প্রিয়াঙ্কা চৌধুরী: কথ্য গালি হিসেবে মিষ্টি একটি শুকর ছানা কিংবা কুকুরের ছানাকে অবলীলাক্রমে ব্যবহার করা হয়। বোধ হওয়া ইস্তক এই-ই শুনে শুনে অভ্যস্ত আমরা। যে সেসব পশু, যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে কোনও দিন কারওর ক্ষতি করতে পারে না, অকারণ অত্যাচার করতে পারে না,অথচ তাদের গালি হিসেবে ব্যবহার করছে মানুষ, একমাত্র সেই জীব, যে হিংসা, লোভ, প্রতিহিংসা, নিষ্ঠুরতার বশবর্তী হয়ে তুলনায় কম ক্ষমতা সম্পন্নদের অহরহ ক্ষতি করার ক্ষমতা পোষণ করে। আয়রনি!
কাকে কার মিষ্টি মনে হল, কাকে মনে হল না, সে না হয় আপেক্ষিক বিষয়। কিন্তু নিজেকে সর্বশ্রেষ্ঠ এবং উন্নততম জীব হিসেবে দাবি করা মানুষ এবং না-মানুষ কিংবা অন্যান্য জীব জন্তুও যে প্রকৃতির নিয়মে একই পৃথিবীতেই জন্ম নিয়েছে, সেখান থেকেই তো প্রমাণিত যে; এ পৃথিবীতে শুধুমাত্র ‘সর্ব শ্রেষ্ঠ জীব’ মানুষেরই বেঁচে থাকার অধিকার নেই, রয়েছে পশু, পাখি, জীবজন্তু সকলেরই সমান অধিকার।
হ্যাঁ, অধিকারের কথা বলে অধিকার কেড়ে নেওয়া কিংবা অধিকার সাব্যস্ত করার ক্ষমতা একমাত্র মানুষেরই আছে, বাকিদের নেই। সেজন্যে প্রয়োজন ছিল তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠা। নিজেদের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি ওদের অধিকাররক্ষার ক্ষেত্রে সাধ্য অনুযায়ী উঠে দাঁড়ানোর।
কিন্তু হায়! ক্ষমতার অপব্যবহার মানুষের থেকে বেশি ভাল কেউ করতে পারে না বলেই শোষক ও শোষিতের সম্পর্কের ভিত্তিতে অধিকাংশ জীবজন্তু হয় বেঘোরে মরে যাচ্ছে। নয় আশ্রয়হীন। খাবারের অভাবে, মানুষের অত্যাচারে প্রায় মরে যাওয়ার মতোই বেঁচে রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বলে রাখি, পোষ্যদের নিয়ে এ লেখা নয়। কারণ পোষ্যরা এ ক্ষেত্রে সংখ্যালঘু এবং তুলনায় ভাগ্যবান।
এ প্রসঙ্গে কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বহুপঠিত কবিতা “রাস্তা কারও একার নয়’ মনে পড়ে যায়। “রাস্তা কারও একার নয় বরং তাকেই একদিন রাস্তা ছাড়তে হয়, যার স্পর্ধা আকাশ ছুঁয়ে যায়’’। মানুষের স্পর্ধা আকাশ ছুঁয়ে, ধ্বংসাত্মক প্রাকৃতিক বিপর্যয়, অতিমারীর মতো সঙ্কটের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পরেও মানুষ এখনও যদি নত না হয়, প্রকৃতি এবং প্রকৃতির সন্তানের সঙ্গে সহাবস্থান না শেখে তাহলে বোবার মতো দেখে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকে না আর কিছু। তবু, যতদিন আশা থাকবে, সংখ্যালঘুরা গলা ফাটিয়ে যাবে।
জর্জ অরওয়েলের ব্যঙ্গাত্মক রূপকধর্মী উপন্যাস ‘অ্যানিম্যাল ফার্ম’-এর অবতারণা করতে হয় এ প্রসঙ্গে। এই উপন্যাসটি ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব এবং পরবর্তী কালে স্তালিনের বিতর্কিত শাসনের এক রূপক, এর মূল বার্তাটি হল; যদি বিপ্লবের নেতৃত্ব ক্ষমতালোভী হয়, তাহলে বিপ্লব বা পরিবর্তনের নামে সাধারণ মানুষের মুক্তি মেলে না।
