আজকাল ওয়েবডেস্ক: বিশ্বকাপের মঞ্চে যাঁরা জেতে, যাঁরা জয়ী হয়, তাঁদের উপরেই পড়ে প্রচারের সার্চলাইট। জয়ীদের কথাই সবাই মনে রাখেন। জো জিতা ওহি সিকান্দর। 

আর যারা হেরে যায়, পরাজিত হয়, তাদের গল্প কি সত্যিই মুছে যায়? তাঁদের কণ্ঠস্বর সময়ের সীমানা অতিক্রম করে কি মানুষের কাছে পৌঁছয় না? 

পৌঁছয়। নিশ্চয়ই পৌঁছয়। হেরে গিয়েও কেউ কেউ জিতে যায়। ভাবীকাল তাঁদের কথা মনে রেখে দেয় চিরকাল। যেমন জিম্বাবোয়ের ব্রায়ান বেনেট। 

আজ চিপকে ভারতের কাছে ৭২ রানে হার মানল জিম্বাবোয়ে। ক্রিকেট ইতিহাসে আজকের ফলাফলটাই লেখা থাকবে, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সুপার এইটে ভারতের কাছে বড় ব্যবধানে হার মেনেছে ক্রিকেট বিশ্বে লিলিপুট দেশ জিম্বাবোয়ে।  

কিন্তু যাঁরা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দেখেছেন ম্যাচটা, তাঁরা জানেন, জিম্বাবোয়ের এক ব্যাটার সাহসের অক্ষরে নিজের নাম লিখে দিয়েছেন।

পাঁচটি ইনিংসের মধ্যে চারটি ইনিংসেই তিনি অপরাজিত। পরাজয়ের বুক চিরে যে আলো চোখ ঝলসে দিচ্ছে তাঁরই নাম ব্রায়ান বেনেট। তাঁর দল হয়তো হেরে গেল। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে ছিটকেও গেল।

কিন্তু ব্রায়ান বেনেটকে কি ভোলা সম্ভব? গ্রুপের তিনটি ম্যাচে তিনি অপরাজিত থেকে গিয়েছেন। ওমানের বিরুদ্ধে করেছিলেন অপরাজিত ৪৮। অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে খেলেছিলেন অপরাজিত ৬৪ রানের ইনিংস।

শ্রীলঙ্কার মাটিতে দ্বীপরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তিনি করেন অপরাজিত ৬৩ রান। সুপার এইটে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে তাঁর ব্যাট অবশ্য 'বোবা' থেকে যায়। মাত্র ৫ রানে ফিরতে হয় বেনেটকে। 

কিন্তু ভারতের বিরুদ্ধে এই চিপকে তাঁর ব্যাট গর্জে উঠল। ৫৯ বলে অপরাজিত ৯৭ রানের ইনিংস খেললেন। ভারতীয় বোলিং নিয়ে ছেলেখেলা করলেন বললেও বোধহয় অত্যুক্তি করা হবে না। 

চলতি বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকদের মধ্যে জিম্বাবোয়ের বেনেট এখন দু'নম্বরে। পাঁচ ইনিংসে তিনি করেছেন ২৭৭ রান। 

সবার উপরে থাকা পাকিস্তানের সাহিবজাদা ফারহানের রান ২৮৩। যে দল গতবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলেনি। এবারও সুপার এইট থেকে বিদায় নিল, সেই দলের এক ব্যাটার গোটা ক্রিকেট বিশ্বকে নিজের জাত চিনিয়ে গেলেন।

হেরে গিয়েও তিনি যেন জিতেই গেলেন। চিপকের ম্যাচটা ভারতের কাছে ছিল বাঁচা-মরার। জিম্বাবোয়ের কাছেও তো তাই-ই ছিল। ভারত ও জিম্বাবোয়ের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান। ভারত ক্রিকেটবিশ্বের পাওয়ারহাউজ।

গতবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন দল। আর জিম্বাবোয়ে! ধারে ও ভারে বহু পিছিয়ে এই ভারতের থেকে। সেই ভারত এদিন ২৫৬ রানের পাহাড় তৈরি করে। জিম্বাবোয়ের ইনিংস থেমে যায় ১৮৪ রানে। এই ১৮৪-এর মধ্যে ব্রায়ান বেনেট একাই ৯৭। 

রান তাড়া করতে নেমে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকলেন বেনেট। উল্টোদিকে জশপ্রীত বুমরাহর মতো বোলার, যাঁর ছটি বল ছ'রকমের। বাঁ হাতি অর্শদীপ সিং টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের অন্যতম সফল বোলার।

রয়েছেন রহস্য বোলার বরুণ চক্রবর্তী। বেনেট লিখে গেলেন লড়াইয়ের এক মহাকাব্য। দিনান্তে স্কোরলাইন বলছে, ৫৯ বলে ৯৭ রান করে বেনেট অপরাজিত রয়েছেন। ৮টি বাউন্ডারি ও ৬টি ওভার বাউন্ডারিতে মালা গাঁথা তাঁর ইনিংসে। 

বুমরাহ, অর্শদীপ, বরুণের বিপজ্জনক বল সামলে বেনেট যেন বলে গেলেন, আমি এখনও আছি, আমার গল্প এখনও শেষ হয়নি।তাঁর ক্রিকেটে হাতেখড়ি হারারে শহরের দক্ষিণ-পূর্বের অখ্যাত-অনামী  এক জায়গায়।

নিজেদের বাড়ির পিছনের এক চিলতে নেটে শুরু হয় ক্রিকেটের পাঠ। বাবা কেলি বেনেট নিজেও ছিলেন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটার।  কিংবদন্তি অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারদের প্রজন্মের খেলোয়াড় ছিলেন।

বাবার বানিয়ে দেওয়া সেই নেটেই চলত দুই যমজ ভাই ব্রায়ান ও ডেভিডের ক্রিকেট-পাঠ।  একজন ব্যাটিং করলে আরেকজন বল করতেন।

এক সাক্ষাৎকারে ব্রায়ান বেনেট বলেছিলেন, তিন-চার বছর বয়স থেকেই হাতে ব্যাট তুলে নিয়েছি।যমজ ভাই থাকায় খেলার সঙ্গীর কোনওদিন অভাব হয়নি ব্রায়ান বেনেটের।  

বিশ্বজুড়ে যখন করোনার লাল চোখ, তখন ব্রায়ানের ক্রিকেট কেরিয়ারের সামনে প্রশ্নচিহ্ন পড়ে গেল। দু' বছর কোনও ম্যাচ ছিল না। ব্রায়ান বেনেট চলে যান  দক্ষিণ আফ্রিকায়। সেখানে  প্রথম ম্যাচে ১০০ বলে ১৫১ রানের বিধ্বংসী ইনিংস খেলেন। 

২০২২ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে ব্রায়ান ও ডেভিড খেললেও, ব্রায়ানের উত্থান শুরু হয় ২০২৩-এর একেবারে শেষের দিকে। কেরিয়ারের শুরুতে তিন ফরম্যাটেই সেঞ্চুরির বিরল নজির গড়েন। 

২২ বছরের তরুণ বেনেট বিশ্বকাপের মঞ্চেও লিখে গেলেন এক রূপকথা। এদিন ভাগ্যদেবী  তাঁকে আরেকটু সঙ্গ দিলে সেঞ্চুরি করতে পারতেন ব্রায়ান বেনেট। কখনও কখনও হার মানে সব কিছুর শেষ নয়। বরং তা ভবিষ্যতের জয়ের বীজ বুনে দেয়। 

এই হেরে যাওয়ার মধ্যেই ব্রায়ান বেনেট জ্বালিয়ে গেলেন আলোর প্রদীপ। রেখে গেলেন আলোর রেখা। দুর্ধর্ষ ইনিংস খেলে অস্ফুটে যেন বলে গেলেন জনপ্রিয় সিনেমার বিখ্যাত সংলাপ, ''হার কর জিতনে ওয়ালে কো বাজিগর ক্যাহেতে হ্যায়।''