শমিত ঘোষ: গরমকাল এমনিতেই বিচ্ছিরি। প্যাচপেচে গরম আর তীব্র আপেক্ষিক আর্দ্রতার জেরে বড্ড নাজেহাল হতে হয়। ডিসেম্বর আর জানুয়ারিতে কলকাতায় পারদ ওই ১০-১২ ডিগ্রিতে নামলেই, যারা আহা-উঁহু করে ন্যাকাকান্না শুরু করে দেয়, সেই সব 'সামার লাভার'-দের এই গরমে বড্ড দেখতে ইচ্ছে করে। মনে হয়, এই ভয়ঙ্কর গরমে তাদের ছায়াহীন ময়দানে দাঁড় করিয়ে প্যাটিস খাওয়াই। সঙ্গে আলুকাবলি!

 

তীব্র গরমের মধ্যেও একজন-দু'জন প্রেমিক প্রেমিকা নিশ্চয়ই ময়দানে প্রেম করে। মহীনের ঘোড়াগুলিকে সাক্ষী রেখে তারা শহরের উষ্ণতম দিনে, পিচ গলা রোদ্দুরে, বৃষ্টির নিশ্বাস খোঁজে। আমি যদিও খুঁজতাম আইসক্রিম। এই গরমের সব কিছু খারাপের মধ্যেও দু'টো ব্যাপারের জন্য গরমটাকে মানিয়ে নিতে হয়। এক হল, আম। আর দ্বিতীয়টি হল আইসক্রিম! 

 

রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনের জন্য পঁচিশে বৈশাখ আলাদা করে ক্যালেন্ডারে মার্ক করা থাকে যদিও। তবে, রবীন্দ্রসঙ্গীত-নৃত্য, নাটক, অমল ও দইওয়ালা ইত্যাদিকে যদি সরিয়ে রেখে ভাবি, তবে পড়ে থাকে, ওই মহার্ঘ্য দু'টো জিনিস। আম এবং আইসক্রিম। মাঝে মাঝে মনে হয়, রবি ঠাকুর যদি কলকাতার এই তপ্ত গরমে বসে 'ডাকঘর' লিখতেন; তবে কি অমলের সঙ্গে আদৌ দইওয়ালার দেখা হত? নাকি, দইওয়ালার জায়গায় এসে হাজির হত কোনও এক আইসক্রিমওয়ালা?

 

ঠিক যেমন, আমাদের ছোটবেলায় লাল রঙের প্যান্ডোরার বাক্স নিয়ে হাজির হতো এক আইসক্রিমওয়ালা কাকু। তপ্ত দুপুরে আইসক্রিমের গাড়ির ঘন্টার আওয়াজ আর সেই আইসক্রিমওয়ালা কাকুর একটানা ডাক, 'আ...ই....স...কি...রি...ম'! শুনলেই একছুটে বাড়ির বাইরে। কখনও মায়ের থেকে চেয়ে নেওয়া খুচরো। কখনও দিদুন-বাড়ি থেকে ফেরার সময়, দিদুন যে পঞ্চাশ টাকার নোটটা হাতে গুঁজে দিয়েছিল; সেই নোটের জোরেই নিজেকে বড়লোক ভাবা এক বালক, সোজা আইসক্রিমওয়ালার গাড়ির সামনে। ধীরে ধীরে প্যান্ডোরার বাক্সের মুখটা খোলে। ভিতর থেকে কিরকম একটা ঠান্ডা বরফের হাওয়া বার হয়ে আসে। সেই ভিতরের বাক্স থেকেই এসে হাজির হয় কাঠি আইসক্রিম। দাম ওই ২-৫ টাকার মধ্যেই।

 

