আপনাকে অভিনন্দন ইউসেফ। ইস্টবেঙ্গলকে চ্যাম্পিয়ন করেছেন, একই সঙ্গে গোল্ডেন বুটও জিতে নিয়েছেন আপনি। আচ্ছা বলুন তো, যেদিন আপনি ইস্টবেঙ্গলে যোগ দিলেন, সেদিন কি কল্পনা করেছিলেন যে ইস্টবেঙ্গল চ্যাম্পিয়ন হবে এবং আপনিই সর্বোচ্চ গোলদাতা হবেন? 

ইউসেফ- অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই আপনাকেও। সত্যি বলতে কী, অনেক স্বপ্ন নিয়ে আমি এবার ইস্টবেঙ্গলে যোগ দিয়েছিলাম। আত্মবিশ্বাসীও ছিলাম আমি। কিন্তু ফুটবল সহজ নয়। কখন যে কোন দিকে মোড় নেয়, কেউ জানে না। এমন একটা যে সফল মরশুম যাবে, সেটা কি আগে থেকে কেউ বলতে পারে? প্রথম দিন থেকেই আমি এই ক্লাবের আবেগ আর সমর্থকদের প্রত্যাশা অনুভব করতে পেরেছিলাম। আইএসএল চ্যাম্পিয়ন হওয়া আর একই সঙ্গে গোল্ডেন বুট জেতা আমার জন্য ভীষণ ভীষণ স্পেশ্যাল একটা ব্যাপার। একটা দল হিসেবে আমরা এই সাফল্য অর্জন করেছি। আমি ভীষণ গর্বিত। অনেক ভাল লাগা নিয়ে আমি ফিরে যাচ্ছি বার্সেলোনায়।  


এবারের আইএসএলে আপনি ১১টি গোল করেছেন। যদি ওই গোলগুলোর মধ্যে থেকে কোনও একটিকে বেছে নিতে বলা হয়, তাহলে কোন গোলটি আপনি বেছে নেবেন?

ইউসেফ: প্রতিটি গোলই স্পেশ্যাল। প্রতিটি গোলই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দলকে সাহায্য করেছে। তবে যদি আমাকে একটি গোল বেছে নিতেই হয়, তাহলে আমি ইন্টার কাশীর বিরুদ্ধে বিরতির ঠিক পরই করা গোলটিকেই বেছে নেব। অত্যন্ত আবেগপূর্ণ মুহূর্ত ছিল। আমরা তখন এক গোলে পিছিয়ে ছিলাম। আমাদের গোল করে ফিরে আসতেই হতো। নইলে চাপ বেড়ে যেত। আমার সেই গোলটি ম্যাচের গতিপথ বদলে দিয়েছিল। 

ইন্টার কাশীর বিরুদ্ধে শেষ ম্যাচে বিরতির সময়ে আপনারা ১-০ গোলে পিছিয়ে ছিলেন। লেমন ব্রেকে ড্রেসিং রুমে কোচ অস্কার ব্রুজোঁ আপনাদের ঠিক কী বলেছিলেন? আর তার পরই দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আপনি গোল করে দিলেন। 

ইউসেফ- আমাদের শান্ত থাকতে এবং নিজেদের উপরে বিশ্বাস রাখতে বলেছিলেন কোচ। অস্কার আমাদের বলেছিলেন, মানসিকতাই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ইতিবাচক মানসিকতা ম্যাচ জেতায়। আমাদের সবাইকে পজিটিভ থাকতে বলেছিলেন কোচ। অস্কার বলেছিলেন, একটি গোল সবকিছু বদলে দিতে পারে। কোচের পরামর্শে আমরা উত্তেজিত হয়ে পড়ি। দ্বিতীয়ার্ধে আরও বেশি এনার্জি এবং আত্মবিশ্বাস নিয়ে মাঠে নেমেছিলাম। সৌভাগ্যবশত দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই আমি সমতা ফেরাই। 

ইস্টবেঙ্গলকে আপনি চ্যাম্পিয়ন করতে সাহায্য করেছেন। আগামী মরশুমে নিশ্চয় ইস্টবেঙ্গলে থাকতে চান? 

ইউসেফ- অবিশ্বাস্য একটা মরশুম গেল আমাদের। সমর্থকদের ভালবাসা, তাঁদের আবেগ চিরকাল আমার মনে থেকে যাবে। ইস্টবেঙ্গল চিরদিন আমার হৃদয়ে থেকে যাবে। আমি শুধু সবাইকে নিয়ে এই মুহূর্তটা উপভোগ করতে চাই। ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনই কিছু বলা কঠিন, তবে অবশ্যই ইস্টবেঙ্গলে থাকা, লাল-হলুদ জার্সি পরে খেলা যে কোনও ফুটবলারের জন্য গর্বের বিষয়। আমিও ইস্টবেঙ্গলে থেকে যেতে চাই। 

ইস্টবেঙ্গল সমর্থকরা ইলিশ পছন্দ করেন। আপনি কি ইলিশের কোনও রেসিপি চেখে দেখেছেন? 

