কৃশানু মজুমদার: বিশ্ব ফুটবলের মহাকাব্যে কেপ ভার্দে কোনওদিনই প্রধান চরিত্র ছিল না। আফ্রিকার দেশটি বিশ্বফুটবলের পাওয়ার হাউজদের ছায়ায় ঢাকা পড়েছিল এতদিন। কিন্তু ফুটবল মাঝে মাঝেই এমন কিছু গল্প লিখে দেয়, যা পরিসংখ্যান, র্যাঙ্কিং কিংবা ইতিহাসের বাঁধাধরা নিয়ম মানে না। স্পেনকে রুখে দিয়ে সেই রকমই এক নতুন গল্পের জন্ম দিয়েছে কেপ ভার্দে।
একটি ম্যাচ বদলে দিয়েছে একটি দেশের পরিচিতি। গোলপোস্টের নিচে দাঁড়ানো ভোজিনহা হয়ে উঠেছেন জাতীয় গর্বের প্রতীক। রাতারাতি বেড়েছে তাঁর জনপ্রিয়তা। সার্চ ইঞ্জিনে ট্রেন্ডিং হয়েছে কেপ ভার্দে। বিশ্বকাপের আলোয় নতুন করে আবিষ্কৃত হয়েছে আফ্রিকার এই ছোট্ট দেশটি।
স্পেনকে থমকে দিয়ে বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে উঠে এসেছে কেপ ভার্দে। একটা ম্যাচ বদলে দিয়েছে কেপ ভার্দের গোলকিপারের জীবন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর ফলোয়ারের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছে এক নিমেষে। সার্চ ইঞ্জিনে কেপ ভার্দে হয়ে উঠেছে ট্রেন্ডিং।
সেই কেপ ভার্দের ফুটবলেই নিজের স্বপ্নের ঠিকানা খুঁজে পেয়েছেন ঘানার ফুটবলার এমানুয়েল আপিয়া। তবে তাঁর এই জার্নির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতীয় ফুটবলের এক পরিচিত নাম। জড়িয়ে রয়েছেন এমন এক কোচ, যিনি একসময়ে ইস্টবেঙ্গলের দুঃসময়ে ত্রাতা হয়ে ধরা দিয়েছিলেন।

তিনি ফিলিপ ডি রাইডার। ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের কাছে নামটা আজও স্মৃতির অ্যালবামে উজ্জ্বল। ইস্টবেঙ্গলের দুঃসময়ে বেলজিয়ান কোচ মসীহা হয়ে উঠেছিলেন।
আই লিগে মোহনবাগানের কাছে পাঁচ গোল হজম করার পরে ইস্টবেঙ্গল কোচের চেয়ার ছাড়তে হয়েছিল সুভাষ ভৌমিককে। তাঁর জায়গায় যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ফিলিপ ডি রাইডারকে কোচ করে আনা হয়। বেলজিয়ান কোচ দায়িত্ব নিয়েই ইস্টবেঙ্গলকে ফেডারেশন কাপ চ্যাম্পিয়ন করেন।
সেবারের টুর্নামেন্টে মোহনবাগানকে সেমিফাইনালে হারিয়ে আই লিগে হারের প্রায়শ্চিত্ত করেছিল লাল-হলুদ। গুয়হাটিতে ফেডারেশন কাপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ইস্টবেঙ্গল।
সেই ফিলিপ ডি রাইডারের ছোঁয়ায় জীবন বদলে যায় এমানুয়েল আপিয়ার। কীভাবে? সেই গল্পই বলে চলেন কেপ ভার্দের ক্লাবে খেলা তারকা ফুটবলার।
আজকাল ডট ইনকে এমানুয়েল বলেন, ''রাইডার ছুটি কাটাতে কেপ ভার্দেতে এসেছিলেন। এখানে তাঁর কয়েকজন বন্ধু রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন এসসি সান্টা মারিয়া ক্লাবের প্রেসিডেন্ট। তাঁদের সঙ্গে গল্প করার সময়ে রাইডার জানতে পারেন, একজন সেন্টার-ব্যাক খুঁজছে ক্লাব। তখনই রাইডার আমার কথা বলেন। আমার সঙ্গে তাঁদের কথা হয়। আমি চলে আসি কেপ ভার্দেতে।'' সেই এমানুয়েল কেপ ভার্দের ফুটবলে এখন পরিচিত নাম। কেপ ভার্দের অন্যতম সফল ক্লাব জিডি পালমেইরার অধিনায়ক তিনি।

