়তে পারে না, মশাই!
সে হেন শ্যামল মঞ্চে উঠছেন -- মাইক নিয়ে নিলেন নির্মলেন্দু চৌধুরী -- উৎপলা সেনকে উদ্দেশ্য করে বললেন: "অ বেলু, শ্যামল ছ্যামড়ারে আজ আর রসগোল্লা দিবা না... গলা আরও মিঠা হইলে, আমাগো ব্যাবাক অন্ন মারা যাইব কিন্তু!"
হেমন্তবাবুর সেই গান... "নিলামওয়ালা ছ' আনা" তখন ভীষণ জনপ্রিয়। সেবার সবাই আশা করেছিল উনি আসবেন তো বটেই...গাইবেনও সেই গান। জলসা অনেক দূর এগিয়ে গেছে উনি আর আসেন না...আসলে সেদিন ওনার আরও দুটি অনুষ্ঠান ছিল....একটি তো আবার তাঁর আদিপাড়া ভবানীপুরে।
বেনুপিসিমার অনুরোধে ভবানীপুর যাওয়ার রাস্তায় উনি বিখ্যাত সাদা এম্বাসাডার থেকে নেমে স্টেজে উঠে....একবার সেই মধুঢালা কন্ঠে সুর তুললেন... নিলাম ওয়ালা! তারপর মৃদু হেসে বললেন: আসবে আসবে...একটু অপেক্ষা করুন। বলেই আবার উধাও।
আমরা কিছু বোঝার আগেই লর্ড ভানুর উদয়..: নিলাম ওয়ালার ভেপু আজ বাজারে জব্বর কাটতাসে। ঠেলাগাড়ি নিয়া অন্য পাড়ায় গেসে... আইল বইলা... ততক্ষণে আমার বিটার- হাফের (শ্রীমতী নিলীমা বন্দ্যোপাধ্যায়) গান শোনেন!
সেই জলসা আজ অনেকদিন হল শেষ হয়ে গেছে। জলসা-ঘরের জমিতে গড়ে উঠেছে ললিতকলা একাডেমি।পাশের অনেকটা জমি হয়ে গেছে জবর দখল।
বেনুপিসিমাদের সেই প্রাসাদোপম বাড়ি... সতীনাথবাবু নাম রেখেছিলেন, 'ঋষভ', আজ মাল্টিস্টোরেড বিল্ডিংয়ে পরিণত। বর্তমান প্রোমোটার কত আদরে তার নাম দিয়েছেন, 'শুভ লাভ'!
একটা নিয়ম রক্ষার পুজো এবারও হবে পাড়ায়। অনাগ্রহের মন্ডপের পাশ দিয়ে আসতে গিয়ে শ্রীমতী ইলা বসুর গান টা মনে পরে গেল। হ্যাঁ উনি এই গানটাও যে গেয়েছিলেন সেই স্মৃতির জলসাঘরে।















