অয়ন মুখোপাধ্যায়

বিখ্যাত ফুটবল গবেষক পল ডার্বি একবার বলেছিলেন, "আফ্রি‌কা একটি ফুটবল খেলার মাঠ। এখানে প্রতিভার জন্ম হয় না, প্রতিভা কেবল আবিষ্কারের অপেক্ষায় থাকে।" আজ ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে দাঁড়িয়ে মনে হয় এই আপ্তবাক্যটি আজ আর কোনো তাত্ত্বিক কথা নয়, আজ তা এক চরম সত্য।

যে বুটের তলায় এক সময় চাপা পড়েছিল কালো চামড়ার অধিকার, আজ সেই কালো বুট পরে আফ্রিকার কালো মানুষেরা বিশ্ব ফুটবলকে নাচাচ্ছে। তাই ২০২৬-এর ফুটবল বিশ্বকাপ আসলে ফুটবল মানচিত্রে আফ্রিকার এক নয়া সাম্রাজ্য বিস্তারের গল্প।

গল্পের শুরুটা কিন্তু আজকের নয়। উনিশ শতকের শেষ ভাগ। নীল নদ আর নাইজার নদীর অববাহিকায় তখন ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকদের দাপট। ব্রিটিশ সৈন্য, ফরাসি বণিক আর মিশনারিদের হাত ধরে আফ্রিকার গরম বালির ওপরে প্রথম চামড়ার বল গড়িয়েছিল।

১৮৬২ সাল। দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে প্রথম নথিবদ্ধ ম্যাচ। ইউরোপে ফুটবল ছিল মূলত শিল্পবিপ্লবের পর শ্রমিক শ্রেণির বিনোদন আর অভিজাতদের শৃঙ্খলা শেখানোর মাধ্যম।

অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদী ইউরোপীয় শাসকরা আফ্রিকা তেও ফুটবল এনেছিল স্থানীয় যুবকদের 'সভ্য' করতে আর ঔপনিবেশিক শৃঙ্খলায় অভ্যস্ত করাতে। কিন্তু আফ্রিকানরা দ্রুতই এই খেলাটিকে নিজেদের আয়ত্তে এনে ঔপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে অবাধ্যতা ও প্রতি রোধের প্রতীক বানিয়ে তোলে।

কায়রো, আলেকজান্দ্রিয়া কিংবা লাগোসের বন্দরে বন্দরে গড়ে উঠল নিজস্ব ফুটবল ক্লাব। ১৯০৭ সালে জন্ম নিল মিশরের 'আল আহলি'। আফ্রিকানদের কাছে ফুটবল তখন আর শুধু খেলা হিসেবে থাকল না, ফুটবল হয়ে উঠল ইউরোপীয় প্রভুদের হারিয়ে আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের এক গোপন রাজনৈতিক হাতিয়ার। আর এর মধ্যেই গড়ে উঠল ফুটবলের আফ্রিকার নিজস্ব ঘরানা।

তারপর এলো মুক্তির দশক। ১৯৫০ আর ৬০-এর দশকে আফ্রিকা জুড়ে স্বাধীনতার হাওয়া। ফুটবল মাঠ হয়ে উঠল জাতীয়তাবাদের নতুন ক্যানভাস। ১৯৫৭ সালে জন্ম নিল আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন (CAF)।

শুরু হল নিজস্ব যুদ্ধ—'আফ্রিকান কাপ অফ নেশনস'। কিন্তু বিশ্বমঞ্চে তখনো ব্রাত্য কালো মানিকরা। বিশ্বকাপে আফ্রিকার কোনো পাকা আসন ছিল না। ১৯৬৬ সালে এলো সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

ফিফার বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক জোট হয়ে বিশ্বকাপ বয়কট করল গোটা আফ্রিকা। এই মহা বিদ্রোহের কাছে মাথা নোয়াতে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয় ফিফা। ১৯৭০ সালে আফ্রিকার জন্য বরাদ্দ হলো একটি স্থায়ী আসন।

ইতিহাসের পাতা উল্টাতে উল্টাতে আমাদের মনে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, ফুটবল বিশ্বমঞ্চে প্রথম পা রেখেছিল আফ্রিকার কোন দেশ কত সালে? এর উত্তরে বলা যায় ১৯৩৪ সালের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ।

ইতালিগামী জাহাজে চড়ে বসেছিল মিশর। ওটাই ছিল বিশ্বমঞ্চে কোনো আফ্রিকান দেশের প্রথম পদার্পণ। যদিও সে যাত্রা দীর্ঘ হয়নি। কিন্তু আসল ধামাকা শুরু হলো আশির দশক থেকে। ১৯৮২ সালে আলজেরিয়া হারিয়ে দিল পরাক্রমশালী পশ্চিম জার্মানি কে। বিশ্ব ফুটবল নড়েচড়ে বসল।

১৯৯০-এর ইতালি বিশ্বকাপে বুড়ো রজার মিলার কোমর দুলিয়ে নাচলেন কর্নার ফ্ল্যাগের পাশে। ক্যামেরুন পৌঁছে গেল কোয়ার্টার ফাইনালে। বিশ্ব বুঝল, এই শক্তিকে আর চেপে রাখা যাবে না। ২০০২-এ সেনেগাল বধ করল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে। আর ২০২২-এর কাতার? মরক্কো রূপকথা লিখল সেমিফাইনালে উঠে।