কিন্তু এমানুয়েলের সঙ্গে রাইডারের পরিচয় হয় কীভাবে? চীনে দু'জনের প্রথম পরিচয়। ধীরে ধীরে তা গভীর সম্পর্কের আকার ধারণ করে। এমানুয়েল বলেন, “রাইডার আমার কাছে ফাদার ফিগার। আমার ফুটবল দক্ষতা ও ট্যাকটিক্যাল জ্ঞানের উন্নতি ঘটান তিনিই। জীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও আমাকে সাহায্য করেছেন রাইডার।''
জিডি পালমেইরা ক্লাবের অন্যতম স্তম্ভ এখন এমানুয়েল। নেতৃত্ব আর নির্ভরতার প্রতীক। তাঁর হাত ধরে সাফল্যের একের পর এক অধ্যায় লিখেছে পালমেইরা। চারবার সাল রিজিওনাল লিগের শিরোপা জিতেছে দলটি। দু'বার জাতীয় লিগ খেতাবের পাশাপাশি একবার তাসা দে কেপ ভার্দে এবং দু'বার সুপার তাসা দে কেপ ভার্দে জয়।
সংখ্যাগুলো নিছক পরিসংখ্যান নয়। এগুলো এক ফুটবলারের দীর্ঘ অধ্যবসায়, আত্মত্যাগ এবং নেতৃত্বের উজ্জ্বল সাক্ষ্যই বহন করে। যে ফুটবলার একদিন অচেনা দেশে এসেছিলেন নতুন স্বপ্নের খোঁজে, আজ তিনিই সেই দেশের অন্যতম সফল ক্লাবের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এক চরিত্র।
এমানুয়েল বলছেন, ''এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা এবং পুরো দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা।''

বিশ্বকাপের মঞ্চে স্পেনের বিরুদ্ধে কেপ ভার্দের লড়াই গোটা বিশ্বের সামনে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে আফ্রিকার এই ছোট্ট দেশটিকে। ফুটবল বিশ্বের অনেকেই যেখানে স্পেনের সহজ জয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, সেখানে এমানুয়েল আপিয়ার বিশ্বাস ছিল একেবারেই অন্যরকম। তিনি বলছেন, ''অনেকেই ভেবেছিল স্পেন সহজেই জিতে যাবে। কিন্তু আমি জানতাম কেপ ভার্দে সবাইকে চমকে দিতে পারে। এই দলের মধ্যে রয়েছে অসাধারণ আত্মবিশ্বাস, অদম্য লড়াইয়ের মানসিকতা এবং ইতিহাস গড়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা।”
কেপ ভার্দে জাতীয় দলের তারকা গোলকিপার ভোজিনহার সঙ্গে কখনও মুখোমুখি পরিচয়ের সুযোগ হয়নি এমানুয়েলের। তিনি শুনেছেন, গত বছর তাঁদের একটি ম্যাচ গ্যালারিতে বসে দেখেছিলেন ভোজিনহা। যে গোলরক্ষক আজ বিশ্বকাপের মঞ্চে কেপ ভার্দের লড়াইয়ের অন্যতম মুখ, তিনি একসময় দর্শকাসনে বসে দেখেছিলেন এমানুয়েলের খেলা। ঘটনাটি তাই এমানুয়েলের কাছেও বিশেষ এক অনুভূতির জন্ম দেয়।

নতুন দেশ, অচেনা পরিবেশ, ভিন্ন সংস্কৃতির শুরুর দিনগুলো কঠিন ছিল এমানুয়েলের। কিন্তু ধৈর্য, কঠোর পরিশ্রম এবং বিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে তিনি নিজের জায়গা তৈরি করতে পেরেছেন। কেপ ভার্দের ফুটবল হাতের তালুর মতো চেনেন তিনি। এমানুয়েল গল্পের মতো বলে যান, ''এখানে অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় রয়েছে। তাঁরা পর্তুগাল, ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবে খেলছেন।''
রাইডারের কাছ থেকেই ভারতীয় ফুটবলের গল্প শুনেছেন এমানুয়েল। স্বপ্ন দেখেন একদিন তিনি ভারতের মাঠেও দাপিয়ে খেলবেন। রাইডারের কাছ থেকে তিনি জেনেছেন ভারতের ফুটবল সমর্থকদের আবেগ, ক্লাবের ঐতিহ্য আর ফুটবলকে ঘিরে মানুষের উচ্ছ্বাসের গল্প। সেই গল্পগুলো তাঁর মনে গভীরভাবে রেখাপাত করেছে। সময়ের স্রোত যদি সুযোগের দরজা খুলে দেয়, তবে হয়তো কোনও একদিন ভারতের ক্লাব ফুটবলের সবুজ ঘাসেই লেখা হবে এমানুয়েল আপিয়ার নতুন অধ্যায়।















