আজকাল ওয়েবডেস্ক: এই ইডেন গার্ডেন্সে একদিন মহম্মদ আজহারউদ্দিন কব্জির মোচড়ে রূপকথা লিখে গিয়েছিলেন। অভিষেকেই সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছিলেন। যখনই তিনি ইডেনে নেমেছিলেন, বিশালাকায় ইডেন তাঁকে খালি হাতে ফেরায়নি।
ক্রিকেটের নন্দনকাননে রোহিত শর্মা তুলে ধরেছিলেন বিজয়কেতন। শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ইডেনের সবুজ গালিচায় মহাকাব্যিক ওই ২৬৪ কেউ কোনওদিন ভুলতে পারবেন না।
সেই ঐতিহ্যের সবুজ ইডেন গার্ডেন্সের শ্বাসপ্রশ্বাসে রবি-রাতে কেবল একটাই নাম--সঞ্জু স্যামসন। অপরাজিত ৯৭ রানের ইনিংস খেললেন। অল্পের জন্য সেঞ্চুরি করতে পারলেন না। কিন্তু এই ৯৭ রান সেঞ্চুরির মতোই গৌরবজনক। এর মধ্যে রয়েছে অনেক কিছুর জবাব দেওয়া। অনেক না পাওয়ার যন্ত্রণা ভুলিয়ে দেওয়া ইনিংস এই ৯৭।
আনন্দনগরী থেকে বাণিজ্যনগরীতে তিনি দেশকে পৌঁছে দিলেন সেমিফাইঈনাল খেলতে। এরকম মায়াবী রাত কি আগে কখনও এসেছে সঞ্জু স্যামসনের ক্রিকেট কেরিয়ারে?
যতদিন ইডেন গার্ডেন্স থাকবে, ততদিন সঞ্জু স্যামসনের এই ইনিংস মনে থাকবে। মনে থাকবে, ম্যাচ জেতার পরে হেলমেট ছুড়ে ফেলে দিয়ে সর্বশক্তিমানকে স্মরণ করছেন। ভারতীয় ক্রিকেটের হতভাগ্য এক ক্রিকেটার ইডেনে লিখে গেলেন বীরগাথা।
বিরাট কোহলি পরিচিত চেজমাস্টার হিসেবে। মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে কোহলির সেই অবিশ্বাস্য ইনিংস কোনওদিন ভুলবেন না ক্রিকেটভক্তরা। হ্যারিস রউফকে মারা ওই বিশাল দুটো ছক্কা অনেককে শক্তি জুগিয়ে যাবে জীবনের লড়াইয়ে।
ইডেনে সঞ্জুর এই ইনিংসও মহাকাব্যিক। বিরাট কোহলি ছাড়া ১৮০-র বেশি রান তাড়া করে ভারত কখনও টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে জেতেনি। সেই জায়গায় রবি-রাতে ভারতের সামনে ১৯৫ রানের এভারেস্ট। তার উপরে উইকেট পড়ছে অন্যপ্রান্ত থেকে। চাপ বাড়ছিল। কিন্তু সঞ্জু স্যামসন শুরু থেকে শেষপর্যন্ত ক্রিজে টিকে থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে মাটি ধরালেন। তবুও কি তাঁকে চেজমাস্টার বলা হবে না? আজ থেকে তিনি হয়তো নিজের অজান্তেই কোহলির কক্ষপথে নাম লিখে ফেললেন।
চলতি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সঞ্জু দলে নিয়মিত ছিলেন না। কখনও জায়গা হারিয়েছেন। আবার দলে ফিরে এসেছেন। রান পাচ্ছিলেন না। সমালোচিত হচ্ছিলেন। রক্তাক্ত হচ্ছিলেন ভিতরে ভিতরে। সেই তিনিই আজ নায়ক। ঘামে ভেজা জবজবে জার্সি শরীরে এঁটে বসেছে। সঞ্জু র মুখে তখন ভুবনজয়ের হাসি।
বুকের উপরে চেপে বসা পাথর সরিয়ে ভারত পৌঁছল সেমিফাইনালে। স্বস্তি ফিরল দেশে। আর ব্যাট হাতে যিনি জাদুদণ্ড ঘোরালেন ইডেনের সবুজ গালিচায়, তিনি সঞ্জু। এরপরেও তাঁর মুখে খেলা করবে না হাজার হাজার ওয়াটের আলো! স্মিত হেসে সঞ্জু বলে চলেছেন, ''এই ইনিংস আমার কাছে সারা বিশ্ব। গোটা একটা পৃথিবী। খেলা শুরু করার প্রথম দিন থেকেই আমি স্বপ্ন দেখছিলাম দেশের জার্সিতে একদিন প্রতিনিধিত্ব করব। এই একটা ইনিংসের প্রতীক্ষা করছিলাম আমি দীর্ঘদিন ধরে। আমার কেরিয়ারে উত্থান-পতন হয়েছে অনেক। নিজেই নিজের দক্ষতার উপরে সন্দেহ করতে শুরু করেছিলাম। মনে মনে প্রশ্ন করেছিলাম পারব কি আমি? সর্বশক্তিমানকে ধন্যবাদ জানাই। তাঁর আশীর্বাদ আজ আমার সঙ্গে ছিল।''
এক নিঃশ্বাসে বলে যাচ্ছিলেন সঞ্জু। তাঁর বক্তব্য শুনে ধারাভাষ্যকাররা বলছিলেন,''সর্বসমক্ষে একটা প্লেয়ার বলছে সে নিজের উপরেই সন্দেহ করেছিল। অত্যন্ত সৎ একজন ক্রিকেটার সঞ্জু।''
রবি-রাত সঞ্জুর। ইডেনের মহানায়ক আজ তিনিই। আজ তাঁর বলার দিন। সঞ্জু বলে চলেন। তাঁর বক্তব্যও তাঁর ব্যাটিংয়ের মতোই সাবলীল। ভারতের ম্যাচ উইনার বলছেন, ''এই ফরম্যাট আমি বহুদিন ধরে খেলে আসছি। কোহলি, রোহিত শর্মা ও এমএস ধোনির মতো মহাতারকাদের দেখে শিখেছি। আমি লক্ষ্য করেছি গ্রেটরা কীভাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে খেলার ধরন বদলান। আগের ম্যাচে আমরা প্রথমে ব্যাট করছিলাম। তাই প্রথম বল থেকেই আমি আগ্রাসী ব্যাটিং শুরু করেছিলাম। এই ম্যাচ ছিল অন্যরকমের। কখনওই ভাবিনি এরকম একটা ইনিংস আমি খেলব। আমার জীবনের স্মরণীয় দিন। বর্তমানে পা রেখে বলের মেরিট বুঝে খেলে গিয়েছি।''
প্রতিটি লড়াই একদিন গৌরবের ঠিকানা খুঁজে পায়। দীর্ঘ অপেক্ষা, অবহেলা আর অগণিত প্রশ্নের ভিতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আজ সঞ্জু স্যামসন আলো জ্বালিয়ে গেলেন ইডেনে। সেই আলোর তেজে ম্লান ইডেনের বাতিস্তম্ভের আলোও।
আজ কেবল সঞ্জু রান করেননি, দেশকে জেতাননি। ইডেনের হৃদস্পন্দনের সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে এক নতুন গল্প লিখে গেলেন। আজকের রাত এক অন্য অনুভূতির। যার নাম সঞ্জু স্যামসন। নাম তো শুনাহি হোগা।