এক্ষেত্রে বলে রাখা ভাল, আমরা যারা নয়ের দশকে জন্মেছি। বড় হয়েছি। আমাদের ছোটবেলায় কিন্তু তখনও এই সব ব্র্যান্ডেড আইসক্রিমের চল তেমনটা আসেনি শহরতলিতে। তখন মফস্বল, শহরের মধ্যেই আইসক্রিম কারখানা থাকত। সেখানেই বরফের সঙ্গে ফুড কালার আর ফ্লেভার মিশিয়ে তৈরি হত এই সব আইসক্রিম। তারপর কাঠের ঠেলা গাড়ি নিয়ে আইসক্রিমওয়ালারা বার হয়ে পড়তেন শহরের অলিগলিতে। নয়ের দশকের দুপুরগুলোয়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং সঙ্গী ছিল বাঙালির জীবনের। এসি তখনও আজকের মতো আসেনি মধ্যবিত্ত জীবনে। রোদে পুড়ে যাওয়া দুপুরে, একরাশ মন ভাল করার ওষুধ নিয়ে আসতো সেইসব নাম না জানা কোম্পানির আইসক্রিমওয়ালারা।

 

আর আসত কুলফি! সেটা আসত মাটির হাঁড়িতে করে। হাঁড়িটা লাল শালু কাপড়ে মোড়া। আজকাল আবার বিয়েবাড়িতে বা নামীদামি আইসক্রিম ব্র্যান্ডের কুলফি পাওয়া যায় ঠিকই। কিন্তু, সেই বয়ষ্ক কুলফিওয়ালার কুলফি মালাইয়ের অকৃত্রিম স্বাদ আজও জিভে লেগে আছে। মাটির হাঁড়ির ভিতরে বরফের মধ্যে ছোট ছোট কুলফি। আমাদের মফস্বলের মানুষ তখনও জানেনা 'বাস্কিন রবিনস' কী! 

 

আইসক্রিমেরও যে পার্লার হয়, তাও জানতে তখনও ঢের দেরি আমাদের। পার্লার তখন মফস্বলে এসেছে বটে। যার বাইরে মাধুরী দীক্ষিত আর শ্রীদেবীর ছবি সাঁটানো। আর যেখানে পুরুষদের প্রবেশ নিষিদ্ধ! কারণ, লেডিস বিউটি পার্লার থেকে ইউনিসেক্স পার্লারে উন্নীত হতে মফস্বলের তখনও এক দেড় দশক বাকি। বিশ্বায়ন তখন সবে ছুঁয়ে যাচ্ছে আমাদের। কেন জানি না মনে হয়, তখন গরমটাও বোধহয় এতটা তীব্র ছিল না। দিব্বি তো ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের সময় পড়াশোনা শিকেয় তুলে পাড়ার রাস্তায় ব্যাট-বল নিয়ে শচিন, আজহার হওয়ার প্রস্তুতি চলত! 

 

এখন আর চাইলেও সেইসব দিনে ফেরা যাবে না। এখন গরমটাও কি সেজন্যই এত তীব্র? গরম এখন সব কিছুতেই। কথায় গরম। রাজনীতিতে গরম। মাথা গরম। তেলেভাজা থেকে প্রেমিকা-সবই আজকাল 'হট' চায়। মানে ওই যাকে বলে গরম! বিশ্বায়ন কি এভাবেই বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য দায়ী? জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে গুরুগম্ভীর আলোচনা হবে রাষ্ট্রসঙ্ঘে। কিন্তু, যেটা নিয়ে কেউ কথা বলবে না, তা হল; এই বিশ্বায়নের হাত ধরেই আমাদের মফস্বলের আইসক্রিমওয়ালারা হারিয়ে গেল! 

