সম্পূর্ণা চক্রবর্তী

বাতিল ঘোড়ায় চেপে যুদ্ধজয়। এলেন, দেখলেন, জয় করলেন। ইডেনে সূর্যাস্ত রুখলেন সঞ্জু স্যামসন। এক ম্যাচ আগে পর্যন্ত যে ব্রাত্য ছিলেন, প্রথম একাদশে জায়গা ছিল না, তাঁর ব্যাটে সেমিফাইনালে টিকিট নিশ্চিত করল ভারত। অনবদ্য সঞ্জু। ৫০ বলে ৯৭ রানে অপরাজিত। বিধ্বংসী ইনিংসে ৪টি ছয়, ১২টি চার।

স্ট্রাইক রেট ১৯৪। একা ইডেনের বাইশ গজে দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে ম্যাচ জেতালেন। মনে পড়ে যাচ্ছিল বেশ কয়েকদিন আগে ধারাভাষ্যের সময় সুনীল গাভাসকরের মন্তব্য।

সানি বলেছিলেন, 'এই ছেলেটার মধ্যে যা প্রতিভা আছে, তার একাংশ খেলতে পারলে দলে জায়গা নিয়ে কোনওদিন ভাবতে হবে না। যদি একটু ধারাবাহিক হত..।'

ইডেনের এই ইনিংসের পর হয়ত টি-২০ ক্রিকেটে দলে জায়গা পাওয়া নিয়ে সত্যিই ভাবতে হবে না ভারতের উইকেটকিপার ব্যাটারকে‌। বারবার বদলাবে না তাঁর ব্যাটিং পজিশন।

ভারতীয় দলের 'গিনিপিগ' আর হতে হবে না সঞ্জুকে। চলতি টি-২০ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে জায়গা হয়নি। অভিষেক শর্মার পেটে সংক্রমণ হওয়ায় নামিবিয়া ম্যাচে কপাল খোলে।

শুরুটা ঝড়ের গতিতে করলেও বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারেননি। তারপর ফের ব্রাত্য। দল থেকে বাদ। আবার ফেরেন জিম্বাবোয়ে ম্যাচে। রিঙ্কু সিংয়ের পরিবর্তে দলে ফেরেন। জীবনের সেরা টি-২০ ইনিংস ইডেনের জন্য তুলে রেখেছিলেন। 

প্রথমে ব্যাট করে ৪ উইকেটে ১৯৫ রান তোলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। জবাবে ১৯.২ ওভারে ৫ উইকেটের বিনিময়ে জয়সূচক রানে পৌঁছে যায় ভারত। ৪ বল বাকি থাকতে জয়।

শুরুতে একটু নড়বড়ে দেখালেও, শেষপর্যন্ত একপেশে ম্যাচ। ভারতীয় ফিল্ডিংয়ের ব্যর্থতা একাই ঢেকে দিলেন সঞ্জু স্যামসন। ১৯৬ রান তাড়া করতে নেমে শুরুতেই পতন।

পাওয়ার প্লের মধ্যে জোড়া উইকেট হারায় ভারত। ফের ব্যর্থ অভিষেক শর্মা। ১১ বলে ১০ রান করে আউট হন। চলতি টি-২০ বিশ্বকাপে ভারতের সবচেয়ে সফল ব্যাটার ঈশান কিষাণ। গ্রুপ পর্বে রানের মধ্যে ছিলেন।

কিন্তু সুপার এইটে দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচ থেকে পতনের শুরু। টানা তিন ম্যাচে ফ্লপ। রবিবার ইডেনেও রান পাননি। জোড়া চার মেরে শুরু করলেও ৬ বলে ১০ রান করে ফেরেন। ব্যর্থ সূর্যকুমার যাদবও।

১৬ বলে ১৮ রান করে আউট হন ভারত অধিনায়ক। তার আগে ৫৮ রান যোগ করে এই জুটি। যদিও তারমধ্যে সিংহভাগ রান সঞ্জুর। কেরলের ক্রিকেটারকে কিছুটা সঙ্গ দেওয়ার চেষ্টা করেন তিলক বর্মা।

২৭ রান করে যখন আউট হন, ম্যাচ অনেকটাই নিজেদের দখলে নিয়ে নেয় টিম ইন্ডিয়া। তিলক, হার্দিক (১৭) আউট হওয়ায় সাময়িক আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল।

কিন্তু দলকে বৈতরণী পার করান সঞ্জু। শেষ ওভারে ৭ রান প্রয়োজন ছিল। শেফার্ডের বলে প্রথমে ছক্কা, পরে চার। জীবনের সেরা ইনিংস স্যামসনের। 

