আজকাল ওয়েবডেস্ক: ফুটবল মাঠে তিনি যেন একজন দাবাড়ু। প্রতিপক্ষের চাল আগে থেকে বুঝে নিয়ে কৌশল সাজানোই তাঁর বিশেষত্ব। কিন্তু স্টালে সোলবাকেনের নিজের জীবনই যেন এক অবিশ্বাস্য নাটক। ২০০১ সালে সাত মিনিটের জন্য ‘মৃত’ হয়ে যাওয়া সেই সোলবাকেনই আজ নরওয়ে ফুটবলকে ইতিহাসের নতুন দোরগোড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। তাঁর দল প্রস্তুতি নিচ্ছে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠার জন্য। তেমনটা হলে নরওয়ের প্রথম দল হিসেবে নজির গড়বে।
২০০১ সালের ১৩ মার্চ। ডেনমার্কের ক্লাব এফসি কোপেনহেগেনের হয়ে খেলতেন সোলবাকেন। সেদিন আচমকাই থেমে যায় তাঁর হৃদস্পন্দন। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে সাত মিনিট ধরে তিনি ছিলেন ক্লিনিক্যালি মৃত। দলের চিকিৎসক ফ্র্যাঙ্ক ওডগার্ডের দ্রুত পদক্ষেপেই ফিরে আসে তাঁর জীবন।
পরে ‘ড্রিভক্রাফ্ট’ পডকাস্টে সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে সোলবাকেন জানান, তিনি একটি নীল আলো ও একটি সুড়ঙ্গের মতো দৃশ্য দেখেছিলেন।
হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর ২৬ ঘণ্টা অচেতন ছিলেন তিনি। মস্তিষ্ককে সুরক্ষিত রাখতে তাঁকে রাখা হয়েছিল মেডিক্যালি ইনডিউসড কোমায়। সৌভাগ্যবশত, তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে চিকিৎসকেরা জানতে পারেন, জন্মগত হৃদযন্ত্রের সমস্যার কারণেই এই ঘটনা ঘটেছিল। শেষ হয়ে যায় তাঁর ফুটবলারের জীবন।
সোলবাকেন পরে বলেছিলেন, “এমন ঘটনা জীবনের অনেক কিছু বদলে দেয়। তখন বোঝা যায়, আসলে কোন বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ আর কোনগুলো নয়। আমি নিজের কাজের জন্য সবকিছু উজাড় করে দিই, কিন্তু জানি জীবনে আরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় আছে।”
খেলোয়াড়ি জীবন শেষ হওয়ার পর খুব দ্রুতই কোচিংয়ে চলে আসেন তিনি। প্রথমে নরওয়ের অনূর্ধ্ব-১৮ দলের সঙ্গে কাজ শুরু করেন। এরপর হ্যামক্যামের দায়িত্ব নিয়ে দলকে লিগে পঞ্চম স্থানে পৌঁছে দেন। তাঁর সাফল্যে নজর পড়ে পুরনো ক্লাব এফসি কোপেনহেগেনের।
কোপেনহেগেনের কোচ হিসেবে প্রথম বছরেই ড্যানিশ লিগ জেতেন সোলবাকেন। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে তাঁর দল হারায় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও আয়াক্সের মতো শক্তিশালী ক্লাবকে। পরে জার্মানির এফসি কোলনেও কোচিং করান তিনি।
২০১২ সালে ইংল্যান্ডের উলভারহ্যাম্পটন ওয়ান্ডারার্সের দায়িত্ব নেন সোলবাকেন। তবে সেই অধ্যায় সফল হয়নি। এরপর আবার কোপেনহেগেনে ফিরে সাত বছর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। অবশেষে ২০২০ সালে নরওয়ে জাতীয় দলের কোচ হন।
শুরুটা সহজ ছিল না। নরওয়ে তাঁর অধীনে ২০২২ বিশ্বকাপ ও ইউরো ২০২৪-এর যোগ্যতা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। সোলবাকেন ঘোষণা করেছিলেন, ২০২৬ বিশ্বকাপে দলকে তুলতে না পারলে তিনি পদত্যাগ করবেন।
কিন্তু আজ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। নিজের প্রতিশ্রুতি পূরণ করে তিনি নরওয়েকে বিশ্ব ফুটবলের বড় মঞ্চে নিয়ে এসেছেন। যে মানুষ একদিন সাত মিনিটের জন্য জীবন হারিয়েছিলেন, সেই মানুষই এখন দেশের ফুটবলের সবচেয়ে বড় স্বপ্নের কারিগর।
মাঠে তাঁর কৌশলকে অনেকেই দাবার সঙ্গে তুলনা করেন। আর তাঁর নিজের জীবন? সেটিও যেন এক অসম্ভব প্রত্যাবর্তনের গল্প, মৃত্যুকে হারিয়ে উঠে এসে ইতিহাস লেখার গল্প।