তাদের জায়গায় এল একদম রঙচঙে পোশাক পরা, লাল-নীল গাড়ি চালিয়ে আসা একদল মানুষ। এঁরাও আইসক্রিমওয়ালা। তবে এঁরা আরেকটু স্মার্ট। এঁরা কোম্পানির। তবে সে কোম্পানী ব্র্যান্ডেড নয়। যতদূর মনে পড়ছে; এঁরা প্রায় সব আইসক্রিমকেই বলত; 'কোয়ালিটি আইসক্রিম'! অপভ্রংশে যা শুনতে লাগতো 'কোয়ালটি আসকিরম'! অর্থাৎ; আইসক্রিম। সে যে কোম্পানিরই হোক। এঁদের সেই চেনা ডাকটা 'কমন' থাকত। 

আর পাওয়া যেত 'পেপসি'! হ্যাঁ এই গরমেই সেই অদ্ভুত বস্তুটি আমরা প্রচুর খেতাম। আসলে 'পেপসি' বলে ডাকলেও ওই বস্তুটির সঙ্গে পেপসি নামের নরম পানীয়টির বিন্দুমাত্র কোনও যোগ ছিল না। না স্বাদের দিক থেকে। না গুনমানে। না আকৃতিতে।    

দক্ষিণ ২৪ পরগনার দিকের লোকাল ট্রেনে যেমন ফটাস জল খুব জনপ্রিয়। আমাদের এদিকে তেমনই জনপ্রিয় ছিল, পেপসি। পলিথিনের মোড়কে ফুড কালার মেশানো মিষ্টি পানীয়। সেই পানীয়ের ফ্লেভাররা রঙের সঙ্গে সঙ্গে বদলাত। বাইরের মোড়কটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বচ্ছ। ফলে, ভিতরে সবুজ-কালো-লাল- কমলা রঙের ওই পানীয়র প্রতি একটা অদ্ভুত টান অনুভব করে বালক বালিকার দল।

বাড়ির লোক যদিও আগেই বলে দিয়েছে ভুলেও এসব খাওয়া যাবে না। কারণ, এসব নাকি ড্রেনের জল দিয়ে তৈরি হয়! এই, 'ড্রেনের জল ' বস্তুটি সময় বিশেষে বাড়ির অভিভাবকদের ভাষ্যে ভিন্ন-ভিন্ন ক্ষেত্রে যদিও বদলে বদলে যেত! কখনও এই, 'ড্রেনের জল' দিয়ে তৈরি হয় এই 'পেপসি' বা লোকাল আইসক্রিম! কখনও ফুচকার টক জল! মোট কথা, এই সব ড্রেনের জলের ভয়টয় কোনও কিছুকেই খুব বেশি পাত্তা না দিয়ে, দেদার এই দু'টাকার পেপসি নিয়ে হ্যাংলামো চলেছে আমাদের!

হাইস্কুলে বন্ধুদের নিয়ে মজার ছড়ায় তৈরি হয়েছে, 'দু'টাকার পেপসি..ভাই আমার সেক্সি...’! তখন এই 'সেক্সি' শব্দটার সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটছে আমাদের! কিন্তু শব্দটার প্রকৃত মানে তেমন জানি না!

 

চূড়ান্ত স্বাস্থ্যসচেতন বন্ধু বারবার বলেছে, গোলা টোলা না খেতে! কারণ, গোলায় নাকি মাছের আড়তের নোংরা বরফ ব্যবহার করা হয়! সেসব কথাকে জাস্ট অগ্রাহ্য করে, আমরা 'গোলা' খেয়েছি। বরফের ওপরে নানারকম ফ্লেভার মিশিয়ে তৈরি হয় 'গোলা'। দুপুর দুটোর সময়ে প্রায় চল্লিশ ডিগ্রি তাপমাত্রার মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে যদি আপনি গোলা'-র স্বাদ পান, ঠিক ওই মুহুর্তে আপনার মনে হবে; মানব সভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ আবিস্কার এই 'গোলা'! যদিও বাড়ি ফিরতে ফিরতেই, আপনার গলার খুশখুশানি আপনাকে বুঝিয়ে দেবে, কত গোলায় কত প্যারাসিটামল ৬৫০! 

