গৌতম রায়: ভারতীয় লঘু সঙ্গীতের এক স্বর্ণালী অধ্যায় শেষ হয়ে গেল সুমন কল্যাণপুরের প্রয়াণে। সাম্প্রতিক অতীতে লতা মঙ্গেশকর, গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় এবং অতি সম্প্রতি আশা ভোঁসলে চলে গিয়েছেন। চলে গেলেন সুমন কল্যাণপুর। ভারতীয় লঘু সংগীতের বিভিন্ন পর্যায়ে এইসব শিল্পীরা যে অনবদ্য সৃষ্টি করে গিয়েছেন তা সঙ্গীত দুনিয়ায় এক চিরকালীন অবদান হয়ে থাকবে।

 

বম্বে তথা মুম্বাইয়ের গানের জগতে সদ্যপ্রয়াত সুমন কল্যাণপুর যেমন নিজেকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ঠিক তেমনিই বাংলা গানের জগতেও তাঁর প্রতিষ্ঠা, গ্রহণযোগ্যতা এবং খ্যাতি ছিল প্রশ্নাতীত। একটা সময়, যখন সন্ধ্যা- লতা- প্রতিমা- উৎপলাদের বিজয় বৈজয়ন্তী উড়ছে জোরদারভাবে। সেইসব খ্যাতিমান কিংবদন্তিদের সঙ্গেই সুমন নিজেকে প্রতিষ্ঠা নিয়েছিলেন স্বমহিমায়। বাংলার বহু নামীদামি গীতিকার-সুরকারের সঙ্গে তিনি কাজ করেছিলেন। তাঁর কণ্ঠ মাধুর্যের উপস্থাপনা আজও বাঙালিকে নস্টালজিক করে তোলে। সুমনের বেশ কিছু গান একটা সময় লোকের মুখে মুখে ফিরত। বিশেষ করে উল্লেখ করতে হয়, তাঁর গাওয়া; "মনে করো আমি নেই, বসন্ত এসে গেছে। কৃষ্ণচূড়ার বন্যায়, চৈতালী ভেসে গেছে"। এই গানটি আজও বাঙালির স্মৃতিতে অম্লান হয়ে রয়েছে। আজও বহু রিয়েলিটি শোয়ে নতুন প্রজন্মের প্রতিশ্রুতিবান শিল্পীদের কন্ঠে শুনতে পাওয়া যায় সুমনের গাওয়া ওই বিখ্যাত গানটি।

হিন্দি গানেও স্বমহিমায় তিনি প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। সেই প্রতিষ্ঠা তাঁকে রাষ্ট্রীয় সম্মান এনে দিয়েছিল। তাঁর কণ্ঠ মাধুর্য গোটা ভারতবাসীকে আজও মোহিত করে রাখে। ফিল্মি গান এবং বেসিক রেকর্ডে তাঁর সৃষ্টি মানুষের মনোরঞ্জনের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় অধ্যায়। মার্গ সঙ্গীতে তাঁর অসাধারণ দক্ষতা ছিল। আর সেই দক্ষতার বহিঃপ্রকাশ আমরা তাঁর প্রায় প্রতিটি গানের মধ্যেই পাই। বহু হিন্দি ছবি তিনি প্লেব্যাক করেছিলেন। বাংলা ছবিতেও করেছিলেন।

 

আটের দশকের সূচনা পর্বে একটি জনপ্রিয় বাংলা ছবি ছিল, ‘কৃষ্ণ সুদামা’। ‘ওই ফিল্মে তাঁর কন্ঠে; তোরা হাত ধর, প্রতিজ্ঞা কর। চিরদিন তোরা বন্ধু হয়ে থাকবি। বন্ধু কথার মর্যাদাটা রাখবি’ - এই গানটি বিশেষ রকমের জনপ্রিয় হয়েছিল। আজও বহু ক্ষেত্রে একেবারে সাধারণ মানুষ, এঁরা হয়তো গানের ব্যাকরণ ঘিরে বিশেষ কিছু জানেন না। তাঁরাও এক কথায় বন্ধুত্বের সংজ্ঞা নির্ধারণের প্রশ্নে, সুমনের গাওয়া এই জনপ্রিয় ফিল্মি গানটি গেয়ে ওঠেন।

 

হিন্দির পাশাপাশি জনপ্রিয় বাংলা গানের নিবেদক হিসেবে বাংলা তথা বাঙালির মনোজগতে সুমন একটা বিশেষ জায়গা করে নিয়েছিলেন। আজও বহু প্রবীণ মানুষ ছয়- সাতের দশকে সুমন কল্যাণপুরের কন্ঠের বিভিন্ন গান বাংলা গান ঘিরে আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠেন। বাংলা গান গাইবার দরুনই বাংলার সাংস্কৃতিক জগতের সঙ্গেও একটা নিবিড় সংযোগ সুমন কল্যাণপুরের গড়ে উঠেছিল। সেই সূত্রেই গীতশ্রী সন্ধ্যা, প্রতিমা, নির্মলা, আরতি প্রমুখদের সঙ্গে একটা অত্যন্ত প্রীতিপূর্ণ সম্পর্কে তৈরি হয়েছিল এবং সেই সম্পর্কে ধারাবাহিকতা সুমন কিন্তু সযত্নে রক্ষা করে চলেছিলেন। বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি সুমন কল্যাণপুর অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং আবেগপূর্ণ ছিলেন। তাই বাংলা গানের জন্য সুরকারেরা যখন তাঁর কাছে অনুরোধ জানাতেন, খাতির মধ্য গগনে থেকে কোনও অবস্থাতেই সেই অনুরোধ সুমন ফিরিয়ে দিতেন না। 

 

আর বাংলার শ্রোতারা, গান পাগল মানুষেরা, সুমনের বাংলা সংস্কৃতির প্রতি, বাংলা গানের প্রতি এই শ্রদ্ধাবোধ ভালবাসা ঘিরে একটা অন্তরের আবেগ অনুভব করতেন। পরিণত বয়সে সুমন চলে গেলেন। কিন্তু সঙ্গীতের জগতে যা তিনি রেখে গেলেন, তা চিরদিন সংগীতপ্রেমী মানুষ, সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষদের কাছে একটা বিশেষ রকমের বার্তা দেবে। বসন্তের বিহ্বল বিচ্ছেদে, মানুষের মনে পড়বেই তাঁর কণ্ঠের সেই আর্তি। যে নিবেদনের মধ্যে একেবারে হৃদয় মোচড়ানো একটা আবেগ ছিল যে আবেগ মানুষকে তার নিজের অজান্তেই হয়তো সশ্রুনেত্র করে দিত। এই আবেগ নিয়েই বাঙালি সদ্যপ্রয়াত সুমন কল্যাণপুরের প্রতি তার অন্তরের ভালবাসা চিরদিন জানিয়ে যাবে।