আজকাল ওয়েবডেস্ক: আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬ ঘিরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এক নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পাকিস্তান সরকার রবিবার ঘোষণা করেছে যে তারা বিশ্বকাপে অংশ নেবে, কিন্তু গ্রুপ পর্বে ভারতের বিরুদ্ধে নির্ধারিত ম্যাচে মাঠে নামবে না। এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে নেওয়া হল, যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল বাংলাদেশকে টুর্নামেন্ট থেকে বাদ দিয়েছে, কারণ বাংলাদেশ ভারতে ম্যাচ খেলতে অস্বীকার করেছিল নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে।
আইসিসির ভোটাভুটিতে বাংলাদেশকে সমর্থন করেছিল কেবল পাকিস্তান ও বাংলাদেশই। বাকি ১৪টি সদস্য দেশ মনে করে, নিরাপত্তার যুক্তি দেখিয়ে ভেন্যু বদলের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। এর আগেই আইসিসি, বিসিসিআই ও পিসিবির মধ্যে সমঝোতা হয়েছিল যে ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ নিরপেক্ষ ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত হবে। তবুও পাকিস্তান সরকার কেন হঠাৎ করে ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচ না খেলার সিদ্ধান্ত নিল, সে বিষয়ে কোনও নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
পাকিস্তান সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়, আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬-এ অংশগ্রহণের জন্য পাকিস্তান ক্রিকেট দলকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে একইসঙ্গে স্পষ্ট করে জানানো হয়, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ভারতের বিরুদ্ধে নির্ধারিত ম্যাচে দল মাঠে নামবে না। এই ঘোষণার পরপরই আইসিসি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। সংস্থাটি জানায়, তারা বিভিন্ন দেশের সরকারের বিদেশনীতি সংক্রান্ত সিদ্ধান্তকে সম্মান করে, কিন্তু একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে নির্বাচনীভাবে ম্যাচ বয়কট করা টুর্নামেন্টের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
আইসিসির মতে, বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া সব দলকে একই শর্তে এবং নির্ধারিত সূচি মেনে খেলতে হয়। কোনও দল নির্দিষ্ট ম্যাচ এড়িয়ে গেলে তা প্রতিযোগিতার ন্যায্যতা, ভারসাম্য ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সংস্থা আরও জানায়, তারা এখনও পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের অপেক্ষায় রয়েছে, তবে এই সিদ্ধান্ত ক্রিকেটের স্বার্থে নয় এবং পাকিস্তানের ক্রিকেট সমর্থকদের স্বার্থও এতে ক্ষুণ্ণ হতে পারে।
আইসিসির প্লেয়িং কন্ডিশন অনুযায়ী, যদি কোনও দল ম্যাচ খেলতে মাঠে না নামে, তবে তাকে ২০ ওভারের একটি সম্পূর্ণ ইনিংস খেলে ফেলেছে বলে ধরা হবে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট দলের নেট রান রেট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং গ্রুপ পর্ব থেকে কোয়ালিফাই করার সম্ভাবনা কমে যেতে পারে। অর্থাৎ, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রভাব পড়বে মাঠের ফলাফলেও।
এদিকে বিসিসিআই এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিবৃতি দেয়নি। তবে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, ভারতীয় দল আইসিসির প্রোটোকল মেনেই এগোবে। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী দল শ্রীলঙ্কায় যাবে, অনুশীলন ও ম্যাচের আগে সংবাদিক সম্মেলন করবে এবং ম্যাচের দিন নির্দিষ্ট সময়ে আর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে উপস্থিত থাকবে। পাকিস্তান মাঠে না নামলে ম্যাচ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেবেন ম্যাচ রেফারি।
ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সবচেয়ে লাভজনক ফিক্সচার হিসেবে বিবেচিত হয়। ২০১২ সালের পর থেকে প্রতিটি বড় আইসিসি টুর্নামেন্টেই এই ম্যাচ রাখা হয়েছে, যদিও গত ১৪ বছর ধরে দুই দেশের মধ্যে কোনো দ্বিপাক্ষিক সিরিজ হয়নি। যদি পাকিস্তান তাদের অবস্থানে অনড় থাকে, তবে ২০১০ সালের পর এই প্রথম কোনও পুরুষ আইসিসি টুর্নামেন্টে ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ দেখা যাবে না।
এর আর্থিক প্রভাবও কম নয়। আইসিসি ঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি, এই ম্যাচ বয়কট করলে পিসিবির আইসিসি বার্ষিক আয়ের অংশ—যার পরিমাণ আনুমানিক ৩ কোটি ৪৫ লক্ষ ডলার—আটকে রাখা হতে পারে। ফলে বিষয়টি শুধু কূটনৈতিক বা রাজনৈতিক নয়, সরাসরি ক্রিকেট অর্থনীতির সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছে।
এই উত্তেজনার শিকড় বহু পুরনো। গত বছর ভারত পাকিস্তানে গিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি খেলতে অস্বীকার করেছিল। এরপর এশিয়া কাপে পহেলগাঁওয়ের সন্ত্রাসী হামলার প্রেক্ষিতে ভারতীয় ক্রিকেটাররা পাকিস্তানের সঙ্গে হাত মেলাননি। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ভারতে খেলতে অস্বীকার করলে পাকিস্তান প্রকাশ্যে তাদের সমর্থন জানায় এবং এমনকি বাংলাদেশের ম্যাচ আয়োজনের প্রস্তাবও দেয়। পিসিবি ফেব্রুয়ারির শুরু পর্যন্ত তাদের সফর নিশ্চিত না করে আইসিসির উপর চাপ তৈরির চেষ্টাও করেছিল।
এদিকে, পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে তাদের জাতীয় দলকে আইসিসি মেনস টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬-এ নির্বাচনীভাবে অংশগ্রহণের নির্দেশ দেওয়ার যে ঘোষণা হয়েছে, তা আইসিসি নোট করেছে।
তবে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) কাছ থেকে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও লিখিত যোগাযোগ না পাওয়া পর্যন্ত বিষয়টি আইসিসির কাছে স্পষ্ট নয়। আইসিসির মতে, একটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার মূল ধারণার সঙ্গে এই ধরনের সিদ্ধান্তকে মেলানো কঠিন। কারণ, যে সব দল যোগ্যতা অর্জন করে, তাদের সবাইকেই নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী সমান শর্তে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা।
আইসিসি জোর দিয়ে জানিয়েছে, তাদের প্রধান লক্ষ্য আইসিসি মেনস টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬ সফলভাবে আয়োজন করা। এই দায়িত্ব শুধু আইসিসির নয়, সমস্ত সদস্য বোর্ডের, যার মধ্যে পিসিবিও রয়েছে। সংস্থাটি আশা প্রকাশ করেছে যে পিসিবি আলোচনার মাধ্যমে এমন একটি সমাধানের পথ খুঁজবে, যা সব পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করবে এবং টুর্নামেন্টের কাঠামো অটুট রাখবে।
সব মিলিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬ এখন আর শুধু ক্রিকেট টুর্নামেন্ট নয়। এটি পরিণত হয়েছে রাজনীতি, কূটনীতি, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া বাণিজ্যের এক জটিল সংঘর্ষস্থলে। পাকিস্তান যদি শেষ পর্যন্ত অবস্থান না বদলায়, তাহলে এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি ম্যাচ নয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়ম ও কাঠামো নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দেবে।