বরং নতুন এক শোষণ শুরু হয়। যে সব অবহেলিত পশুরা খামারের অত্যাচারী মালিকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তাড়িয়ে দেয় এবং সকল পশু সমান এই মূলমন্ত্রে একটি স্বাধীন সমাজ গড়ে তোলার শপথ নেয়-পরবর্তী কালে দেখা যায়, যারা এই বিপ্লব শুরু করেছিল, তারাই মানুষের মতো দু’পায়ে হাঁটছে, মদ্যপান করছে এবং স্বৈরাচার শুরু করেছে। যার ফলে সাধারণ পশুদের জীবন আবারও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
নতুন শোষণ শুরু হয়। তার মানে দাঁড়ায় এই, ক্ষমতার কখনও ব্যবহার হয় না, চিরকাল অপব্যবহারই হয়। এবং এ ক্ষেত্রে মানুষের ক্ষমতা পশুর চেয়ে বেশি বলেই পশুরা চিরকাল অবহেলিত, শোষিত। কিন্তু মানুষেরই মধ্যে যদি কিছু সংবেদনশীল মানুষ এই শোষনের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তাহলেই পরিস্থিতিতে খানিক হলেও সাম্যাবস্থা আসে।
আগেও যেমন বলেছি, এ মুহূর্তে খুব সীমিত সংখ্যক মানুষ চেষ্টা করছেন না, তা নয়। কিন্তু সংখ্যালঘুকে চিরকালই পদপিষ্ট হতে হয়, এক্ষেত্রেও তার অন্যথা নয়। তাই রাষ্ট্রের কাছে, সংখ্যাগরিষ্ঠের কাছে আবেদন।
রাষ্ট্র যদি কোনও ভাবে আরেকটু সংবেদনশীল হতো, কোনও উপায়ে পথপশুদের হিতের উদ্দেশ্যে কিছু সাংগঠনিক প্রকল্প বাস্তবায়িত করত, তাহলে যে গুটিকয় মানুষ, এই অসহনশীল সমাজের বিরুদ্ধে গিয়ে শুধুমাত্র কিছু পথের জীবজন্তুকে খাওয়ানোর বা সামান্য দেখা শোনা করার অপরাধে অপরাধী হয়ে প্রতিনিয়ত হেনস্থার মুখে দিন গুজরান করছেন, তাঁদের অন্তহীন সমস্যার কিছু সুরাহা হত।
আচ্ছা, আমরা তো ইউরোপীয় সভ্যতা দ্বারা সগর্ব প্রভাবিত। আমাদের ছেলে মেয়েরা পড়তে যায় ভিন দেশে। কর্মসংস্থান এবং ঘর বাড়ি করে বিদেশেই স্থিত হয় ওরা। ওদেরই সভ্যতার কাছে আমরা কেন সহানুভূতির পাঠ নিই না? এর বিনিময়ে আর্থিক মুনাফা নেই বলে?
বাইরের দেশে রাস্তার পশুকে দত্তক নেওয়া রোজের বিষয়। রাস্তায় যারা পড়ে থাকে ওদের খাওয়ার ব্যবস্থা পথ চলতি মানুষ করে দেয়, তীব্র শীতে ঘন বর্ষায় বাড়ির গ্যারেজ কিংবা নীচতলয়ায় একটু আশ্রয়, গরমে পথের মোড়ে মোড়ে জলের ব্যবস্থা এ সমস্ত ওদের দেশে মৌলিক কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে। এতে করে শ্রেষ্ঠ জীবের খুব কিছু ক্ষতি তো হয়ে যাচ্ছে না বরং পারস্পরিক সহাবস্থানে অনেকটা সাহায্য হচ্ছে। আর ব্যক্তিগত লাভের কথা যদি বলি, তাহলে হ্যাঁ, মানবিকবোধের দিকটা কিছুটা উন্নত হচ্ছে। এক্ষুণি মোড়লেরা তেড়ে আসবেন এই বলে, ওদের জনসংখ্যা এবং আমাদের জনসংখ্যার আকাশ পাতাল তফাৎ।
হ্যাঁ, তফাৎ। সেজন্যে আরও সুবিধে হওয়ার কথা। দশজন মানুষ যদি ১০ টাকা করে দান করেন এবং একশ’ জন যদি পাঁচ টাকা করেও করেন, তাহলে একশো জনের দানের পরিমাণ বেশি। সেভাবেই এত কোটি মানুষ যদি সামান্য করেও ভাবেন, তাহলেও অনেকটা এগিয়ে যাওয়া যায়।
