কৃশানু মজুমদার:সময় শুধু ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টায় না, বদলে দেয় ফুটবলের নায়কদেরও।
একসময়ে স্পেন মানেই ছিল ইনিয়েস্তার নিখুঁত পাস, জাভির মস্তিষ্ক, পুওলের অদম্য লড়াই, কাসিয়াসের অবিশ্বাস্য সেভ কিংবা ইনিয়েস্তার দুর্দান্ত পায়ের কাজ। কংক্রিটের গ্যালারি থেকে ভেসে আসত 'ভিয়া-ভিয়া দাভিদ ভিয়া' স্লোগান।
আজ যুগ বদলেছে, সময় এগিয়ে চলেছে। তারকারা বদলে গিয়েছেন। পুওল, ইনিয়েস্তা, জাভিরা এখন প্রাক্তনের দলে। সেই জায়গায় এসেছেন লামিন ইয়ামাল, মিকেল ওয়ারজাবালদের নতুন প্রজন্ম।
সেই নতুন প্রজন্ম বিশ্বকাপের ফাইনালে। ইয়ামালরা উদযাপন করছেন মাঠের ভিতরে। ডালাসের উচ্ছ্বাস থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে কলকাতার এক ঘরে সময় যেন হঠাৎ উল্টো দিকে হাঁটতে শুরু করল।
স্পেনের জয়, ইয়ামালদের উচ্ছ্বাস আর ফাইনালে ওঠার আনন্দ দেখতে দেখতে বেহালার গোপাল ঘোষ ফিরে গেলেন ষোলো বছর আগের এক রাতে।
২০১০ সালের সেই বিশ্বকাপে ভারত থেকে একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে নেলসন ম্যান্ডেলার দেশে গিয়েছিলেন তিনি। তাঁর পরিচয় ছিল ভলান্টিয়ার।
কিন্তু সেই পরিচয়ই তাঁকে পৌঁছে দিয়েছিল ইতিহাসের একেবারে গভীরে। কোটি কোটি মানুষ টেলিভিশনের পর্দায় যে দৃশ্য দেখেছিলেন, বাংলার গোপাল ঘোষ সেই দৃশ্য চাক্ষুষ করছিলেন কয়েক হাত দূর থেকে।

আজকাল ডট ইনের কাছে সেই স্মৃতি তুলে ধরেন আইআইএসডব্লিউবিএম থেকে দেশের প্রথম স্পোর্টস ম্যানেজমেন্ট পাশ করা গোপালবাবু। তিনি বলছিলেন, ''ফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে অনেকেই ফেভারিট ধরেছিল। কিন্তু খেলা যত এগোয়, ম্যাচের রাশ নিজেদের হাতে তুলে নিতে থাকে স্পেন। এল সেই কাঙ্খিত মুহূর্ত। ইনিয়েস্তা গোল করলেন। নেদারল্যান্ড আর গোল শোধ করতে পারেনি। স্পেন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। তার পরে যা দেখেছি আজও চোখ বন্ধ করলেই স্পষ্ট দেখতে পাই।''
কী দেখেছিলেন তিনি? গোপাল ঘোষ বলছেন, ''মাঠ জুড়ে তখন উৎসব চলছে। কেউ সতীর্থকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন, কেউ দৌড়ে বেড়াচ্ছেন হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি নিয়ে। কার্লেস পুওল ট্রফি হাতে ড্রেসিং রুমে ঢুকলেন। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছে যে টারজান। সের্জিও ব়্যামোস এক বোতল পারফিউম নিজের গায়ে ঢেলে দিলেন। আমার সঙ্গে চোখাচুখি হতেই চোখ টিপল। আমি তখন ঘোরের মধ্যে।''
কিছুক্ষণ বাদে আরও অবাক করার মতো ঘটনা ঘটে। সবাই তখন ধীরে ধীরে স্টেডিয়াম ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, এমন সময়ে জেরার্ড পিকে হাজির। তিনি আবদার করে বসলেন, ইনিয়েস্তার গোল জালের যে জায়গাটায় লেগেছে, সেই অংশটুকু তাঁকে দিতে হবে।
অগত্যা আর কী! ইতিহাসের 'এক ফালি সুতো' কেটে দেওয়া হল জেরার্ড পিকেকে। স্পেন জাতীয় দলের ম্যানেজার সাবিত্রী সিলভিয়ার সঙ্গে পরিচয় হয় গোপাল ঘোষের। দলের সকলের কাছে সাবিত্রী ছিলেন মায়ের মতো। একজন অভিভাবক। গোপালবাবুকে একাধিক উপহার দিয়েছিলেন তিনি।