ফুটবল মাঠের এই মরণপণ লড়াই আসলে তো শিকল ছেঁড়ারই গান। যখন গ্যালারিতে আফ্রিকার ড্রামস বেজে ওঠে, তখন মনে পড়ে যায় কবীর সুমনের গাওয়া ল্যাংস্টন হিউজের সেই অমোঘ অনুবাদের লাইনগুলো—

"আমার দুবাহু প্রসারিত করে সূর্যের কোন অঞ্চলে
পাক খেয়ে নেচে অবশেষে এই শ্বেতাঙ্গ দিন শেষ হলে
শান্ত, শীতল সন্ধ্যে তন্বী গাছের ছায়াই ভালো
রাত্রি নামবে যখন, আহা, আমার মতন কালো"

ইউরোপীয় ফুটবলের সেই দাম্ভিক 'শ্বেতাঙ্গ দিন' আজ সত্যিই শেষ। ইউরোপীয় ফুটবল যেখানে নিয়মানুবর্তিতা আর শক্ত কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে বিকশিত হয়েছে, আফ্রিকায় ফুটবল ছড়িয়ে পড়েছে এক সহজাত আনন্দ, গতি এবং নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের হাত ধরে।

বিশ্বমঞ্চে আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে রাতের মতো কালো, সুন্দর আর নিটোল আফ্রিকার নিজস্ব ফুটবল। ফুটবলাররা আজ বুটের জাদুতে বিশ্বমঞ্চে সেই অধিকার আদায়ের দ্রোহের গানই গাইছেন।

আর আজ? ২০২৬ সালের এই মেগা বিশ্বকাপে মহাদেশীয় রাজনীতির পুরো সমীকরণটাই বদলে গেছে। ফিফার আসন সংখ্যা বাড়ার সুবাদে এবার রেকর্ড সংখ্যক আফ্রিকান দেশ বিশ্বমঞ্চে বুক চিতিয়ে লড়ছে।

মোট ৯টি দেশ সরাসরি মূল পর্বে খেলছে। মরক্কো, সেনেগাল, আইভরি কোস্ট, মিশর, দক্ষিণ আফ্রিকা, টিউনিসিয়া, আলজেরিয়া, ঘানা এবং ডিআর কঙ্গো। ইউরোপ-আমেরিকার তথা কথিত বড় শক্তির ঘুম উড়িয়ে দেওয়ার জন্য এই নয়টি নামই যথেষ্ট। সালাহ, ওসিমেন কিংবা আশরাফ হাকিমিদের উত্তরসূরিরা এখন আর মাঠের 'কালো ঘোড়া' নন, তাঁরাই এখন টুর্নামেন্টের ভাগ্যবিধাতা।

সামগ্রিকভাবে বিচার করলে দেখা যাবে, ২০২৬ এর বিশ্বকাপে আফ্রিকার অবস্থান আজ আর করুণা বা চমকের ওপর টিকে নেই। যে দলগুলো একসময় কেবল শারীরিক শক্তির জন্য পরিচিত ছিল, তারা আজ ইউরোপীয় ক্লাবগুলোর ট্যাকটিক্যাল মগজ আর আফ্রিকান গতির এক মারাত্মক ককটেল।

ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলো আজ আফ্রি কান তারকা ছাড়া অচল। আর এবারের ২০২৬-এর বিশ্বকাপ প্রমাণ করে দিচ্ছে, ফুটবল এখন আর শুধু লাতিন জাদু আর ইউরোপীয় যান্ত্রিকতার দ্বৈরথ নয়। আফ্রিকার ড্রামস এখন বিশ্ব ফুটবলের আসল ছন্দের নিয়ামক।

বাঙালির ড্রয়িংরুমে বসে টিভিতে সেই অদম্য কালো চামড়ার গতির ঝড় দেখতে দেখতে মনে পড়ে যাচ্ছে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মেজাজের কবিতার সেই অমোঘ নাট্যরূপ। নতুন অতিথির আগমনের আহ্লাদে আটখানা হয়ে বউ ফিসফিসিয়ে স্বামীকে বলছে: ‘দেখো, ঠিক আমার মতো কালো হবে।’

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শাশুড়ি ভাবছেন এর পর একটা ঠাস করে শব্দ হওয়া উচিত। ওমা, বউমা বেশ ডগমগ হয়ে বলছে: ‘কী নাম দেব, জানো? আফ্রিকা। কালো মানুষেরা কী কাণ্ডটাই না করছে সেখানে!’

হ্যাঁ, ২০২৬-এর মাঠে কালো মানুষেরা সত্যিই কাণ্ড ঘটিয়ে দিয়েছে। ড্রয়িংরুমের এই খণ্ডচিত্রটাই আসলে আজকের বিশ্ব ফুটবলের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক সত্য। শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে ওই নবজাতকের মতোই আজ বিশ্বমঞ্চে নতুন এক গর্বের নাম—আফ্রিকান ফুটবল!