আমরা যদি নিজেদের ভেতরে থাকা সহানুভূতি নামের মানবিক উপাদানটিকে সামান্য ধাক্কা দিই, দায়িত্ব ভেবে পথের পশুদের জন্য সামান্য কিছু করি। একটু খাবার দেওয়া, জল দেওয়া, গরমে নিজেদের বারান্দায়, বাড়ির সামনে জল, খাবার রেখে দেওয়া, সেটা ওরা নোংরা করবেই জেনে নিজেরাই উচ্ছিষ্টটুকু পরিষ্কার করে নেওয়া, বর্ষায় আমাদের গ্যারাজ কিংবা এক তলার বাড়ির, দোকানের দরজা খুলে ছাতের নিচে একটু আশ্রয় দেওয়া, কয়েকজন মিলে ওদের বন্ধ্যাত্বকরণ করানো, যাতে ওদের সংখ্যা সীমিত হয় এবং জীবনের গুণমান বৃদ্ধি পায়, অসুস্থ কাউকে দেখলে কাছাকাছি যে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আছে, তাঁদের খবর দেওয়া এই কাজগুলো করি, তাহলেই পরিবর্তন নিশ্চিত। এই দায়িত্ব আসলে মৌলিক। কিন্তু আমাদের নৈতিক শিক্ষার মধ্যে এগুলো পড়ে না বলেই আমরা অনায়াসে এই দায়িত্ব এড়িয়ে তো চলিই উপরন্তু আমরা ওই অসহায় জীবগুলোকে অত্যাচারও করি।
আমরা বাড়ির শিশুদের শিশুপাঠে কুকুর কেমন ডাকে, হাতি কেমন ডাকে, বেড়ালকে ইংরিজিতে কী বলা হয় এ সমস্ত শেখাই। এমনকী শিশুর মনোরঞ্জনের জন্য যত খেলনা, তার অধিকাংশই কোনও না কোনও পশু পাখির আদলে তৈরি, অথচ ‘এ পৃথিবী যতটা আমাদের, ততটাই পথে পড়ে থাকা জীব জন্তুদের’ এই মৌলিক শিক্ষাটুকু কি দিতে পারি না পরবর্তী প্রজন্মকে, যাতে ওরা সহানুভূতিশীল হয়, সর্বাঙ্গসুন্দর হয়ে ওঠে?
শেষে, কার্টুনিস্ট উদয় দেবের লেখা ‘মানুষ’ নামের বই এর উল্লেখ করি। এই বইটির বিষয়বস্তু হল, পশুর চোখ দিয়ে দেখা মানুষের অপকীর্তি। যেখানে পশু মানুষেরই প্রতিস্পর্ধী। যেখানে দেখা যাচ্ছে রাস্তায় আচমকা মানুষ এসে পড়লে গাড়ির চালকের আসনে বসা শুকর বিরক্ত হয়ে বলে উঠছে ‘মানুষের বাচ্চা’। বেড়াল রাস্তা পার করতে গিয়ে কালো মানুষকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়ছে, কিংবা মানুষের কোমরে কুকুর কালীপটকা বেঁধে দিয়ে তার অসহায় অবস্থা দেখে আমোদিত হচ্ছে।
যেখানে বলা হয়েছে, মানুষেরই গড়ে তোলা কুসংস্কারের ব্যাধি থেকে কীভাবে পশু পাখিরাও ছাড় পায়নি, যেমন, বেড়াল নিজের প্রয়োজনে রাস্তা পার করলে, কিংবা জেনেটিক কারণে বেড়ালের গায়ের রঙ কালো হলে তাকে অশুভ মানা হয়। শালিকের বিপদ তো সবচেয়ে বেশি, তাকে সব সময় জোড়ায় ঘুরে বেড়াতে হবে! বেচারা একটু স্পেস নেওয়ার কোনও উপায় নেই। নইলেই মানুষের চোখ খুঁজে বেড়াবে আরেকটি কোথায়? মনুষ্য সমাজে যেমন সমাজের নির্ধারণ করে দেওয়া বয়সের ব্র্যাকেট পার হয়ে গেলে যে কোনও সামাজিক অনুষ্ঠানে মোড়লেরা প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে দেয়, জোড়া কবে আসবে, ঠিক তেমন!
মানুষ সব নির্ধারণ করবে। এমনকী জন্তু জানোয়ারদের চারিত্রিক বৈশষ্ট্যও। শেয়াল ধূর্ত। নেকড়ে হিংস্র। গাধা বোকা। বেড়াল চোর। কুকুর প্রভূভক্ত। অথচ দীর্ঘদিন বেড়াল, কুকুরের সঙ্গ করার পর আমার এবং আমার মতো গুটিকয়েক সংখ্যালঘুর মনে হয় না বেড়াল চোর। যে কোনও অভুক্ত নিজের বেঁচে থাকার তাগিদে ডাস্টবিন থেকে খাবার তুলে খাবে কিংবা মাছের দোকান থেকে ফাঁক পেলে মাছ। আমাদের যদি অভুক্ত থাকতে হত দিনের পর দিন, আমরা, মানুষরাও চারিত্রিক বৈশিষ্টগত ভাবে চোরেই পরিণত হতাম। মূল বিষয় পরিস্থিতি। আরেকটি মূল বিষয় সহানুভূতি। এই পৃথিবীতেই বসবাস করা, না-মানুষদের প্রতি যদি সামান্য সহানুভূতিশীল হতে পারি আমরা তাহলে হয়ত এ বিষয় নিয়ে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাউকে আমার মতো বিনীত অনুরোধ রাখতে হবে না মানুষেরই কাছে, এই আশা।