২০১০ বিশ্বকাপের সেই দিনগুলোর সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতির মধ্যে রয়েছে স্প্যানিশ ফুটবলারদের সই করা ‘জাবুলানি’ বল। ইনিয়েস্তা, জাভি, পুওল, পিকে, বুসকেতসদের স্বাক্ষর মাখা সেই বল আজও গোপালের কাছে রয়েছে। ইতিহাসকে ছুঁয়ে থাকার এক অমূল্য স্মারক।

সেই উপহার, সেই স্বাক্ষর, সেই মুহূর্তগুলোই আজ তাঁর আসল সম্পদ, যেগুলোতে জমে আছে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনকে একেবারে কাছ থেকে দেখার অবিস্মরণীয় গল্প। সেই সব দিনের স্মৃতি বলতে বলতে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ছিলেন গোপাল বাবু।
তাই ইয়ামালদের স্পেন যখন আরও একবার বিশ্বকাপের ফাইনালে, তখন গোপাল ঘোষের কাছে এটি শুধু আরেকটি জয় নয়। এটি যেন সময়ের দুই প্রান্তকে জুড়ে দেওয়া এক অদৃশ্য সেতু। এক প্রান্তে ইনিয়েস্তার গোল, কেসিয়াসের উল্লাস, পুওলের আলিঙ্গন। অন্য প্রান্তে ইয়ামালদের নতুন স্বপ্ন।
বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে মুখোমুখি আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। উত্তেজনার পারদ চড়ছে ক্রমশ। সবার চোখ স্বাভাবিকভাবেই লিওনেল মেসির দিকে। আর্জেন্টাইন মহাতারকা দু'বার পা রেখেছেন কলকাতায়—একবার ভেনিজুয়েলার বিরুদ্ধে প্রীতি ম্যাচ খেলতে, আর কয়েক মাস আগেই মেসি, রদ্রিগো দি পল ও লুইস সুয়ারেজদের নিয়ে ঘুরে গিয়েছেন 'সিটি অফ জয়'।
মেসির কলকাতা সফরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গোপাল ঘোষেরও এক বিশেষ স্মৃতি। আর্জেন্টিনা-ভেনিজুয়েলা প্রীতি ম্যাচের সময় আর্জেন্টিনা দলের সমন্বয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন তিনিই। তাই মেসিকে কাছ থেকে দেখার, তাঁর দলের সঙ্গে কাজ করার সেই অভিজ্ঞতা আজও গোপাল ঘোষের স্মৃতির অন্যতম সেরা অধ্যায়।
আইএফএ, এআইএফএফ, ইস্টবেঙ্গল-সহ ফুটবলের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে গোপাল ঘোষের। আইএসএলের দল কেরল ব্লাস্টার্সে কাজ করার সুযোগের আশায় তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত সেই সুযোগ আর আসেনি।
এরপর তাঁর গুরুমাতা মাতা অমৃতানন্দময়ী দেবী (আম্মা)-র নির্দেশে তারাতলার কাছে অমৃতা বিদ্যালয়ম স্কুলে যোগ দেন তিনি। সেখানে টানা আট বছর নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন। সম্প্রতি অবসর নিয়েছেন গোপাল।
তবে কাজের প্রতি তাঁর টান এখনও অটুট। অবসর জীবনেও নতুন দায়িত্বের অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি। গোপাল বলছেন, “কাজ পাগল মানুষ তো, কাজের অপেক্ষায় রয়েছি।”
সময় এগিয়ে যায়, নতুন তারকারা আসে, নতুন ইতিহাস লেখা হয়। কিন্তু কিছু মানুষ থেকে যান ইতিহাসের নেপথ্যের নীরব সাক্ষী হয়ে। গোপাল ঘোষও তেমনই এক নাম,যাঁর স্মৃতির অ্যালবামে এখনও জ্বলজ্বল করছে ইনিয়েস্তার সেই গোল, মেসির কলকাতার পদচিহ্ন আর ফুটবল বিশ্বকাপের সঙ্গে কাটানো অসংখ্য সোনালি মুহূর্ত।
