টসে জিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ব্যাট করতে পাঠান সূর্যকুমার যাদব। ইডেনের পিচে পরের দিকে শিশির সমস্যা থাকে। বল গ্রিপ করতে অসুবিধা হয় বোলারদের। পরে ব্যাট করা দল সুবিধা পায়।

তাই গুরুত্বপূর্ণ টস জিতে বোলিং নিতে দ্বিধা করেননি সূর্য। লক্ষ্য ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজকে কম রানের মধ্যে বেঁধে রাখা। কিন্তু সেই লক্ষ্যে খুব সফল হয়নি ভারত। প্রায় দুশোর কাছাকাছি রান।

৪ উইকেট হারিয়ে ১৯৫ রানে শেষ করে ক্যারিবিয়ানরা। তাঁর জন্য সিংহভাগ দায়ী ভারতীয় ক্রিকেটাররাই। জঘন্য ফিল্ডিং। একের পর এক ক্যাচ মিস।

জোড়া ক্যাচ ফেলেন অভিষেক শর্মা। চলতি বিশ্বকাপে মোট ১৩টি ক্যাচ মিস। এছাড়াও রানআউটের সুযোগ নষ্ট। এর ফলেই রানের পাহাড় ক্যারিবিয়ানদের। 

এদিন বল হাতে শুরু করেন অর্শদীপ সিং এবং হার্দিক পাণ্ডিয়া।‌ পাওয়ার প্লেতে চারজন বোলারকে ব্যবহার করেন সূর্য। চতুর্থ ওভারে অক্ষর প্যাটেলকে বল দেন। পঞ্চম ওভারে যশপ্রীত বুমরাকে আনেন সূর্য।

বুমরার বলে রোস্টান চেজের লোফা ক্যাচ ফেলেন অভিষেক শর্মা। ১৪ রানে ছিলেন ক্যারিবিয়ান ওপেনার। পাওয়ার প্লের শেষে বিনা উইকেট হারিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের রান ছিল ৪৩। সাধারণত ড্যারেন স্যামির দল পাওয়ার ক্রিকেট খেলে। কিন্তু ইডেনের পিচে বুদ্ধিদীপ্ত ব্যাটিং ক্যারিবিয়ানদের। 

শুরুতে উইকেট হাতে রেখে একটি নির্দিষ্ট রানরেট রাখার চেষ্টা করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তবে নির্বিষ উইকেটে অনায়াসেই দুশো রানের গণ্ডি পেরোনো উচিত ছিল।

কিন্তু সাই হোপের মন্থর ব্যাটিংয়ের জন্য ম্যাজিক ফিগারে পৌঁছতে পারেনি ক্যারিবিয়ানরা। নবম ওভারে বল পান বরুণ চক্রবর্তী। এসেই উইকেট। সরাসরি বোল্ড সাই হোপ।

৩৩ বলে ৩২ রান করে আউট হন। ইনিংসে ছিল ১টি ছয়, ৩টি চার। ৬৮ রানে প্রথম উইকেট হারায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ১১.১ ওভারে ১০০ রানে পৌঁছয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। কিন্তু বুমরার হাত ধরে আবার ম্যাচে ফেরে ভারত। 

ওয়েস্ট ইন্ডিজের সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যাটার শিমরন হেটমেয়ারকে ফেরান তারকা পেসার। চলতি বিশ্বকাপে সবচেয়ে ছন্দে ছিলেন বাঁ হাতি। এই ইডেনেই ভাঙেন ক্রিস গেইলের রেকর্ড।

কিন্তু এদিন শুরুটা ভাল করলেও বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারেননি হেটমেয়ার। বরুণের বলে ছক্কা হাঁকিয়ে শুরু করেছিলেন। বুমরার বলে উইকেটের পেছনে সঞ্জু স্যামসনের হাতে ধরা পড়েন।

১১ ওভারে জোড়া উইকেট তুলে নিয়ে ক্যারিবিয়ানদের ব্যাটিং মেরুদণ্ড ভাঙেন তারকা পেসার। ২৫ বলে ৪০ রান করে ফেরেন রোস্টন চেজ। ইনিংসে ছিল ১টি ছয়, ৫টি চার।

একই ওভারে দুই সেট ব্যাটার ফিরে যাওয়ায় চাপে পড়ে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। কিন্তু পঞ্চম উইকেটে ৭৬ রানের পার্টনারশিপ রোভমান‌ পাওয়েল এবং জেসন হোল্ডারের মধ্যে। এক ওভারে ২৪ রান দেন অর্শদীপ।

তবে নিজের শেষ ওভারে দারুণ প্রত্যাবর্তন। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধেও শেষ দুই ওভারের ফায়দা তুলতে পারেনি ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এদিনও তারই পুনরাবৃত্তি। অভিষেক পাওয়েলের ক্যাচ না ফেললে ঝুলিতে এক উইকেট থাকত অর্শদীপের।