ইউসেফ-(হাসি) হ্যাঁ, আমি খেয়েছি! কলকাতার খাবারের সংস্কৃতি সত্যিই অসাধারণ। সমর্থকরা সবসময়ে ইলিশ নিয়ে কথা বলতেন। আমিও চেখে দেখেছিলাম। খেতে বেশ ভাল লেগেছিল। তবে ইলিশের কাঁটা বেছে কীভাবে খেতে হয়, সেটা আমাকে শিখতে হবে। পরের বার এসে শিখে নেব। 

আপনি নতুন, অপরিচিত এক দেশে খেলতে এসেছিলেন। ইস্টবেঙ্গলে আসার আগে কি নার্ভাস ছিলেন? মরশুম শেষে আপনিই ইস্টবেঙ্গলের নায়ক। কাকে এই জয় উৎসর্গ করছেন? 

ইউসেফ-নতুন দেশে খেলতে এলে নার্ভাস তো লাগেই। নতুন সংস্কৃতি, নতুন ফুটবল পরিবেশ, নতুন প্রত্যাশা-অন্যরকম একটা অনুভূতি তো হয়ই। তবে কলকাতার মানুষ আমাকে স্বস্তি দিয়েছে। সমস্ত সমর্থকদের, আমার সমস্ত সতীর্থদের, কোচিং স্টাফদের এবং বিশেষ করে আমার পরিবারকে এই জয় উৎসর্গ করছি। আমাকে সবসময়ে ওরা সমর্থন করে গিয়েছেন। আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন। ওদের জন্য আমি গোল করেছি।  

আচ্ছা একটা কথা বলুন তো, ঠিক কোন সময়ে আপনি বুঝতে পেরেছিলেন যে এই মরশুমে আপনারা চ্যাম্পিয়ন হতে চলেছেন? এবারের ডার্বিতে সবাই আপনার কাছ থেকে গোল চেয়েছিলেন। এবার হয়নি। আগামী মরশুমে আপনি ইস্টবেঙ্গলে থাকলে নিশ্চয়ই ডার্বিতে গোল করার জন্য মুখিয়ে থাকবেন?

ইউসেফ: মরশুমের মাঝামাঝি গিয়ে বেশ কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ জয়ের পরে আমরা সবাই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করি যে এবার চ্যাম্পিয়ন হতে পারি। আর ডার্বির ব্যাপারে যেটা জিজ্ঞাসা করলেন, সেই ব্যাপারে বলি, আমি জানি সমর্থকরা ডার্বিতে আমার থেকে গোল চেয়েছিলেন। এবার ডার্বিতে গোল পাইনি। আগামী মরশুমে যদি ইস্টবেঙ্গলে থাকি, তাহলে ডার্বিতে সমর্থকদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য আমি নিজেকে উজাড় করে দেব। 

ইস্টবেঙ্গলের ইতিহাস নিশ্চয় আপনি জানেন, শুনেছেন। সমর্থকদের আবেগ, তাঁদের উৎসাহ দেখে বিখ্যাত কোনও ক্লাবের কথা কি আপনার মনে পড়ছে? 

ইউসেফ-ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের আবেগ অবিশ্বাস্য। এটি এমন সব ক্লাবের কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়—সমর্থকরা প্রতিটি মুহূর্ত আবেগ নিয়ে বেঁচে থাকেন। ইস্টবেঙ্গলের নিজস্ব একটা পরিচয় আছে। সমর্থকরা যেন ফুটছেন সবসময়ে। তাঁরা এমন পরিবেশ তৈরি করে দেন, যা সত্যি বলতে বিশ্বের অনেক বড় ক্লাবের সঙ্গে মিলেও যায়।

দুর্দান্ত একটা মরশুম কাটালেন। এই ঐতিহাসিক মরশুমের পরে ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের আপনি কী বার্তা দিতে চান?

ইউসেফ-প্রথম দিন থেকে মরশুমের শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত আমাদের উপর বিশ্বাস রাখার জন্য আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাই। আপনাদের এনার্জি, আবেগ এবং সমর্থন প্রতিটি ম্যাচে আমাদের শক্তি জুগিয়ে গিয়েছে। এই ট্রফি আপনাদের সবার। 

সত্যি বলতে, ফাইনাল বাঁশির পর আমি আবেগ আর আনন্দে কেঁদে ফেলেছিলাম, কারণ আমি বুঝতে পেরেছিলাম এই খেতাব ক্লাব এবং সমর্থকদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ২২ বছর পর আমরা ইতিহাস গড়েছি। এমন মুহূর্ত ভোলার নয়। এই স্মৃতিগুলো চিরদিন আমার হৃদয়ে থেকে যাবে। 

 খেতাব জয়ের পর সমর্থকরা আপনার নাম ধরে চিৎকার করছিলেন। গায়ে কাঁটা  দিচ্ছিল নিশ্চয়? 

ইউসেফ- এটা একজন ফুটবলারের জন্য বিশেষ এক মুহূর্ত। সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতিগুলোর একটি। ইস্টবেঙ্গলকে চ্যাম্পিয়ন করার পর সমর্থকরা আমার নাম ধরে চিৎকার করছিলেন। আমি অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম। আবেগ গ্রাস করেছিল আমাকে। এমন দৃশ্য আগে কখনও দেখিনি। আমি গর্বিত, কৃতজ্ঞ এবং সমর্থকদের সঙ্গে গভীর একাত্ম বোধ করেছিলাম। 

ইস্টবেঙ্গলের মতো ঐতিহাসিক ক্লাবের ইতিহাসের অংশ হতে পারা—যে ক্লাবের আবেগ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে রয়েছে—আমার কাছে অবিশ্বাস্য এক অনুভূতি। এই স্মৃতি আমার সারাজীবনের সঞ্চয়।