কিন্তু, সেসব ভেবে কি আর গরমে চলা যায়? ঠিক যেমন চূড়ান্ত ডায়েট মেনে খাওয়া দাওয়া করতে করতেও আমরা 'ডায়েট কোক' ছেড়ে, হঠাৎই একদিন ম্যাঙ্গো ফ্রুটি খেয়ে নিই। কিংবা চিনি একেবারে ছেড়ে দিয়েও ধর্মতলায় কেসি দাশের পাশের গলির লস্যি। অথবা প্যারামাউন্টের সরবত-আমরা ঠিকই খেয়ে ফেলি! সেরকমই গরমের দুপুরে একদিন হঠাৎ 'কুলফি মালাই....' ডাক শুনে ছুটে গিয়ে খেতে ইচ্ছা করে। তখনই স্মৃতিতে জড়িয়ে আসে কত পুরোনো কথা। পা থমকে যায়। মিষ্টি খেলে ট্রাইগ্লিসারাইড বেড়ে যাবে ভেবে মনকে স্বান্তনা দিয়ে পিছিয়ে আসতে হয়! 

 

গরমের প্রায় সবই খারাপ। কেবল আম আর আইসক্রিম ছাড়া। ও হো, আরেকটা ভাল কথা লিখতেই ভুলে গেছি। তা হল কালবৈশাখী। একটা ভয়ঙ্কর তাপপ্রবাহের দিনের পরে, বিকেলের দিকে যখন অন্ধকার করে আসে পুবের আকাশ। মেঘ জমে গোটা আকাশে। মনের মধ্যে কেমন একটা আলাদা আনন্দ হয়। তারপর গুড়ুম-গুড়ুম বেশ খানিকক্ষণ ডাকাডাকির পরে যখন শান্তির বারি ভিজিয়ে দেয়, শুকিয়ে যাওয়া ধরিত্রীকে। তখন যে অদ্ভুত ভাললাগার মুহূর্ত তৈরি হয়--তা ভাষায় লেখা যায় না। ভিজে যায় শহর। ভিজে কাক হয় গোটা পাড়া। মাটি থেকে একটা গন্ধ বার হয়। সেই গন্ধ, কংক্রিটের জঙ্গলের মধ্যে হয়তো পৌঁছায় না। কিন্তু এই বসুন্ধরার আরও একটু কাছাকাছি এসে ঘন হয়ে বসলে, সেই ঘ্রাণ পাওয়া যায়। ফিরে যাওয়া যায় অনেকগুলো বছর আগের এক বিকেলবেলায়।

 

যখন গরমের এক বিকেলে সদ্য দেখা টিভি কমার্শিয়ালের অনুকরনে 'কর্নেটো' আইসক্রিমে একসঙ্গে কামড় দেয় মফস্বলের আনাড়ি প্রেমিক-প্রেমিকা, তারপর সেই আইসক্রিম গালে ঠোঁটে মাখামাখি হয়ে এক বিদঘুটে কান্ড ঘটায়! কিন্তু, স্মৃতিতে থেকে যায় সেই গরমের বিকেলগুলো। আর তারপরের কালবৈশাখীটা। সেবার রবীন্দ্রজয়ন্তীতে পাড়ার অনুষ্ঠানে 'বরিষ ধরা মাঝে শান্তির বারি' গানটা গেয়েছিল মেয়েটা। আর তার কয়েকদিন বাদেই বার হয়েছিলো উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্ট! গ্রীষ্মের দাবদাহকে তুচ্ছ করে পড়াশোনার জন্য ছেড়ে যেতে হয় শহর। দূরত্ব বাড়ে। চেনাপাড়া চেনা গলিপথ হারিয়ে যায়।

আবার প্রায় দেড় দশক বাদে একটা ক্লান্ত গ্রীষ্মের দুপুর এলে সেই আইসক্রিমওয়ালার একটা ডাক মনে করিয়ে দেয় অনেক কিছু! গরমকালটা বড্ড বিচ্ছিরি। ঘাম, প্যাচপ্যাচে গরম, হিট স্ট্রোক, গলায় ঘামাচি ইত্যাদি-ইত্যাদি। সবই খারাপ। শুধুই দু'টো জিনিস ছাড়া। আম আর আইসক্রিম। ও হ্যাঁ, আর একটা দু'টো কালবৈশাখীও বড্ড ভাল।